Published : 01 Jun 2026, 12:45 PM
২০২২ সালের ৯ মে ছিল রাজাত পাতিদারের বিয়ের দিন। তখন তার অখন্ড অবসর। আইপিএলের নিলামে তাকে নেয়নি কোনো দল। লম্বা সময় তার খেলা নেই। পারিবারিকভাবেই ওই সময় বিয়ের আয়োজন সেরে নিতে চাইলেন। ভেন্যু ঠিক করাসহ সব চূড়ান্ত হলো। হঠাৎ একটি ফোনকল বদলে দিল সবকিছু। চোট পাওয়া একজনের বদলে তাকে দলে নিতে চায় রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু!
জীবন নাকি ক্রিকেট, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুব বেশি সময় লাগেনি পাতিদারের। ক্রিকেটই তো তার জীবন! এবার সেই পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া যাক তিন বছর সামনে। নিলামে দল না পাওয়া সেই পাতিদারের নেতৃত্বেই ১৮ বছরের খরা কাটিয়ে বহু কাঙ্ক্ষিত আইপিএল ট্রফির স্বাদ পায় বেঙ্গালুরু। আরও এক বছর এগিয়ে এবারের আসর, পাতিদারের হাত ধরেই এলো বেঙ্গালুরুর টানা দ্বিতীয় আইপিএল শিরোপা।
আইপিএলের ইতিহাসে নেতৃত্বের প্রথম দুই আসরেই শিরোপাজয়ী প্রথম অধিনায়ক তিনি।
কেমন গল্পের মতো শোনায় না? পাতিদার বলবেন, রূপকথা কিংবা বাস্তব!
ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে তিনি খেলছেন ২০১৫-১৬ মৌসুম থেকে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ও লিস্ট ‘ও’ ক্রিকেটে পারফর্মও করেছেন নিয়মিত। টি-টোয়েন্টি অভিষেকের জন্য অপেক্ষা করতে হয় ২০১৮ সাল পর্যন্ত। আইপিএলের ঠিকানা তখনও তার অজানা।
টি-টোয়েন্টির ব্যাটিং আত্মস্থ করতে সময় লাগল কিছুটা। ২০২১ সৈয়দ মুশতাক আলি ট্রফিতে ঝড়ো কিছু ইনিংস খেলে নজর কাড়লেন। অবশেষে আইপিএলের দুয়ার খুলল। ভিত্তিমূল্য ২০ লাখ রুপিতে তাকে আশ্রয় দিল রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।
সেই আসরে চার ম্যাচ খেলে করতে পারলেন কেবল ৭১ রান। পরের আসরের আগে তাকে ছেড়ে দিল বেঙ্গালুরু। নিলামেও তার দিকে ফিরে তাকাল না কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি।
হতাশ পাতিদার তখন মন দিলেন জীবন সাজিয়ে তোলায়। বিয়ের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হলো। কিন্তু জীবন তার জন্য সাজিয়ে রেখেছিল ভিন্ন কিছু।
বেঙ্গালুরুর কিপার-ব্যাটার লাভনিথ সিসোদিয়া চোটের কারণে ছিটকে পড়লেন। টিম ম্যানেজমেন্টের মনে পড়ল পাতিদারকে। বিয়ে পিছিয়ে দিয়ে তিনি যোগ দিলেন দলের সঙ্গে।
নিয়তির ইশারা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। বাকিটা ছিল তার নিজের হাতে। তিনি কাজে লাগালেন পুরোপুরি। মৌসুমের মাঝামাঝি সুযোগ পেয়ে প্রথম ম্যাচে ভালো না করলেও পরের ম্যাচে গুজরাট টাইটান্সের বিপক্ষে খেললেন ৩২ বলে ৫২ রানের ইনিংস। তার প্রথম আইপিএল ফিফটি।
এক ম্যাচ পরে করলেন ৩৮ বলে ৪৮। সেরাটা জমা রেখেছিলেন ‘ডু অর ডাই’ ম্যাচের জন্য। এলিমিনেটর ম্যাচে ১২ চার ও ৭ ছক্কায় উপহার দিলেন ৫৪ বলে ১১২ রানের ইনিংস!
তাকে নিয়ে শোরগোল পড়ে গেল। রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে উঠলেন। তার বাবা সংবাদমাধ্যমে জানালেন, বিয়ে স্থগিত রেখে আইপিএলে খেলছে ছেলে।
দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে হেরে বেঙ্গালুরু বিদায় নিলেও পাতিদার করলেন আরেকটি ফিফটি। বেঙ্গালুরুর মন জয় করা হয়ে গেল। পরের আসরে তাকে দলে রাখল দল।
কিন্তু রূপকথায় তো শুধু আনন্দদায়ী চমক থাকে না, আততায়ীর হানাও থাকে। পরের আসরে তিনি খেলতেই পারলেন না গুরুতর চোটের কারণে।
বেঙ্গালুরু তবু তাকে ভোলেনি। ২০২৪ আসরে তাকে আবার দলে নেয় তারা। ওই বছরের শুরুতে তার টেস্ট অভিষেকও হয়ে যায়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তিনটি টেস্ট খেলে অবশ্য ভালো কিছু করতে পারেননি। পরে আইপিলে অসাধারণ কিছু করতে না পারলেও বেঙ্গালুরুকে প্রতিদান দেন বেশ কিছু ম্যাচে কার্যকর অবদান রেখে। আসরে ৩৯৫ রান করেন ১৭৭.১৩ স্ট্রাইক রেটে।
আসল চমক জমা ছিল পরের আসরের জন্য। ফাফ দু প্লেসির বিদায়ের পর পাতিদারকে অধিনায়ক ঘোষণা করে বেঙ্গালুরু। চোখ কপালে উঠে যায় অনেকের। আইপিএলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও তারকাবহুল দলগুলির একটিকে নেতৃত্ব দেবেন কি না এমন একজন!
