Published : 27 Aug 2025, 10:46 PM
চট্টগ্রাম নগরীর শীতল ঝর্ণা খালের প্রশস্ততা ও গভীরতা বাড়লেও খালের ওপর ৫০ বছরের বেশি পুরনো যে সেতুটি রয়েছে সেটি সংস্কার করে দৈর্ঘ্য বাড়ানো হয়নি।
এ কারণে ভারি বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে ইটের গাঁথুনি সেতুটি ভেঙে পড়ে বলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (সিসিসি) গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এছাড়া প্রতিবেদনে শীতল ঝর্ণা খালের সেতু ভেঙে পড়ার আরও তিনটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে।
৭ অগাস্ট ভোরে নগরীতে টানা ভারি বর্ষণের মধ্যে দুই নম্বর গেইট থেকে অক্সিজেনমুখী বায়েজিদ বোস্তামি সড়কের স্টার শিপ এলাকায় শীতল ঝর্ণা খালের ওপর থাকা সেতুটির একাংশ ধসে পড়ে।
এ ঘটনায় সিটি করপোরেশন সংস্থার প্রধান প্রকৌশলী মো. আনিসুর রহমানকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছিল।
বুধবার কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে।
সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সেতু ভেঙে পড়ার বিষয়ে গঠিত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রতিবেদনটি মেয়র মহোদয়ের কাছে উপস্থাপন করব।
“ওনার নির্দেশনা নিয়ে সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের জন্য কাজ করব।”

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগরীর ২ নম্বর জালালাবাদ ওয়ার্ডের শীতল ঝর্ণা খালের উপর সেতুটি ইটের ভিত দিয়ে ৫০ বছরেরও আগে তৈরি করা হয়। সেতুটির দুই পাশের ইটের দেয়ালের মধ্যবর্তী দূরত্ব ছিল ৬ মিটার।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে যে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে, তার আওতায়, সেতুর অংশে প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ খালটির প্রশস্ততা বাড়িয়ে ১৩ মিটার করা হয়। খালের গভীরতাও বাড়ানো হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “সেতুর দৈর্ঘ্যের চেয়ে খালের প্রশস্ততা ও গভীরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভারী বর্ষণে ও পাহাড়ি ঢলে সেতুর দুই পাশের ভিতের নিচ থেকে মাটি সরে গিয়ে ইটের তৈরি দেয়াল ভেঙে যায় এবং সেতুটির একাংশ ধসে পড়ে।”
ঘটনার দিন ভোরে সেতুটির দুই নম্বর গেট থেকে অক্সিজেনমুখী সড়কের ওপরের অংশ ভেঙে পড়েছিল।
এরপর থেকে সেতুর অক্সিজেন থেকে দুই নম্বর গেটমুখী অংশের উপর দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।
সেতুটির যে অংশ এখন সচল আছে তা সিডিএ ২০১০ সালে নতুন করে নির্মাণ করেছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার দ্বিতীয় কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, সেতুর পূর্ব পাশে পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি নালা করা হয়েছিল। এই নালার পানি সরাসরি সেতুর ভিতের পাশ দিয়ে নিষ্কাশিত হতো। এতে সেতুটির ভিত ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এছাড়া সেতুটি যখন নির্মাণ করা হয়েছিল তখন ওই সড়কে গাড়ি চলাচল করত খুব কম। বর্তমানে গাড়ির সংখ্যা অনেক গুণ বেড়েছে। শিল্প এলাকা হওয়ায় সড়ক ও সেতু দিয়ে ভারী ট্রাক, লরি, কাভার্ডভ্যানসহ বিভিন্ন ধরনের গাড়ি চলে। তুলনামূলক বেশি ওজনের গাড়ি চলাচল করা সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তৃতীয় কারণ হিসেবে তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে।
চতুর্থ কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, পানি সরবরাহের জন্য ওয়াসা সেতুটির পাশ দিয়ে দুটি বড় আকারের পাইপ নিয়েছে। সেখানে পাইপের সংযোগ স্থাপন করায় এবং পাইপ লাইনের সুরক্ষার জন্য আরসিসি বক্স নির্মাণের কারণেও পুরোনো সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ভবিষ্যতে এ ধরণের দুর্ঘটনা এড়াতে প্রতিবেদনে চারটি সুপারিশ করেছে কমিটি।
তারমধ্যে প্রধান সুপারিশ হল-জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য নগরীতে মেগা প্রকল্পের অধীনে যেসব খালের প্রশস্ততা বাড়ানো হয়েছে, তার সঙ্গে মিল রেখে সে সব খালে থাকা পুরোনো সেতুগুলো ভেঙে নতুনভাবে নির্মাণ করা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নগরীতে অনেক খালের পাশে একাধিক সংস্থা প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ করেছে। বিশেষ করে সিডিএ’র খাল খননের ফলে খালের গভীরতা বেড়েছে। এতে আগের প্রতিরোধ দেয়ালগুলো দেবে যাচ্ছে।
“তাই পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিরোধ দেয়াল ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া অতি ভারী যানবাহন বহনে সক্ষম নয়, এমন সেতু ও কালভার্টের তালিকা করে নিরাপত্তা সাইনবোর্ড স্থাপন এবং প্রয়োজনে ভারী যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে।”
সেবা সংস্থার পাইপ লাইন স্থাপন ও স্থানান্তরের সময় যাতে সেতু ও কালভার্টের ক্ষতি না হয় তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয় প্রতিবেদনের সুপারিশে।
নগর সংস্থার এই তদন্ত কমিটিতে সদস্য হিসেবে ছিলেন প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা কমান্ডার ইফতেখার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ রিফাতুল করিম চৌধুরী ও সিডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী মো.মাহফুজুর রহমান।
পুরনো খবর: