Published : 19 Nov 2024, 12:05 PM
নভেম্বর মাসের প্রথম ১৭ দিনে চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গুতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে; যা এ বছর এক মাসের সর্বোচ্চ মৃত্যু।
চিকিৎসকরা বলছেন, এবার অল্প সময়েই আক্রান্তদের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। কোনো রোগীর শক সিনড্রোম দেখা গেলে, তাকে বাঁচানো কঠিন হয়ে যাচ্ছে।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের শারীরিক লক্ষণ এবং উপসর্গেও কিছু পরিবর্তন আসার কথাও তারা বলছেন। রোগীর রক্তচাপ যাতে কোনোভাবে না কমে, তা নিশ্চিত করার তাগিদ দিচ্ছেন।
২০২৩ সালের মত চলতি বছরও এক জরিপে চট্টগ্রামে আক্রান্তদের মধ্যে ডেঙ্গুর ডেন-২ ধরনের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। ডেন-২ এর সাবগ্রুপ ‘কসমোপলিটন’ এ আক্রান্তের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি।
তবে ডেঙ্গুর ধরনে নতুন কোনো পরিবর্তন ঘটছে কিনা এবং এর প্রভাব রোগীদের শরীরে কেমন, এসব বিষয়ে জানতে বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

১৭ দিনে ১৪ মৃত্যু, আক্রান্ত ৭০৯
চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সোমবারের প্রতিবেদন অনুসারে, আগের ২৪ ঘণ্টায় দু’জনের মৃত্যু হয়েছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুতে।
তাদের মধ্যে ওমর ফারুক (২০) নামে বান্দরবানের লামার এক বাসিন্দা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (চমেক) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাকে রোববার রাতেই ভর্তি করা হয়েছিল। ডেঙ্গু শক সিনড্রোম ও এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমে তার মৃত্যু হয়।
রোববার রাতে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলার শাবানা (৩০) নামের এক নারীর মৃত্যু হয় চট্টগ্রাম মেডিকেলে। ওই নারীকে গত ১৪ নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, রিফ্যাক্টরি শক উইথ ডিআইসি ও এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু শক সিনড্রোমে তার মৃত্যু হয়েছে।
এবছর চট্টগ্রাম জেলায় মোট ৩৬৪৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। ১৪ জনই মারা গেছেন নভেম্বরে।
জেলার সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ মাসে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা দুটোই বেশি। এক গবেষণায় দেখা গেছে, জেলায় এবছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ৮৮ ভাগই ডেন-২ তে আক্রান্ত। এছাড়া কসমোপলিটন সাবগ্রুপে আক্রান্তের সংখ্যাও বেশি।
“এর প্রভাবেই আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে বলে ধারণা করছি।”

