Published : 17 Apr 2026, 08:26 PM
নিউ জিল্যান্ডের ‘বি’ দল নাকি ‘সি’ দল, সিরিজ শুরুর আগে এই ছিল আলোচনায়। প্রথম ম্যাচের পর বলা যায়, যে দলই হোক, বাংলাদেশের জন্য ‘যথেষ্ট!’ শীর্ষ ১৬-১৭ ক্রিকেটারকে ছাড়া গড়া দলটিই যে হারিয়ে দিল বাংলাদেশকে! পাকিস্তান সুপার লিগ থেকে ক্রিকেটারদের ফিরিয়ে এনে সম্ভাব্য সেরা দল নিয়ে মাঠে নেমেও খর্বশক্তির কিউইদের সঙ্গে পেরে উঠলেন না মেহেদী হাসান মিরাজরা।
তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথমটিকে বাংলাদেশকে ২৬ রানে হারাল নিউ জিল্যান্ড।
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে হেনরি নিকোলস ও ডিন ফক্সক্রফটের ফিফটিতে নিউ জিল্যান্ড ৫০ ওভারে তোলে ৮ উইকেটে ২৪৭ রান। রান তাড়ায় সাইফ হাসান ও তাওহিদ হৃদয় ফিফটি করলেও বাংলাদেশ গুটিয়ে যায় ২২১ রানে।
কার্যকর ইনিংসের পর একটি উইকেট নিয়ে ম্যাচের সেরা ডিন ফক্সক্রফট। গত বছর নিউ জিল্যান্ড ‘এ’ দলের বাংলাদেশ সফরেও এক ম্যাচে অলরাউন্ড পারফরম্যান্সে ম্যাচ সেরা হয়েছিলেন তিনি।
বাংলাদেশের পরাজয়ের পাশাপাশি ম্যাচের উইকেটও ছিল প্রশ্ন তোলার মতো। ম্যাচজুড়েই বাউন্স ছিল কছুটা অসম, বেশ মন্থরও ছিল উইকেট। শট খেলা ছিল কঠিন। অথচ সিরিজের আগে বাংলাদেশের কোচ ও অধিনায়ক বলেছিলেন, পাকিস্তানের বিপক্ষে আগের সিরিজের মতো প্রাণবন্ত উইকেটই আশা করছেন তারা।
এই উইকেটেও অবশ্য ২৪৮ রানের লক্ষ্যটা তাড়া করার মতোই ছিল। এক সময় জয়ের পথেও ছল বাংলাদেশ। শেষ ১০ ওভারে প্রয়োজন ছিল ৬৭ রান, উইকেট ছিল ৬টি।। কিন্তু মাঝের সময়টায় ধীরগতির ব্যাটিংয়ে চেপে বসা চাপ পরে খেই হারান ব্যাটসম্যানরা।

রান তাড়ার শুরুতে জোড়া ধাক্কায় টালমাটাল হয়ে পড়ে বাংলাদেশ। চতুর্থ ওভারে ন্যাথান স্মিথকে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে খেলে বোল্ড হয়ে যান তানজিদ হাসান। পরের বলেই ভুল লাইনে আড়াআড়ি খেলে বোল্ড নাজমুল হোসেন শান্ত।
হেনরি নিকোলস যদি স্লিপে ১ রানে সাইফ হাসানের সহজ ক্যাচটি নিতে পারতেন, বাংলাদেশের অবস্থা হতে পারত আরও সঙ্গীন।
সেই সাইফ একটু পরে পুল শটে ছক্কায় ওড়ান স্মিথকে। ধীরগতির সূচনার পর ক্রমে ম্যাচের লাগাম নেয় সাইফ ও লিটন কুমার দাসের জুটি। বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে থাকে বেশ অনায়াসে।
ফিফটি পেরিয়ে যান সাইফ। জুটি এগোতে থাকে শতরানের দিকে।
দ্বিতীয় স্পেলে ফিরে এই জুটি ৯৩ রানে থামান উইল ও’রোক। জায়গা বানিয়ে তুলে মারার চেষ্টায় ৭৬ বলে ৫৭ করে ফেরেন সাইফ।
তখনও বাংলাদেশের বিপদ বোঝা যায়নি। লিটন ততক্ষণে সাবলিল খেলছেন। কিন্তু ফক্সক্রফটের দারুণ টার্নিং এক ডেলিভারিতে বোল্ড হয়ে যান তিনি ৪৬ রানে।
বাংলাদেশের লাগাম হাতছাড়া হতে থাকে এরপরই। তাওহিদ হৃদয় ও আফিফ হোসেন অর্ধশত রানের জুটি গড়লেও রানের গতি ছিল মন্থর। বিশেষ করে আফিফ ধুঁকছিলেন বাজেভাবে।
অবিশ্বাস্যভাবে, জুটিতে টানা ১১ ওভারের বেশি সময় কোনো বাউন্ডারিই আসেনি! ৭৯ বলের জুটিতে বাউন্ডারি ছিল মোটে ১টি।
ধুঁকতে থাকা আফিফ (৪৯ বলে ২৭) শেষ পর্যন্ত আউট হন বাজে শটে। অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ (১৪ বলে ৬) ও রিশাদ হোসেন (৯ বলে ৪) বিদায় নেন দলকে আরও চাপে ফেলে।
