Published : 09 Jul 2026, 11:57 AM
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-২ আসনে জয়ী বিএনপির সরোয়ার আলমগীরের প্রার্থিতা ‘বৈধ’ বলে রায় দিয়েছে হাই কোর্ট। এর ফলে তার ফল প্রকাশ ও শপথ নিতে আর কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।
বৃহস্পতিবার বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের দ্বৈত বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন।
শুনানিতে রিট আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী আহসানুল করিম, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম শুনানিতে অংশ নেন, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. আনোয়ার হোসেন।
জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী ও আবদুল্লাহ সাদিক। নির্বাচন কমিশনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মো. রাজু মিয়া।
রায়ের পর সারোয়ার আলমগীরের আইনজীবী আহসানুল করিম বলেন, “সরোয়ার আলমগীর ফটিকছড়ি-২ থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়ে ইলেকশনে দাঁড়ানোর জন্য যে প্রার্থিতা দিয়েছিল, সেটা ইলেকশন কমিশন তার নমিনেশন ক্যানসেল করে দিয়েছিল এবং সেটা নিয়ে রিট ফাইল হয়েছিল। আজকে রিটের শুনানি হয়েছে।
“শুনানির পর কোর্ট বলেছেন যে সারোয়ার আলমগীর প্রথমত ডিফল্টার নয়। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন যে আপিল অ্যালাউ করে যে ক্যান্ডিডেচার রিজেক্ট করে দিয়েছিল, সেটা অবৈধ ছিল এবং কোরাম নন-জুডিস ছিল এবং ম্যালিস ইন ল ছিল।”
আহসানুল করিম বলেন, “সুতরাং সারোয়ার আলমগীর বৈধ ক্যান্ডিডেট এবং তিনি ইতোমধ্যে নির্বাচন করেছেন। নির্বাচন করে তিনি ৭০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। এবং যেহেতু এই রিট পিটিশনে রুল অ্যাবসোলিউট হয়েছে, এখন নির্বাচন কমিশন তার নাম গেজেটভুক্ত করবেন এবং অন্যান্য যে ফরমালিটিজ আছে, ওথ নেয়া, শপথ গ্রহণ করা, সেগুলো ফরমালিটিজ গ্রহণ করে তিনি সংসদে যাবেন।”
একই পক্ষের আরেক আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, “এই রায়ের ফলে সারোয়ার আলমগীরের গেজেট নোটিফিকেশনে, যেহেতু সে নির্বাচনে জিতে গেছে, গেজেট নোটিফিকেশনে বাধা রইল না, শপথ নিতেও কোনো বাধা রইল না।”
সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে তা বৈধ ঘোষণা করেছিলেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। কিন্তু এ বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগে ইসিতে আপিল দায়ের করেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল আমিন।
ওই অভিযোগের শুনানি নিয়ে গত ১৮ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন আপিল মঞ্জুর করে। অর্থাৎ সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়।
ইসির এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে প্রার্থিতা ফিরে পেতে সরোয়ার আলমগীর ১৯ জানুয়ারি হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন।
প্রাথমিক শুনানি নিয়ে সরোয়ার আলমগীরের মনোনয়নপত্র বাতিলের ইসি সিদ্ধান্ত স্থগিত করে দেয় হাই কোর্ট।
হাই কোর্টের ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করেন ওই আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মোহাম্মদ নুরুল আমিন। ৩ ফেব্রুয়ারি শুনানি শেষে আপিল বিভাগ তার লিভ টু আপিল মঞ্জুর করে।
