Published : 29 May 2026, 12:48 AM
চট্টগ্রামে কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়া নিয়ে এবার আর টানাটানি, ছোটাছুটি দেখা যায়নি। বরং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আড়তদারদের ‘সিন্ডিকেটের’ কারণে ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না তারা। তবে তা মানতে নারাজ আড়তদাররা।
বৃহস্পতিবার ঈদের দিন দুপুর থেকে চট্টগ্রাম নগরীর বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ চৌমুহনী, মুরাদপুর চামড়া গুদাম এলাকা ঘুরে দেখা যায়, মৌসুমি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আড়তদারদের প্রতিনিধিদের তুমুল দরকষাকষি। ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি দর উঠছে না বড় গরুর কাঁচা চামড়ার।
বাংলাদেশে পশুর চামড়ার যে চাহিদা, তার ৮০-৯০ শতাংশই পূরণ হয় কোরবানির ঈদে জবাই করা পশু থেকে। ফলে এটাই চামড়া সংগ্রহের মূল মৌসুম। এবার চট্টগ্রামের আড়তদার চার লাখের কিছু কম-বেশি চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করেছেন।
এবার গরুর চামড়ার দাম গতবারের চেয়ে ২ টাকা করে বাড়িয়ে নির্ধারণ করেছে সরকার।
ট্যানারি ব্যবসায়ীদের এবার ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়া কিনতে হবে ৬২ থেকে ৬৭ টাকায়; গত বছর এই দাম ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা।
ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম হবে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, গত বছর যা ৫৫ থেকে ৬০ টাকা ছিল।
এছাড়া সারাদেশে লবণযুক্ত খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হবে ট্যানারিতে, যা গত বছর ছিল ২২ টাকা থেকে ২৭ টাকা, আর বকরির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা, যা গতবার ছিল ২০ টাকা থেকে ২২ টাকা।

চামড়া সংগ্রহে ব্যস্ততা নেই
একটা সময় কোরবানির পর চামড়া সংগ্রহে এলাকার উঠতি যুবকদের দৌড়াদৌড়ি ছিল বিভিন্ন অলিগলির চিরচেনা রূপ। তবে কয়েক বছর হল চট্টগ্রাম নগরীতে তা স্মৃতির খাতায় ঠাঁই নিয়েছে। কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে টানাটানি, উত্তেজনা-কিছুই নেই দেখা যায়নি এবার।
অন্যান্য বছর বিভিন্ন বয়েসি মৌসুমি ব্যবসায়ীর দেখা মিললেও এবার সে সংখ্যাটাও কম দেখা গেছে। আগের বছরগুলোতে চামড়া ব্যবসায় সম্পৃক্ত থাকা অনেকেই এবার লোকসানের আশঙ্কায় ব্যবসায় নামেননি। আর যারা করছেন, তারা চামড়া সংগ্রহ করেছেন সামান্য পরিমাণে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নগরীর বিভিন্ন স্থানে ঘুরে ঘুরে প্রতিনিধিদের মাধ্যমে চামড়া সংগ্রহ করছেন আড়তদারা। আবার অনেকেই সরাসরি আড়তে নিয়ে যাচ্ছেন। আড়তে চামড়াগুলোতে লবণ দিয়ে সংগ্রহ করেন আড়তদারা।
চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে যা কিছু চামড়া কেনাবেচা হয় সেগুলোর বেশির ভাগ নিয়ে আসা হয় আগ্রাবাদ চৌমুহনী এলাকায়। আর কিছু যায় বহদ্দারহাট এলাকায়। সেখান থেকে আড়াতদারের প্রতিনিধিরা চামড়াগুলো কিনে নেন। আবার কেউ কেউ চামড়া এনে চৌমুহনী ও বহদ্দারহাটের মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে যান।
এবার চৌমুহনী এলাকার সেই চিরচেনা রূপ দেখা যায়নি। গুটি কয়েক মৌসুমি ব্যবসায়ীকে সেখানে চামড়া নিয়ে বসে থাকতে দেখা গেছে।
তারা বলছিলেন, বিগত বছরগুলোতে লোকসান পুষিয়ে উঠতে না পেরে এবার অনেকেই এ ব্যবসায় যুক্ত হননি। যারা চামড়া বিক্রি করতে বসেছেন তাদের অভিযোগ, গত বছর যে দামে চামড়া তারা বিক্রি করেছিলেন এবার সেই দামও পাচ্ছেন না।
গেল বছর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই সড়কে চামড়া ফেলে যান, তাতে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া সড়কেই নষ্ট হয়ে যায়। এর আগে ২০১৯ সালেও একই ঘটনা ঘটেছিল।
‘সিন্ডিকেট’ করেছেন আড়তদাররা?
