Published : 11 Jan 2026, 08:53 AM
টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন যখন একটা দলের মালিকানায় যখন পরিবর্তন আসে, বদলে যায় কোচ, নিয়োগ দেওয়া হয় টিম ডিরেক্টর, তখন সেই দলের অবস্থাও সহজেই অনুমেয়। বিপিএল শুরুর সময় এবার তেমন ছন্নছাড়া অবস্থাই ছিল চট্টগ্রাম রয়্যালসের। সেই দলটিই এখন পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে! এবারের বিপিএলের বিস্ময় বলা যায় দলটিকে। চমকপ্রদ সেই আখ্যান রচনায় মাঠে ক্রিকেটারদের উজ্জীবিত পারফরম্যান্স তো বড় ভূমিকা রেখেছেই, তবে পর্দার আড়ালের নায়কদেরও আছে বড় ভূমিকা। নেপথ্যের সেই মানুষগুলো একজন হাবিবুল বাশার। সাবেক এই অধিনায়ক খেলা ছাড়ার পর বিভিন্ন ভূমিকা পালন করেছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটে। প্রথমবার তিনি বিপিএলে কাজ করছেন চট্টগ্রাম রয়্যালসের টিম ডিরেক্টর হিসেবে। কীভাবে দলটাকে গুছিয়ে শীর্ষে তোলা সম্ভব হলো, শেষ মুহূর্তে সামালাতে হয়েছে কত কিছু, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সেই গল্প শোনালেন তিনি।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগের দিন আপনি দায়িত্ব পেলেন। দলের অবস্থা এলোমেলো। আপনাকে তখন যদি বলা হতো, মাঝামাঝি পথ পেরিয়ে আপনারা পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে থাকবেন, তাহলে কি বিশ্বাস হতো?
হাবিবুল বাশার: সত্যিকারের উত্তর হচ্ছে-—একদমই না। কারণ, দলটা হাতে পেয়েছি স্রেফ খেলার আগের দিন। একদিনে আসলে খুব বেশি কিছু করা যায় না। দল তো বানানো হয়েছিল আগেই। দলের ক্রিকেটারদের মধ্যেও অনেক সংশয় ছিল, অনেক প্রশ্ন ছিল, দ্বিধা। সব মিলিয়ে যখন দল হাতে পেয়েছি, তখন মনে হয়েছে যে, মৌসুমে ৩-৪টা ম্যাচ জিততে পারলেই খুশি থাকব।
আগের দিন যখন আপনি জানতে পারলেন আপনাকে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তখন তাৎক্ষণিক ভাবনা কেমন ছিল?
হাবিবুল: টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য হিসেবে সিলেটে ছিলাম। ২৬ তারিখ টুর্নামেন্ট শুরু, আমরা সিলেটেগেলাম ২৪ তারিখ বিকেলে। ২৫ তারিখ সকালে নাশতা করছিলাম টেকনিক্যাল কমিটির সদস্যদের সঙ্গে। ১০টার দিকে ফোন এলো, ‘কোথায় তুমি?’ বললাম, ‘আমি তো হোটেলে।’ তখন মিঠু ভাই (বিসিবি পরিচালক ও বিপিএলের সদস্য সচিব) বললেন, ‘তুমি এখনই টিম হোটেলে আসো।’
উনি বিস্তারিত কিছু বলেননি। আমি ধীরেসুস্থে নাশতা করে, শাওয়ার নিয়ে ১২টার সময় গেলাম। তখন বোর্ড সভাপতি বললেন, ‘কংগ্র্যাচুলেশনস, ইউ আর দা টিম ডিরেক্টর।’ আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম! এরপর আমাকে বলা হলো সবকিছু। তার পরও ব্যাপারটা উপলব্ধি করতে আধঘণ্টা সময় লাগল।
আমার জন্য এটা বড় বিস্ময় হয়ে এসেছিল। অবশ্যই প্রস্তুত ছিলাম না। শুরু এই দলে আমার যোগ দেওয়ার কথা ছিল। পরে চলে গিয়েছিলাম। সেই দলেই আবার ফিরলাম… আগে তো ‘মেন্টর’ ছিলাম, এবার ‘টিম ডিরেক্টর’, মানে পুরো দায়িত্বই আমার।
দায়িত্ব পেয়ে চমকে গেছি, তবে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি। আগে তো খুব একটা ভালো করে দলটা দেখিওনি যে, কে আছে না আছে। বিদেশি ক্রিকেটার ছিল না, যাদের আসার কথা, তাদের নিয়ে অস্পষ্টতা ছিল। স্থানীয় ক্রিকেটাররাই ছিল ভরসা।
