Published : 01 Dec 2025, 06:09 PM
সিরিজের শুরুতে ব্যাপারটি নিয়ে ছিল ধাঁধা। শেষ ম্যাচের আগে সেটির জট খোলা তো দূরের কথা, ব্যাপারটি আর ধাঁধার পর্যায়েই নেই। মাহিদুল ইসলাম অঙ্কনকে নিয়ে যা হলো, সেটিকে বলা যায় স্রেফ তামাশা।
আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের দল ঘোষণার পর যে ক্রিকেটারকে নিয়ে ছিল আলোচনা, প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন যাকে নিয়ে বলেছিলেন ‘এখন না খেলালে আর কবে…’, সেই ক্রিকেটারকে প্রথম দুই ম্যাচে খেলানোই হলো না। এটা তামাশা নয় তো কী!
শামীম হোসেনকে দলে না রাখায় সিরিজ শুরুর আগের দিন লিটন কুমার দাসের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় ফুটে উঠেছিল দল নির্বাচন নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দূরত্ব, যোগাযোগের ঘাটতি, এমনকি জেদাজেদিসহ অনেক কিছুই। মাহিদুলের ক্ষেত্রেও এখন প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে সেসবই।
শেষ টি-টোয়েন্টির একাদশেও তার জায়গা পাওয়ার সম্ভাবনা সামান্য। তবে কোনোভাবে তিনি ম্যাচটি খেলে ফেললেও প্রশ্ন বদলাবে না। প্রশ্নটি হলো, কেন মাহিদুলকে দলে নেওয়া হলো?
উত্তর খুঁজতে সিরিজের শুরুতে ফিরে যাওয়া যাক। তাকে দলে নেওয়ার কারণ ব্যাখ্যায় প্রধান নির্বাচক বলেছিলেন, “চার-পাঁচে সোহান-জাকের আলির কেউ কমফরটেবল না। চার-পাঁচের জন্য তো কাউকে তৈরি করতে হবে। অঙ্কনকে এই সিরিজে যদি না খেলাই… সামনে হঠাৎ যদি কোনো ইনজুরি হয়ে যায়, সে আমাদের একজন বিকল্প হতে পারে। এখন না খেলালে তাকে কবে খেলাব!”
প্রধান নির্বাচকের কথায় ফুটে উঠেছিল, মাহিদুলকে এই সিরিজে খেলানো শুধু জরুরিই নয়, বরং অতিআবশ্যক। বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের শেষ সিরিজ এটি এবং এখানেই তাকে বাজিয়ে দেখার শেষ সুযোগ।

এখানেও প্রশ্নের অবকাশ রয়ে যায়। চার-পাঁচ নম্বর পজিশনে যদি কাউকে পরখ করে দেখতেই হয়, তাহলে আরও ছয় মাস বা অন্তত তিন মাস আগে কেন নয়! গত এক বছর ধরেই প্রশ্নটি নানা সময়ে উঠেছে বিভিন্ন সংবাদ সম্মেলনে। নির্বাচকরা, কোচ-অধিনায়করা তখন সেটিকে খুব পাত্তা দেননি। এখন বিশ্বকাপের আগে শেষ সিরিজ তো বড় পরীক্ষার জায়গা হওয়ার কথা নয়। এখানে শেষ সময়ের টুকটাক ঘাটতিগুলো ঝালাই করার কথা। অথচ এখানে এসেই নির্বাচকদের মনে পড়েছে মাহিদুলের কথা।
যাহোক, নির্বাচকদের মনে পড়লেও টিম ম্যানেজমেন্টের হয়তো মনে ধরেনি তাকে। একাদশ নির্বাচনে টুকটাক পরামর্শ কখনও কখনও দিতে পারলেও তেমন কোনো ভূমিকা থাকে না নির্বাচকদের। কোচ-অধিনায়ক, টিম ম্যানেজমেন্ট সিদ্ধান্ত নেন সেখানে। তাদের চোখে মাহিদুলকে যোগ্য মনে হয়নি একাদশের বিবেচনায়।
চার-পাঁচে মাহিদুলকে জায়গা দেওয়াও অবশ্য কঠিন ছিল এই সিরিজে। সাইফ হাসান যদি ইনিংস শুরু করতেন, তাহলে হয়তো মাহিদুলের জায়গা হতে পারত মিডল অর্ডারে। কিন্তু তানজিদ হাসানের সঙ্গে দুই ম্যাচেই ইনিংস শুরু করেছেন পারভেজ হোসেন ইমন, চারে খেলেছেন সাইফ, পাঁচে তাওহিদ হৃদয়।
মাহিদুলকে পরখ করে দেখা যদি সত্যিই এতটা জরুরি হতো, কোনো একটা পথ নিশ্চয়ই বের করা হতো। এখানেই নির্বাচকদের ভাবনার ঠিক উল্টো অবস্থানে টিম ম্যানেজমেন্ট। নির্বাচকরা মাহিদুলকে নিয়ে ছিলেন মরিয়া, কোচ-অধিনায়ক সেটিকে পাত্তাই দেননি।
ব্যাটিং লাইন আপে একটি জায়গাতেই পরিবর্তন হয়েছে এই দুই ম্যাচে। প্রথম ম্যাচে ছয় নম্বরে খেলেছেন জাকের আলি, পরের ম্যাচে ছয়ে নুরুল হাসান সোহান।
