Published : 25 Sep 2025, 01:48 PM
জুলাই আন্দোলনে চট্টগ্রামে দোকান কর্মচারী হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যসহ ২৩১ জন আসামির বিরুদ্ধে পুলিশের দেওয়া অভিযোগপত্র গ্রহণ করেছে আদালত।
বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন চট্টগ্রামের চতুর্থ মহানগর হাকিম মোহাম্মদ মোস্তফা।
এটিই চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনের প্রথম কোনো হত্যা মামলা; যার অভিযোগপত্র গ্রহণ করা হলো।
চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চান্দগাঁও থানাধীন বহদ্দারহাট মোড়ে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের সময়ে ৩ অগাস্ট ২০২৪ তারিখে নিহত শহীদুল ইসলাম শহীদ হত্যা মামলায় ২৩১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ করেছেন আদালত।”
অভিযোগপত্র গ্রহণ বিষয়ক শুনানিতে মামলার বাদী শফিকুল ইসলামের পক্ষে তার আইনজীবী আদালতকে বলেন, “মামলায় নিরীহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। যাদের নাম বাদী এজাহারে উল্লেখ করেননি।”
শুনানি শেষে সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী বলেন, “মামলার বাদী শফিকুল ইসলাম তদন্ত কর্মকর্তার দাখিল করা অভিযোগপত্রের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করলে আদালত তা খারিজ করে দেন এবং চার্জশিট সরাসরি গ্রহণের আদেশ দেন।”
নিহত শহীদুল ইসলামের ভাই শফিকুর ইসলাম বাদী হয়ে শুরুতে ৮ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। তদেন্ত শেষে তদন্তকারী কর্মকর্তা ২৩১ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দেন গত জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে।
এখন পর্যন্ত এই মামলায় মোট ৮৪ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
চান্দগাঁও থানার ওসি আফতাব উদ্দিন গত ২ অগাস্ট বলেছিলেন, শহীদুল ইসলাম হত্যা মামরায় আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। তদন্তে যাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণ হয়েছে তাদের মামলায় আসামি করা হয়েছে।
ওই অভিযোগপত্র সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া সাবেক দুই সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন এবং রেজাউল করিম চৌধুরীও মামলায় আসমি।
সংসদ সদস্যদের মধ্যে আসামি হয়েছেন- আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী, এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, এম আবদুল লতিফ, এস এম আল মামুন, আবদুচ ছালাম, মহিউদ্দিন বাচ্চু, দিদারুল আলম দিদার ও নোমান আল মাহমুদ।
মামলায় আসামি করা হয়েছে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, সাবেক কাউন্সিলরদের মধ্যে এসরারুল হক, কাজী নুরুল আলম মামুন, এম আশরাফুল আলম, সাইফুদ্দিন খালেদ সাইফু, জাবেদ নজরুল ইসলাম, পুলক খাস্তগীর, ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরী, মো. ইলিয়াছ, মোরশেদ আলী, মোবারক আলী, গিয়াস উদ্দিন, জহর লাল হাজারী, আবদুস সবুর লিটন, চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, হাসান মুরাদ বিপ্লব, জিয়াউল হক সুমন, গোলাম মোহাম্মদ জোবায়ের, নেছার উদ্দিন আহমদ মঞ্জু, নূর মোস্তফা টিনু, আবুল হাসান মো. বেলাল, মোরশেদ আলম, নাজমুল হক ডিউক, জহুরুল আলম জসিম, শৈবাল দাশ সুমন, কফিল উদ্দিন খান ও সলিমুল্লাহ বাচ্চুকে।
এছাড়া মামলার অভিযোগপত্রে আসামির তালিকায় আছেন- নগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নূরুল আজিম রনি, নগর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক দিদারুল আলম, যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি দেবাশীষ নাথ দেবু, নগর যুবলীগের সহ-সভাপতি দেবাশীষ পাল দেবু, নগর ছাত্রলীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক আরশেদুল আলম বাচ্চু, ছাত্রলীগ সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু ও সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া দস্তগীর।
গত বছরের ৩ অগাস্ট সন্ধ্যায় নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান দোকান কর্মচারী মো. শহীদুল ইসলাম শহীদ (৩৭)। তিনি নগরীর কদমতলি এলাকায় একটি জুতার দোকানে চাকরি করতেন।
সেদিন সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটের দিকে বাজার করে বাসায় ফেরার পথে বহদ্দার পুকুর পাড় এলাকায় গুলিবিদ্ধ হন শহীদুল ইসলাম। পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে নগরীর বেসরকারি পার্ক ভিউ হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে তার মৃত্যু হয়।
এরপর মরদেহ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেয়া হয়। হাসপাতালের মৃত্যু সনদে গুলিতে শহীদুল ইসলামের মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
পরে পুলিশ সুরতহাল করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য লাশ মর্গে পাঠায়। এ ঘটনায় গত বছরের ১৯ অগাস্ট নিহতের ভাই শফিকুল ইসলাম বাদি হয়ে ৮ জন আসামির নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৩০০-৪০০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চান্দগাঁও থানার এসআই মো. ফয়সাল আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন বুধবার।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্তের সময় নিহত শহীদুল ইসলামের শরীর থেকে ১০টি ‘ধাতব পিলেট’ বের করা হয়। এগুলো আলামত হিসেবে জব্দ করে পুলিশ।
এসব ধাতব পিলেটের ফরেনসিক পরীক্ষার রিপোর্ট উদ্ধৃত করে অভিযোগপত্রে বলা হয়, এগুলো কোনো শর্টগান বা বন্দুক বা স্থানীয়ভাবে তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র থেকে ফায়ার করা হয়েছে বলে সিআইডির ফরেনসিক বিশারদ মতামত দেন।
ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে শহীদুল ইসলামের হৃৎপিন্ড, ফুসফুস ও পাকস্থলীতেসহ শরীর অন্যান্য স্থানে আঘাত পান বলে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ছাত্র জনতার ‘যৌক্তিক আন্দোলনকে প্রতিহত করতে’ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগসহ অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের চট্টগ্রাম নগর ও পার্শ্ববর্তী জেলার লাঠি-শোঠা ও আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে মিছিল মিটিং করে।
“শীর্ষস্থানীয় নেতাদের নির্দেশনায় দলটি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী এবং ক্যাডাররা ছাত্র-জনতার উপর সশস্ত্র হামলা করেছিল।”
নিহত শহীদুল ইসলাম শহীদ ঘটনার দিন চাকরি শেষে বাড়ি ফেরার পথে বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, ঘটনার দিন প্রথমে আসামি মহিউদ্দিন ফরহাদ তার হাতে থাকা পিস্তল থেকে গুলি করে। এরপর অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী মো. ফিরোজ, তৌহিদুল ইসলাম ও দেলোয়ার শর্টগান দিয়ে গুলি করে।
এছাড়া সেদিন আসামি মো. জালাল, এইচ এম মিঠু, নূর মোস্তফা টিনু, ঋভু মজুমদার ও মো. তাসিন গুলি ছুড়েছিল যাতে সেখানে আরো অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
গত বছর ছাত্র-জনতার আন্দোলনে হামলায় নিহত ও আহতের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৫১টি মামলা হয়েছে চট্টগ্রামে। যার মধ্যে এই প্রথম কোন মামলায় অভিযোগপত্র দেয়া হল।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম/সিএম/আরআর
আরও পড়ুন:
গণ আন্দোলনে নিহত: হাছান, নওফেল, জাবেদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে অভিযোগপত্র