হৃদয় শেষ দিকে চেষ্টা করেন ম্যাচ জমিয়ে তোলার। দুটি ছক্কা আসে তার ব্যাট থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলকে কাছাকাছি নিতে পারেননি তিনি। শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হন ৬০ বলে ৫৫ রান করে।
ম্যাচের প্রথম ভাগে টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা নিউ জিল্যান্ডের শুরুটা ছিল সাবধানী। নতুন বলে আঁটসাঁট শুরু করেন তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম। প্রথম ৬ ওভারে কিউইরা তুলতে পারে মাত্র ১৬ রান।
নিক কেলিকে বোল্ড করে বাংলাদেশকে প্রথম ব্রেক থ্রু এনে দেন শরিফুল। পরের ওভারে তিনি পেতে পারতেন আরেকটি উইকেট। কিন্তু ১ রানে থাকা উইল ইয়াংয়ের সহজ ক্যাচ স্লিপে ফেলে দেন সাইফ।
সেই ইয়াং পরে ধরা পড়েন স্লিপেই। রিশাদ হোসেনের বলে রিভার্স সুইপ খেলে ক্যাচ দেন তিনি তানজিদ হাসানকে। ততক্ষণে তার রান হয়ে যায় ৩০, জুটি হয় ৭৩ রানের।
এই দলের সেরা দুই ব্যাটসম্যান নিকোলস ও টম ল্যাথামের জুটি হুমকি হয়ে ওঠার চেষ্টা করলেও বড় কিছু হতে দেয়নি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ অধিনায়ক মিরাজের আর্ম বলে বোল্ড হয়ে যান প্রতিপক্ষ অধিনায়ক ল্যাথাম (১৪)।
ফিফটির পর নিকোলস বেছে নেন ইয়াংয়ের পথ। আউট হয়ে যান রিশাদকে রিভার্স সুইপ খেলেই (৮৩ বলে ৬৮)।
এরপর আর বড় কোনো জুটি পায়নি নিউ জিল্যান্ড। জ্বলে ওঠার আগেই মুহাম্মাদ আব্বাসকে থামান শরিফুল, জশ ক্লার্কসনের স্টাম্প এলোমেলো করেন তাসকিন আহমেদ। তবে ডিন ফক্সক্রফট একপ্রান্ত থেকে কার্যকর কয়েকটি জুটিতে দলকে এগিয়ে নেন।
২৭ রানে অবশ্য একটি সুযোগ দিয়েছিলেন তিনি। রিশাদকেই রিভার্স সুইপ খেলে ক্যাচ দিয়েছিলেন, নিতে পারেননি তানজিদ।
আড়াই বছর আগে অভিষেকে ওয়ানডেতে মিরপুরেই প্রথম বলে বোল্ড হয়েছিলেন ফক্সক্রফট। এতদিন পর দ্বিতীয় ওয়ানডে খেলতে নেমে করেন ফিফটি। তার ৫৮ বলে ৫৯ রানের ইনিংস থামে নাহিদ রানার ইয়র্কার স্টাম্পে টেনে এনে।
শেষ দিকে ২২ বলে ২১ রানে অপরাজিত থাকেন ন্যাথান স্মিথ।
শেষ ১০ ওভারে ৬২ রান তুলতে পারে নিউ জিল্যান্ড।
মাঝবিরতিতে সেই স্কোর নিয়ে সংশয়ের অবকাশ ছিল বেশ। কিন্তু দারুণ বোলিং-ফিল্ডিংয়ে সেটিকেই যথেষ্ট করে তোলেন কিউইরা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
নিউ জিল্যান্ড: ৫০ ওভারে ২৪৭/৮ (নিকোলস ৬৮, কেলি ৭, ইয়াং ৩০, ল্যাথাম ১৪, আব্বাস ১৪, ফক্সক্রফট ৫৯, ক্লার্কসন ৮, স্মিথ ২১*, টিকনার ৭, লেনক্স ১*; তাসকিন ১০-০-৫০-২, শরিফুল ১০-২-২৭-২, মিরাজ ১০-১-৫৪-১, নাহিদ ১০-০-৬৫-১, রিশাদ ১০-০-৪৪-২)।
বাংলাদেশ: ৪৮.৩ ওভারে ২২১ (সাইফ ৫৭, তানজিদ ২, শান্ত ০, লিটন ৪৬, হৃদয় ৫৫, আফিফ ২৭, মিরাজ ৬, রিশাদ ৪, শরিফুল ০, তাসকিন ২, নাহিদ ০*; ও’রোক ৯-০-৫১-১, স্মিথ ৯.৩-১-৪৫-৩, টিকনার ১০-০-৪০-৪, ক্লার্কসন ৪-০-২৭-০, লেনক্স ১০-০-৩২-১, ফক্সক্রফট ৬-০-২৫-১)।
ফল: নিউ জিল্যান্ড ২৬ রানে জয়ী।
সিরিজ: ৩ ম্যাচ সিরিজে নিউ জিল্যান্ড ১-তে এগিয়ে।
ম্যান অব দা ম্যাচ: ডিন ফক্সক্রফট।