আগ্রাবাদ চৌমুহনী এলাকায় কথা হয় মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী মো. সেলিম টিপুর সঙ্গে।
ঈদ মৌসুমে দীর্ঘদিন ধরে চামড়া ব্যবসায় সম্পৃক্ত টিপুর অভিযোগ, “চামড়া ব্যবসা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটি শ্রেণি ‘সিন্ডিকেট’ করে এ ব্যবসার বিপর্যয় ঘটিয়েছে।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, গত বছর চামড়ার দাম না পেয়ে এবার মাত্র ৩০টি চামড়া সংগ্রহ করেছেন তিনি।
“কিন্তু এবারের অবস্থা গত বারের চেয়েও খারাপ।”
টিপুর দাবি, গত বছর অনেকেই চামড়া সড়কে ফেলে গেলেও তিনি প্রতিটি চামড়া ৪৫০ টাকা দরে বিক্রি করেছিলেন। এবার বিক্রি করেছেন ২২০ টাকা দরে।
তিনি বলেন, এবছর প্রতিটি চামড়া কিনেছেন ২০০ টাকা দরে। আড়তদারের প্রতিনিধিরা এসে ২০০ টাকার বেশি দর দিতে চাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে ২২০ টাকা দরে সবগুলো বিক্রি করেছি। যাতে লাভ না হলেও কোন ধরনের লোকসান না হয়।

চামড়া কেনাবেচার অবস্থা বর্ণনা করে টিপু বলেন, আগের বছরগুলোতে এ সড়ক জ্যামের কারণে মানুষও চলাফেরা করতে কষ্ট হতো। কিন্তু এবার এত বেশি লোকজন এখানে আসেনি। মানুষ অনেক দাম দিয়ে গরু কিনছেন, কিন্তু সেই চামড়ার দামও পাচ্ছে না বলে দাবি করেন তিনি।
তার দাবি, চার লাখ টাকা দামের একটি গরুর চামড়া তিনি ২০০ টাকা দিয়ে কিনেছেন এবং ২২০ টাকা দিয়ে বিক্রি করেছেন।
আগ্রাবাদ হাজী পাড়ার বাসিন্দা মো. রুবেল নামে এক যুবক বলেন, ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা করে দেবেন বলে এলাকা থেকে ২৫টি চামড়া সংগ্রহ করেছেন। বেলা ১২টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত দুই জন এসেছিলেন। একজন বলেছেন ২০০ টাকা, আরেকজন বলেছেন ২৫০ টাকা। তিনি তাদের চামড়া দেননি।
বিকাল সোয়া ৫টার দিকে এক আড়তদার প্রতিনিধির সঙ্গে প্রতিটি চামড়া ২৬০ টাকা করে দরাদরি করতে দেখা গেছে এই যুবককে।
রুবেল বলেন, গতবছর ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা দরে ৪১টি চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেগুলো গড়ে ২২০ টাকা করে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। গতবার বেশকিছু লোকসান হয়েছে। তাই এবার চামড়া সংগ্রহ করেছেন কম।
এদিকে চামড়ার দাম কম শুনে সজীব নামে এক যুবককে চামড়া ডাস্টবিনে নিয়ে ফেলে দেওয়ার কথা বলতে শোনা গেছে।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গতবছর ১৬০টি চামড়া সংগ্রহ করলেও এবার করেছেন ৪২টি।
সজীব বলেন, গত বছর ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকা করে ১৬০টি চামড়া কিনেছিলেন তিনি। কিন্তু সেগুলো গড়ে ২৩০ টাকা দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
এ অবস্থার জন্য আড়তদারদের ‘সিন্ডিকেট’কে দায়ী করেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ী মো. আবদুর রহমান।
হাটহাজারীর মেখল এলাকার এই বাসিন্দা রিকশা ভ্যানে করে চামড়া বিক্রি করতে গিয়েছেন মুরাদপুর আতুড়ার ডিপো এলাকায়।
আবদুর রহমান বলেন, গেল বছর ১৮০ টাকা দরে চামড়া কিনে এখানে এনে সাড়ে ৩০০ টাকা করে বিক্রি করেছিলেন। মোটামুটি লাভ হয়েছিল। এবার নির্বাচিত সরকার আসায় মনে করেছিলেন চামড়ার সুদিন ফিরে আসবে। তাই এবার ২০০ টাকা করে ৪০০টি চামড়া সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু এখানে আনার পর আড়তদাররা ২০০ টাকার বেশি দাম দিতে চাইছে না।
তিনি বলেন, “তাও আবার বড় চামড়াগুলো তারা (আড়তদার) কিনবেন, ছোটগুলো কিনবেন না।”
রহমান বলেন, “এসব চামড়া সংগ্রহ থেকে এখানে আনা পর্যন্ত দুই জন শ্রমিক ছিল। ২০০ টাকা দরে যদি বিক্রি করি, তাহলে দুইজন শ্রমিকের বেতন, গাড়িভাড়া, পরিশ্রম সবই বৃথা যাবে।”
এদিকে একাধিক কোরবানি দাতা বলেছেন, আগে চামড়া সংগ্রহের জন্য অনেকে এলেও এবার কেউ আসেনি।