আদেশে বলা হয়, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সরোয়ার আলমগীর অংশ নিতে পারবেন। তবে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই আসনের ফল প্রকাশ করা যাবে না।
ভোটে সরোয়ার আলমগীর ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৪৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের মোহাম্মদ নুরুল আমিন পান ৬২ হাজার ১৬০ ভোট। তবে সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন ওই আসনের ফলের গেজেট প্রকাশ স্থগিত রাখে। ফলে সরোয়ার আলমগীরের শপথ নেওয়াও আটকে থাকে।
এ কারণে ফল প্রকাশ ও শপথ গ্রহণের অনুমতি চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেন সরোয়ার। গত ১৬ জুন আপিল বিভাগ দুই সপ্তাহের মধ্যে রুল নিষ্পত্তি করতে মামলাটি ফের হাই কোর্টে পাঠিয়ে দেয়। সেই রুলেরই চূড়ান্ত শুনানি শেষে বৃহস্পতিবার রায় দেওয়া হয়।
রিট আবেদনকারীর পক্ষের আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, “নির্বাচন কমিশনে যেদিন মনোনয়নপত্র জমা দেবে, সেদিন ইস্যু ছিল যে সে ঋণখেলাপি ছিল কি ছিল না। সেখানে সেদিন কিন্তু ঋণখেলাপি ছিল না, কোনো কথা নাই এবং রিটার্নিং অফিসার অ্যালাউ করছে।
“সাবসিকুয়েন্টলি আপিল করছে জামায়াতে ইসলামীর ক্যান্ডিডেট। সেখানেও কিন্তু ঋণখেলাপিই বলে নাই, এনি জেনারেল কথা বলছে। এরপরে প্রায় ২০ দিন পরে এসে একটা হাই কোর্টের, সুপ্রিম কোর্টের একটা ডকুমেন্ট দেখাল। সাবসিকুয়েন্ট ডকুমেন্ট তো হবে না।
“এইটা দেখেই কিন্তু ইলেকশন কমিশন তার মনোনয়নপত্র বাতিল করে দিল। তার এগেইনেস্টে রিট করা হয়েছিল। তো সুতরাং সাবসিকুয়েন্টলি কোনো কাগজ ইলেকশন কমিশন নিতে পারে না, নজরে নিতে পারে না, আমলে নিতে পারে না।”
মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, “এইটাই সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট ডিভিশন ইলিগ্যাল ঘোষণা করেছে ইলেকশন কমিশনের সাবসিকুয়েন্ট রায়টা। এতে আরো প্রমাণিত হল যে, সে ঋণখেলাপি ছিল না, বৈধ ক্যান্ডিডেট ছিল এবং বিএনপির ক্যান্ডিডেট হিসেবে প্রায় ৭০ হাজার ভোটে জিতেছে।”
হাই কোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করবেন জানিয়ে জামায়াত প্রার্থীর আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “হাই কোর্ট ডিভিশন আজকে নিষ্পত্তি করেছেন, রায় দিয়েছেন, রায় দিয়ে তারা ঘোষণা করেছেন যে জনাব সরোয়ার আলমগীরের নমিনেশন বৈধ ছিল। অর্থাৎ যেদিন তিনি নমিনেশন দাখিল করেছেন, সেই দিনে তিনি ঋণখেলাপি ছিলেন না।"
আইনগত যুক্তি তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা আর্গুমেন্ট করেছি। স্ক্রুটিনির দিনটা এখানে প্রাসঙ্গিক দিন নয়। নমিনেশন পেপার সাবমিট করার দিনটা হলো প্রাসঙ্গিক দিন। আদালতকে দেখতে হবে কোনোদিন তিনি ঋণখেলাপি ছিলেন, এটা কি নমিনেশন পেপার দাখিলের দিন নাকি স্ক্রুটিনির দিন?
“আমরা বলেছি দাখিলের দিন, আইনেও আছে দাখিলের দিন। তারপরেও আদালত অ্যাবসোলিউট করেছেন।”
শপথের বিষয়ে তিনি বলেন, “এখনো পর্যন্ত কোনো আদেশ তো বের হয় নাই। আজকে মৌখিক রায় হয়েছে। একটি লিখিত রায় বের হবে। লিখিত রায়ের পরে প্রশ্ন দাঁড়াবে, ইলেকশন কমিশন কী পদক্ষেপ নেবে।
“লিখিত রায় বের হলে অবশ্যই আমরা আপিল দায়ের করব উচ্চ আদালতে। এ ব্যাপারটি আপনারা জানতে পারবেন।”