আমার প্রথম কাজ ছিল ক্রিকেটারদের মনে স্বস্তি ফেরানো, সংশয় দূর করা, তাদেরকে স্বচ্ছন্দ্য করা এবং বিশ্বাসটা গড়ে দেওয়া যে, এই দলটাই পারফর্ম করার জন্য যথেষ্ট। প্রথম ৩-৪ দিন এটাই চেষ্টা করেছি আমি। প্রথম জয়টা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। আমি যা বলছিলাম, সেটা ওরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে প্রথম জয়ের পর।
বিদেশি ক্রিকেটারের ঘাটতি আমাদের ছিল। আমি জানতাম যে, আইএল টি-টোয়েন্টি শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারি। তাহলে কিছু ভালো ক্রিকেটার পাব। কিন্তু ততদিনে আমার ৬-৭ ম্যাচ শেষ হয়ে যাবে। তাই যাদেরকে পেয়েছি, তাদেরকেই এনেছি।

একজনের জন্য একটু অপেক্ষা করেছি, হাসান নাওয়াজ। আমার মনে হয়েছি, সে ভালো করবে। অ্যাডাম রসিংটনকে আমরা সকালে ফোন করে বিকেলে ফ্লাইটে উঠতে বলেছি। পরের দিন সিলেটে পৌঁছেই মাঠে নেমে গেছে, যা আদর্শ নয়। তবে আমরা মরিয়া ছিলাম।
সব মিলিয়ে একটা ব্যাপার বলতে হবে, ক্রিকেটাররা খুব ভালো সাড়া দিয়েছে। আমি যতই ওদেরকে বলি, প্রেরণা জোগাই, ওরা নিজেরা বিশ্বাস না করলে হতো না। কৃতিত্ব ওদেরকে দিতেই হবে।
সেই বিশ্বাসটা আপনি কিভাবে গেঁথে গিয়েছেন? কিভাবে এটা সম্ভব করলেন?
হাবিবুল: আমার বার্তাটা ছিল, সবাইকে বলেছি, ‘যা হোক না হোক, এখন এটা আমাদের দল। আমরা ঝাঁপিয়ে পড়ব।’
দলের মধ্যে অনেক আলোচনা ছিল যে বিদেশি ক্রিকেটার কে আসবে না আসবে। প্রথম ম্যাচের পর আমি বলেছি, ‘আমরা দুজন বিদেশি ক্রিকেটার নিয়ে প্রথম ম্যাচ জিতে গেছি। কে এলো না এলো, সেসব চিন্তা করে লাভ নেই। এই দল নিয়েই আমরা লড়াই করব।’ এই বিশ্বাসটাই দেওয়ার চেষ্টা করেছি যে, সবাই যেন মনে করে, ‘এটা আমার দল, ভালো করলেও আমার, খারাপ করলেও আমার।’
আমি পরে সবার মধ্যে সেই বিশ্বাসটা দেখেছি, যা আমাদেরকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করেছে।
অধিনায়কের ভূমিকা এখানে কতটা ছিল? আপনারা যাকে অধিনায়ক করেছেন, শেখ মেহেদি হাসান, জাতীয় দলে দুটি সিরিজে সহ-অধিনায়ক থাকলেও উল্লেখযোগ্য কোনো পর্যায়ে অধিনায়কত্বের অভিজ্ঞতা ছিল না। তাকে নেতৃত্বের জন্য দেশের ক্রিকেটে তেমন উপযুক্ত মনে করা হয়নি। কিন্তু বিপিএলে বেশ নজর কেড়েছেন তিনি। তাকে কেন বেছে নিলেন আপনারা?
হাবিবল: অধিনায়কত্ব চূড়ান্ত করা হয়েছে ম্যাচের আগের দিন। দলটা এতটাই অগোছালো ছিল। ওকে অধিনায়ক করার একটা কারণ ছিল, আমাদের টি-টোয়েন্টি জাতীয় দলের সহ-অধিনায়ক ছিল। আরেকটা ব্যাপার, শেখ মেহেদিকে অনেকদিন ধরে চিনি। হয়তো সে খুব একটা আউটস্পোকেন নয়, কিন্তু ওর গেম সেন্স খুব ভালো। এটা আমাদের ভাবনায় ছিল।
এই যে দল গোছানো বা বিশ্বাস জোগানোর কথা বললাম, সেখানে মেহেদিরও খুব বড় ভূমিকা ছিল। মাঠের ভেতরেও খুব ভালোভাবে দল পরিচালনা করছে।
ওর একটা ব্যাপার আমাকে মুগ্ধ করেছে, মাঠের ভেতরে ওর বোলিং-ম্যানেজমেন্ট। কখন কাকে বোলিংয়ে আনবে, কোন সময় কাকে কাজে লাগাবে, এগুলো খুব ভালো ছিল। সব মিলিয়ে দলের এমন পারফরম্যান্সের পেছনে ওর অবদান আছে অনেক। আমরা তো বাইরে থেকে যা করার, চেষ্টা করছিই। কিন্তু দলটা তো ওর।
বিসিবির ব্যবস্থাপনায় দল পরিচালনা করা হচ্ছে, এটা সুবিধা কতটা পাচ্ছেন? অসুবিধা কিছু কি আছে?