কাতালগঞ্জ এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, “কেউ চামড়া নিতে আসেনি। রেখে দিলে নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াবে। তাই ময়লার সাথে চামড়াও ফেলে দিয়েছি।”
তার কথার সত্যতা মিলেছে বহদ্দারহাট এলাকায় চামড়া বিক্রি করতে বসা মো. ইসহাকের কথায়।
ষাটোর্ধ্ব ইসহাক বলেন, “প্রায় ৪০ বছর ধরে এ ব্যবসা করছি। কিন্তু এবার অবস্থা আগের চেয়েও খারাপ। সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা ডাস্টবিন থেকে চামড়া সংগ্রহ করে আমাদের কাছে আনছেন বিক্রি করতে।”
তিনি বলেন, গত কোরবানির ঈদে তিনি ২৯টা চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। সেগুলো বাধ্য হয়ে ২০০ টাকা করে বিক্রি করতে হয়েছে। তিন থেকে চার হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। এবার সে কারণে মাত্র সাতটা চামড়া কিনেছেন। বিকালের পর একজন এসেছেন। বড়গুলো ২০০ টাকা আর ছোটগুলো ১৫০ টাকা করে দর করেছেন।
‘সিন্ডিকেট’ করে আড়তদাররা চামড়ার দাম কমিয়ে ফেলছেন বলে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যে অভিযোগ করেছেন, তা মানতে নারাজ আড়তদাররা।
বৃহত্তর চট্টগ্রাম কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মুসলিম উদ্দিন বলেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আড়তদারদের ‘সিন্ডিকেট’ করার কোনো সুযোগ নাই। এগুলো মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মুখের কথা। তারা সবসময় এ ধরনের অভিযোগ করেন।”
তিনি বলেন, সরকারের যে দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, তা সংরক্ষণের পরের দাম, যা অনেক কোরবানি দাতা কিংবা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বোঝেন না। তারা মনে করেন সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে আড়তদাররা চামড়া কিনবেন মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। এ কারণে অনেকেই চামড়া বিক্রি না করে রেখে দেন এবং পরে আড়তদারদের দায়ী করেন।

এবারও চামড়া সংগ্রহে গাউসিয়া কমিটি
আঞ্জুমানে রহমানিয়া আহম্মদিয়া সুন্নীয়া ট্রাস্টের অধীনে দেশে পরিচালিত হয় দুই শতাধিক সুন্নীয়া মাদ্রাসা। এ ট্রাস্টের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গাউসিয়া কমিটি। মহামারীর মধ্যে কোভিডে মৃতদের সৎকারের মত কাজে সহায়তা দিয়ে এ সংগঠন আলোচনায় আসে।
গত কয়েক বছর ধরে গাউসিয়া কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে চামড়া সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করা চামড়াগুলো এনে জড়ো করতে দেখা যায় বিবিরহাট গরুর বাজারে। সেখানে শ্রমিকরা চামড়াগুলোতে লবণ দিয়ে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করছিলেন।
গাউসিয়া কমিটির মুখপাত্র মো. মোসাহেব উদ্দিন বখতেয়ার বলছিলেন, নগরীতে বিভিন্ন বাসা বাড়িতে গিয়ে তাদের স্বেচ্ছাসেবীরা চামড়া সংগ্রহ করছেন। এছাড়া উত্তর ও দক্ষিণ চট্টগ্রামে আলাদা করে চামড়া সংগ্রহ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আগের বারের মত মোহাম্মদ আলী নামে এক আড়তদার আমাদের কাছ থেকে মহানগরীতে সংগ্রহ করা চামড়াগুলো কিনে নেবেন। বিভিন্ন উপজেলায় সংগ্রহ করা চামড়াগুলো আমরা সেখানে বিক্রি করতে বলেছি। কারণ সেগুলো শহরে আনতে সময় লাগবে। আবার নির্দিষ্ট সংখ্যার বেশি হলেও আড়তদার কিনবেন না।”
মোসাহেব উদ্দিন বলেন, “অনেকই আমাদের ফোন করছেন তাদের কোরবানির পশুর চামড়া নিয়ে আসতে। আবার অনেকেই বিক্রি করতে না পেরেও আমাদের দিয়ে যেতে চাচ্ছেন।
“গত বছর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাতের বেলা অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী আমাদের কাছে এসেছিলেন। আমাদেরওতো সংগ্রহের একটি সীমা আছে। আমরা আড়তদারকে বুঝিয়ে দিয়ে চলে যাওয়ার পর অনেকেই এখানে চামড়া ফেলে চলে গিয়েছিলেন।”