লোকের মনে সংশয় থাকলেও টিম ম্যানেজমেন্ট তাকে ঠিকই চিনেছিল। ব্যাট হাতে তিনি খুব ভালো না করলেও নেতৃত্বে নজর কাড়লেন। আইপিএলের সেই শুরুর আসর থেকে শিরোপার জন্য হাপিত্যেশ করছিল যে দল, মৌসুমের পর মৌসুম অনেক আশা নিয়ে শুরু করেও যারা মুখ থুবড়ে পড়েছে বারবার, বিশ্বের সেরা সব তারকা খেলেছেন যে দলে, সেই দলটি অবশেষে প্রথম শিরোপার স্বাদ পেল পাতিদারের অধিনায়কত্বে।
সংশয়গুলি তবু সব উড়ে যাওয়ার নয়। ওই সাফল্য কি স্রেফ এক আসরের চমক? দায় ছিল প্রমাণের। এবার তিনি নিজেকে তুলে নিলেন নতুন উচ্চতায়। ব্যাটিং ও নেতৃত্ব, সব দিকেই তিনি সফল।
১৪ ইনিংসের এবার রান করেছেন তিনি ৫০১। তবে শুধু রান সংখ্যায় নয়, দেখার মতো ছিল, রানগুলি তিনি যেভাবে করেছেন। স্পিনের বিপক্ষে তিনি বরাবরই দক্ষ ছিলেন, এবার জ্বলে উঠেছেন পেসারদের বিপক্ষেও। আসরজুড়ে উপহার দিয়েছেন বিস্ফোরক ব্যাটিং। তার স্ট্রাইক রেট এবার ১৯২.৬৯।

মিডল অর্ডারে এতটাই দুর্দান্ত ব্যাটিং উপহার দিয়েছেন যে, তাকে ভারতের টি-টোয়েন্টি দলে নেওয়ার দাবিও উঠছে। তার নেতৃত্ব নিয়ে আঙুল তোলার লোকও এখন নেই, বরং ভাসছেন তিনি স্তুতির জোয়ারে।
অধিনায়ক হিসেব টানা দুই শিরোপা জয়ের পর তিনি ফিরে তাকালেন পেছনে। চার বছর আগে নিলামে দল না পাওয়া থেকে শুরু করে এখন সাফল্যে শিখরে, এই পথচলা তার নিজেরও ছিল কল্পনার বাইরে।
“সত্যি বলতে, বেঙ্গালুরুর অধিনায়ক হওয়া, ট্রফি উঁচিয়ে ধরা, এসব আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি। আমার মনে হয়, এসব আগে থেকেই লেখা ছিল (ভাগ্যে) এবং আমি এর জন্য কৃতজ্ঞ।”
টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের আনন্দও তিনি যেন ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে পারছিলেন না।
“অসাধারণ এক অনুভূতি। এখানে এসে গত বছরের অনেক স্মৃতি মনে পড়ছিল, গত বছর আমরা যেভাবে খেলেছিলাম। কিন্তু একইসঙ্গে, আমাদের বর্তমানের দিকে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হতো এবং আমরা ভালো অনুভব করছিলাম। প্রকাশ করার মতো ভাষা আমার কাছে নেই, কিন্তু আমার খুব ভালো লাগছে।”
গত বছরের সাফল্যের সঙ্গে এবারের তুলনাও করলেন বেঙ্গালুরু অধিনায়ক।
“গত বছর স্বাভাবিকভাবেই অনেক চাপ ছিল, কারণ সেটাই ছিল শিরোপা জেতার প্রথম বছর। এ বছর এই টুর্নামেন্টে যেভাবে খেলেছি, তাতে আমরা বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলাম এবং সবাই বেশ ভালো মানসিক অবস্থায় ছিল। গত বছরের তুলনায় আত্মবিশ্বাস কিছুটা বেশি ছিল এবং এটা ভালো ছিল।”
“আমরা যেখানেই গিয়েছি, প্রতিটি মাঠে ভক্তদের আসতে দেখে ভালো লেগেছে। আমাদের কাছে মাঠটা ঘরের মাঠের মতোই মনে হচ্ছিল। তাই সব মিলিয়ে এটা দারুণ ছিল, বেঙ্গালুরুর জন্য দারুণ।”
ফাইনালের আনুষ্ঠানিকতা যখন শেষ হলো, ততক্ষণে ঘড়ির কাটায় মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। পাতিদানের জন্মদিনও এসে গেছে! ১ জুন পূর্ণ করলেন তিনি ৩৩ বছর। শিরোপা জয়ের আনন্দও তাই এবার বেড়ে গেছে তার। তবে এখানেই না থেমে হ্যাটট্রিক শিরোপার ছবি তিনি আঁকতে শুরু করেছেন এখনই।
“দারুণ লাগছে... অসাধারণ অনুভূতি। আজ আমার জন্মদিন। এর চেয়ে ভালো উপহার আর হতে পারে না।”
“আমি এমন একজন মানুষ যে সবসময় বর্তমানকে নিয়েই ভাবি। আমরা পরপর দুইবার জিতেছি, আমরা উদযাপন করব, কিন্তু এখন আমাদের লক্ষ্য হবে কীভাবে আমরা এটা টানা তিনবার করতে পারি। এর চেয়ে ভালো আর কিছু হতে পারে না। ট্রফি জিতলে কেউ ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের দিকে তাকায় না। এর চেয়ে বড় আর কিছুই নেই।”