এই জায়গায় মাহিদুলকে একটা সুযোগ অন্তত দেওয়াই যেত। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তার সবশেষ উল্লেখযোগ্য পারফরম্যান্স গত বিপিএলে এই ছয়-সাত নম্বর পজিশনেই, মূলত ফিনিশারের ভূমিকায়। খুলনা টাইগার্সের হয়ে ৩১৬ রান করেছিলেন তিনি ১৭৪.৫৮ স্ট্রাইক রেটে। ফিনিশার হিসেবে নতুন একজনের উত্থান তখন বেশ আলোচিতও হয়েছিল।
সমস্যা হলো, জাতীয় দলে তো তাকে ফিনিশার হিসেবে নেওয়া হয়নি! ‘প্রপার’ মিডল অর্ডার হিসেবে চার-পাঁচের জন্য তাকে নিয়েছেন নির্বাচকরা। তাকে ছয়-সাতে খেলানো হলেও তাতে ভুল বার্তা ফুটে উঠত।
মজার ব্যাপার হলো, গত বিপিএলে ফিনিশার হিসেবে খেললেও পরবর্তীতে এই সংস্করণে কোনো টুর্নামেন্ট সিরিজে কোথাও তাকে আর এই ভূমিকায় দেখা যায়নি। সব জায়গায় তিনি খেলেছেন মূলত মিডল অর্ডারে এবং সফল হননি কোথাও।
কদিন আগে রাইজিং স্টার্স এশিয়া কাপের চার ইনিংসে তার মোট রান ৩৬, স্ট্রাইক রেট ৭৬.৫৯। সিলেটে জাতীয় লিগ টি-টোয়েন্টিতে ৫ ইনিংসে করেছেন ১১৬ রান। স্ট্রাইক রেট ১১৬.৮৩। এর আগে খেলেছেন অস্ট্রেলিয়ায় টপ এন্ড টি-টোয়েন্টিতে। সেখানে ৩ ইনিংসে তার রান ছিল ১৯। স্ট্রাইক রেট ৯০.৪৭। জুলাইয়ে গ্লোবাস সুপার লিগে ৪ ইনিংসে করেছিলেন ৬৬ রান, স্ট্রাইক রেট ১২৪.৫২।
এ বছর বিভিন্ন প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২৪টি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন মাহিদুল। ফিফটি করতে পারেননি একটিতেও। তার পরও অবিশ্বাস্যভাবে তাকে নেওয়া হয় জাতীয় দলে। তখনই এটি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল প্রবল।
সেই প্রশ্ন আরও উচ্চাকত হয় সিরিজ শুরুর আগের দিন। মাহিদুলকে দলে নেওয়া হয়েছিল মূলত শামীমকে বাদ দিয়ে। যদিও দুজনের ব্যাটিং পজিশন ও ভূমিকা আলাদা। শামীমকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে লিটনের ক্ষোভের বিস্ফোরণের পর মাহিদুলের ব্যাপারটিও আবার তীব্রভাবে চলে আসে আলোচনায়।
নির্বাচকদের সঙ্গে সেই টানাপোড়েন ও জেদাজেদির কারণেই মাহিদুলকে কোনো ম্যাচে খেলাননি কোচ-অধিনায়ক, এমনও ভাবছেন দল সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ। প্রধান নির্বাচক যদিও এই কথাটি শুনেই উড়িয়ে দিলেন।
প্রথম দুই ম্যাচে না খেলানোর পর তৃতীয় ম্যাচের স্কোয়াডে তাকে রেখে দেন নির্বাচকরা। সঙ্গে শামীম হোসেনকে যোগ করায় স্রেফ একটি ম্যাচের জন্য ১৬ জনের বহর হয়ে যায় বাংলাদেশের স্কোয়াডের।
মাহিদুলকে মাঠে না নামানোয় তৃতীয় ম্যাচের আগে প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন যা বলেন, তাতে টিম ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে তাদের দূরত্বই স্পষ্ট হলো আরও।
“একাদশ নির্বাচনে তো আমাদের ভূমিকা থাকে না। এটা টিম ম্যানেজমেন্টের ব্যাপার। আমরা আমাদের ভাবনা থেকে ওকে (মাহিদুল) নিয়েছিলাম। এখন সামনে বিপিএল আছে, সেখানে তার পারফরম্যান্স দেখা যেতে পারে।”
টি-টোয়েন্টি দলে মাহিদুলের যে আপাতত প্রয়োজন নেই বা বিশ্বকাপের জন্য তাকে জরুরি মনে করছেন না কোচ-অধিনায়ক, সেটি তো এখন পরিষ্কার। অযথাই তাকে জাতীয় দলে নিয়ে বসিয়ে না রাখা হলে জাতীয় লিগে দুটি রাউন্ডে অন্তত খেলতে পারতেন ২৬ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান।
মাহিদুলকে নিয়ে এই সিরিজে যা হলো, বাংলাদেশের দল নির্বাচন প্রক্রিয়া তথা বাংলাদেশ ক্রিকেটের টুকরো ছবিই যেন ফুটে উঠল এতে।