বদলে গেছে উপসর্গও
জেলায় সবচেয়ে বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চলতি বছর জেলার মোট ৩৬৪৪ জন শনাক্ত ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ১৭১৭ জনই এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।
এ হাসপাতালের ডেঙ্গু বিষয়ক ফোকাল পারসন ডা. নূর মোহাম্মদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গত বছরের চেয়ে এবার গুরুতর রোগীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। এবার রোগীদের মাল্টিঅর্গান অ্যাটাক হচ্ছে। গত এক মাসে মাল্টিঅর্গান ডিসফাংশনের ঘটনা অনেক পেয়েছি।
“এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে। মানে সিভিয়ারিটি (তীব্রতা) খুব বেশি। এবার ডেঙ্গু আক্রান্তের লক্ষণেও পরিবর্তন হয়েছে। জ্বর উঠছে না বা হলেও তাপমাত্রা বেশি উঠছে না। কিন্তু পরীক্ষা করলে ডেঙ্গু পজেটিভ আসছে।”
চিকিৎসক নূর মোহাম্মদ বলেন, “আমাদের পরামর্শ হল, জ্বর জ্বর অনুভূত হলেই বা শরীর দুর্বল লাগলে ডেঙ্গু শনাক্তকরণ পরীক্ষা করাতে হবে। পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি নজর রাখতে হবে রোগীর ব্লাড প্রেশারের দিকে।
“এবার হঠাৎই রোগীদের ব্লাড প্রেশার কমে যাচ্ছে। এবং এরপর দ্রুত গতিতে অন্যান্য অবস্থার অবনতি হচ্ছে। তাই কোনোভাবেই ব্লাড প্রেশার যাতে না কমে সেটা খেয়াল রাখতে হবে। রক্তের প্লেইটলেট কমলে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা শুরুর জন্য অপেক্ষা করা যাবে না। ডেঙ্গু শনাক্ত হবার প্রথম দিন থেকেই চিকিৎসা শুরু করতে হবে।”
এ কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে অনেক রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি ও মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ডেন-২ কসমোপলিটনের প্রভাব কতটা
২০২৩ সাল থেকে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তদের ডেঙ্গুর ধরণ শনাক্তকরণ ও জিনোটাইপ বিশ্লেষণে তিন বছর মেয়াদী একটি গবেষণার কাজ চলছে।
এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের তত্ত্বাবধানে চলমান এই গবেষণায় নেতৃত্ব দিচ্ছে আইসিডিডিআরবি, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ।
২০২৩ সালে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের মধ্যে দেড় হাজার রোগীর নমুনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, তাদের মধ্যে ৬৯ শতাংশ ডেন-২ সেরোটাইপে (প্রকরণে) আক্রান্ত ছিলেন।
চলতি বছর এখন পর্যন্ত ২০০ আক্রান্তের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা গেছে, তার মধ্যে ৮৮ শতাংশ ডেন-২ তে আক্রান্ত। আর ১১ শতাংশ রোগী ডেন-৩ তে আক্রান্ত। তবে এবার গবেষণার ফলাফল এখনো প্রকাশ হয়নি।
এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের পরিচালক ডা. মো. আবদুর রব বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এবছর যে ৮৮ শতাংশ ডেন-২ রোগী শনাক্ত হয়েছে তার অর্ধেকই কসমোপলিটন সাবগ্রুপের। তবে চলতি বছরের গবেষণা কাজ এখনো চলমান।
“২০২৩ সালের ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জিনোম সিকোয়েন্স করে দেখা গেছে, ৫০ ভাগ রোগীর মাঝেই বিপদজনক কসমোপলিটান প্রকরণ উপস্থিত। যা রোগের তীব্রতা ও জটিলতা বাড়িয়ে দিতে পারে।”
ডা. আবদুর রব বলেন, “চট্টগ্রামে পাওয়া কসমোপলিটান প্রকরণ বাংলাদেশে একেবারেই নতুন| বাংলাদেশের অন্য সব অঞ্চল থেকে পাওয়া ইতোপূর্বের প্রকরণগুলো থেকে চট্টগ্রামে পাওয়া প্রকরণটি উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন|
“ফাইলোজেনেটিক বিন্যাস তথা তুলনামূলক বিশ্লেষণে পাওয়া যায়- এই প্রকরণগুলো মিয়ানমার এবং ভারতে আছে| আগে ইউরোপেও ছিল। আমরা ধারণা করছি, পর্যটক ও রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে এই বিপজ্জনক সাবগ্রুপটি দেশে প্রবেশ করেছে। এক্ষেত্রে বমি, পেট ব্যথা, পাতলা পায়খানা, শ্বাসকষ্ট ও পেটে পানি আসার মত উপসর্গ বেশি দেখা যায়। এই প্রকরণ ডেঙ্গুর তীব্রতা ও মৃত্যুহার বাড়িয়ে দেয়।”
২০২৩ সালে ডেঙ্গু আক্রান্তদের নমুনা নিয়ে করা জিনোম সিকোয়েন্সগুলো জিনোমের উন্মুক্ত বৈশ্বিক তথ্যভাণ্ডার জার্মানির গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ অন শেয়ারিং অল ইনফ্লুয়েঞ্জা ডেটায় (জিআইএসএআইডি) গৃহীত হয়েছে বলে জানান তিনি।
এছাড়া এই গবেষণার ভিত্তিতে রচিত দুটি গবেষণাপত্র ইতোমধ্যে ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ইমিউনলজি এবং আমেরিকান জার্নাল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিনে গৃহীত হয়েছে|

প্রয়োজন বিস্তারিত গবেষণা
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ফোকাল পারসন ডা. নূর মোহাম্মদ মনে করেন, চট্টগ্রামে ডেঙ্গু রোগীদের লক্ষণ ও উপসর্গে পরিবর্তন এবং দ্রুত আক্রান্তদের শারীরিক অবস্থার অবনতির বিষয় নিয়ে বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন।
তিনি বলেন, “কেন জ্বর সহ অন্যান্য লক্ষণে পরিবর্তন আসছে। কেনইবা দ্রুত অবস্থার অবনতি হচ্ছে, এসব কি ডেন-২ বা কসমোপলিটন সাবগ্রুপের প্রভাব কিনা এবং প্রভাব হলে সেটা রোগীর শরীরে কি ইফেক্ট ফেলছে- এসব বিষয় জানতে হলে বিস্তারিত গবেষণার প্রয়োজন।
“বড় পরিসরে এ বিষয়ে গবেষণা করা গেলে ভবিষ্যতে রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে তা সহায়ক হবে।”
আবদুর রব বলেন, “ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধান ও নিয়মিতভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য জিনোম সিকোয়েন্স অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ| আমাদের পুরো গবেষণা শেষ হবে ২০২৫ সালে। এসব তথ্য ব্যবহার করে ভবিষ্যতে ডেঙ্গু প্রতিরোধে অগ্রিম ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাবে এবং ও জনস্বাস্থ্যের জন্য তা অতন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
চলতি মৌসুমে আক্রান্তের সংখ্যা কমাতে মশা কমানো জরুরি মন্তব্য করে ডা. নূর মোহাম্মদ বলেন, “মশা যত কামড়ানোর সুযোগ পাবে তত ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে। তাই মশা যেন কামড়ানোর সুযোগ কম পায়। আপাতত এটা নিশ্চিত করা জরুরি।”