হাবিবুল: বিসিবির কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে ফুল লাইসেন্স দিয়েছিল যে, ‘ইটস ইউর টিম, ইউ ডিসাইড…।’ তারা আমাকে পুরো মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দিয়েছে। এটা বড় ব্যাপার ছিল দল পরিচালনার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে।
আরেকটা বড় ব্যাপার, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে যেটা হয়… পেমেন্ট ইস্যু থাকে। এখানে আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ক্রিকেটাররা পুরোপুরি নির্ভার আছে পারিশ্রমিক নিয়ে। তারা জানে যে, বিসিবির দল মানে পারিশ্রমিকের নিশ্চয়তা শতভাগ। এটা অনেক বড় স্বস্তি যে, ক্রিকেটাররা শুধু নিজেদের খেলা নিয়েই ভাবছে, অন্য কিছু ভাবতে হচ্ছে না এবং এটা তাদের পারফর্ম করতে সহায়তা করে নিশ্চিতভাবেই।
এটার অন্য দিকও আছে। পারিশ্রমিক নিশ্চিত ধরে রাখলে একটু ঢেলেমি ভাবও থাকতে পারে কারও কারও। তবে সেরকম কিছু হয়নি। ক্রিকেটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা যে তারা পেশাদারিত্বের সঙ্গেই খেলছেন, যে কারণে আমরা এখন শীর্ষে।
অসুবিধার কথা বললে, ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিক থাকলে বড় ক্রিকেটার আনা যায়। ইচ্ছে হলেই অমুক-তমুককে আনা যায়। কিন্তু আমরা চাইলেই যে কাউকে আনতে পারি না। যদিও বিসিবি পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছে, তবু তো বাজেটের কথা ভাবতে হয়, প্রক্রিয়ার কথা মাথায় রাখতে হয়। তবে এটা বড় কিছু নয়। অনেক ফ্র্যাঞ্চাইজি দলেও এটা হতে পারে।

হ্যাঁ,হয়তো প্রাইভেট ফ্র্যাঞ্চাইজির মতো আমরা হুট করে বড় বোনাস দিতে পারি না বা ইচ্ছামতো বড় বাজেটের ক্রিকেটার আনতে পারি না, কারণ, বিসিবির একটা নির্দিষ্ট হিসাব থাকে বা বাজেট আছে। তার পরও বিসিবি আমাদের কিছু উইনিং বোনাস দিচ্ছে। সেটাও হয়তো অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মতো আমরা তাৎক্ষণিক দিতে পারছি না, কিছু প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়, জয়ের সঙ্গে সঙ্গে দিতে পারছি না, তার পরও ক্রিকেটাররা খুশি, কাণ তারা জানে যে, যেটুকু বলা হয়েছে, তা তারা পেয়ে যাবে।
এখন আপনার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা যদি বলি, আপনাকে অনেক ভূমিকায় বাংলাদেশের ক্রিকেটে দেখা গেল। এবার টিম ডিরেক্টর, আপনার জন্যও প্রথম অভিজ্ঞতা। কেমন হলো এখনও পর্যন্ত?
হাবিবুল: সত্যি বলতে, খুবই টেনশনে সময় কেটেছে ও কাটছে। অবশ্যই আমি দারুণ রোমাঞ্চিত, পাশাপাশি চিন্তিত। একটা দল চালানোর ব্যাপারই এমন।
ধরুন, যে ক্রিকেটার আনছি…যেমন অ্যাডাম রসিংটন. আমি তাকে খুব একটা চিনতাম না। নেপাল প্রিমিয়ার লিগ দেখে আমার মনে হয়েছে সে কার্যকর হতে পারে। সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে দু-একদিনের মধ্যে। ভাবনার সময়টা ছিল না।
আসিফ আলি ভালো ব্যাটসম্যান, তব অনেক দিন এই লেভেলে খেলার বাইরে ছিল। আমি যখন ক্রিকেটার বাছাই করছিলাম, তখন ভয় ছিল, এরা পারফর্ম না করলে তো দায় আমার ওপর আসবে। সবাই প্রশ্ন করবে যে, কোন ধরনের ক্রিকেটানার আনা হলো। যাহোক, ভালো ব্যাপার যে, তাদের বেশির ভাগই পারফর্ম করেছে।
এখন কি মনে হয়, ট্রফি জিততে পারবেন?
হাবিবুল: ট্রফির দিকে এখনও চোখ রাছি না। সামনে কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ খেলা আছে। রসিংটন চোটের কারণে ছিটকে গেছে, তাকে মিস করব। দেখি কাউকে আনতে পারি কি না।
দল হিসেবে খেলাটাই আসল। আমি সবসময় বিশ্বাস কির, হুট করে বড় ক্রিকেটার আনলেই যে দল ভালো করবে, তা নঢ। আমি চেষ্টা করেছি এমন ক্রিকেটার আনতে, যাদেরকে পুরোটা সময় পাওয়া যাবে। দেখা যাক কতদূর যেতে পারি।