Published : 28 Jun 2026, 07:29 PM
শেষ ওভার শুরুর আগে ধারাভাষ্যে ইয়ান স্মিথ বললেন, ‘গেম অন ফোকস… খেলার এখনও অনেক বাকি…।” দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়োজন তখন ছয় বলে পাঁচ রান। এমনিতে খুব বেশি নয়। তবে যেভাবে চেপে ধরেছিল বাংলাদেশ, ম্যাচ জমে উঠেছিল দারুণভাবেই। কিন্তু শেষ ওভারে মারুফার আক্তারের প্রথম ডেলিভারিই ক্লোয়ি ট্রায়নের ব্যাটের কানায় লেগে চলে গেল বাউন্ডারিতে। এবার স্মিথের উচ্চারণ, “পিস অব গোল্ড ফর সাউথ আফ্রিকা…।”
প্রবল চাপের মধ্যে ওই বাউন্ডারি আসলেই ছিল স্বর্ণের টুকরোর মতো। পরের বলেই সিঙ্গল নিয়ে খেলার সমাপ্তি। হার দিয়ে উইমেন’স টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষ হলো বাংলাদেশের। চার বল বাকি রেখে চার উইকেটে জিতে গেল দক্ষিণ আফ্রিকা।
এই ফলাফল বলবে, ম্যাচের ফয়সাালা হয়েছে সহজেই। আদতে ছোট পুঁজি নিয়েও দারুণ লড়াই করে নিগারের দল। এই দিনটিকে ঘিরে রোমাঞ্চের কথা দেশ ছাড়ার আগেই বলে গিয়েছিলেন বাংলাদেশ। ক্রিকেট তীর্থ বলে খ্যাত লর্ডসে তাদের প্রথম ম্যাচ যে এটিই। বরাবরের মতোই ব্যাটিংয়ে আবার ব্যর্থ দল।
টস জিতে ব্যাটিংয়ে নামা দল একশর নিচে গুটিয়ে যাওয়ার শঙ্কায় ছিল। শেষ দিকে অধিনায়ক নিগারের ক্যামিওতে করতে পারে তারা ১১৭ রান।
এই পুঁজি নিয়েও দারুণ বোলিংয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ঘাম ছুটিয়ে ছাড়ে তারা। শেষ পর্যন্ত আক্ষেপ ওই আর কিছু রান করতে না পারার।
ধারাভাষ্যে থাকা সবাই অবশ্য মুগ্ধ বাংলাদেশের হার না মানা মানসিকতায়। সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক নাসের হুসেইন বললেন, “বাংলাদেশ ব্রিলিয়ান্ট। লর্ডসে প্রথম খেলেও উপলক্ষের বিশালত্বে তারা চাপা পড়েনি। দারুণ লড়াই করেছে।”
ম্যাচের শুরুটা বাংলাদেশের জন্য ছিল বিভীষিকার। প্রথম বলেই মারিজান ক্যাপের ফুল লেংথ ডেলিভারিতে দৃষ্টিকটূ স্লগে বোল্ড জুয়ায়রিয়া ফেরদৌস। আরেকপ্রান্ত শাবনিম ইসমাইল শুরু করেন মেডেন নিয়ে।
নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচটি ছাড়া বিশ্বকাপের চার ম্যাচে বাংলাদেশের শুরুর জুটির রান ৪, ৫, ৮ ও ০।
ক্যাপ ও শাবনিমের সুইং-মুভমেন্টের সামনে তাজ নেহার ও সোবহানা মোস্তারিকে মনে হচ্ছিল যে, অথৈ সাগরে পড়েছেন।
দিলারা আক্তারের বদলে সুযোগ পাওয়া তাজ বিদায় নেন দ্রুতই (১২ বলে ১)।
পাওয়ার প্লেতে বাংলাদেশ তোলে মাত্র ২২ রান। বাউন্ডারি স্রেফ দুটি।
ক্যাপ টানা বোলিংয়ে শেষ করে দেন কোট। ৪ ওভারে রান দেন মাত্র ৯।
ক্যাপ ও শাবনিম বোলিং থেকে সরে যাওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি পেয়ে জুটি গড়ে তোলেন সোবহানা ও শারমিন আক্তার। তবে রানের গতি খুব একটা বাড়াতে পারেননি তারা। ৫৬ রানের জুটিতে বল লাগে ৬২টি।
নেডিন ডি ক্লার্কের বলে পুল করে ছক্কায় শেকল ভাঙার চেষ্টা করেন সোবহানা। কিন্তু এরপর আবার টানা পাঁচ ওভারে আসেনি কোনো বাউন্ডারি।
এর মধ্যেই ক্রিজে ছেড়ে বেরিয়ে খেলার চেষ্টায় বোল্ড হন শারমিন (২৯ বলে ২২)। বড় শটের চেষ্টায় সীমানার কাছে ধরা পড়েন সোবহানা (৪৮ বলে ৪২)।
বাংলাদেশের রান তখন একশ হওয়া নিয়েই টানাটানি। কিন্তু দলকে ১২০-এর কাছাকাছি নিয়ে যান নিগার সুলতানা। আয়াবঙ্গা খাকার বলে বাউন্ডারির পর আরেকটি শট আছড়ে ফেলেন তিনি গ্যালারিতে। এই পেসারের বলেই টানা দুটি বাউন্ডারিতে শেষ করেন ইনিংস।
শেষ ৩ ওভারে ৩৬ রান তোলে বাংলাদেশ। অধিনায়ক অপরাজিত থাকেন ২০ বলে ৩২ রান করে।

দক্ষিণ আফ্রিকার রান তাড়ার শুরুটাও হয় প্রথম বলে উইকেট হারিয়ে। মারুফা আক্তাতের অসাধারণ এক সুইঙ্গিং ডেলিভারি লরা ভুলভার্টের ব্যাট-প্যাডের ফাঁক গলে ছোবল দেয় স্টাম্পে।
বড় রান রেটের চাপ ছিল না, দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটারদেরও তাই তাড়া ছিল না। দ্বিতীয় উইকেটে কোনো ঝুঁকি না নিয়েই ৫২ রানের জুটি গড়েন ট্যাজমিন ব্রিটস ও অ্যানেরি ডার্কসেন।
নবম ওভারে আক্রমণে এসেই এই জুটি ভাঙেন নাহিদা আক্তার। ছক্কার চেষ্টায় লং অনে মারুফার হাতে ধরা পড়েন ব্রিটস (২৪ বলে ২০)।
নতুন ব্যাটার ডানে ফন নিকার্ক পরের ওভারেই উইকেট হারান সানজিদা আখতার মেঘলাকে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে।
ডার্কসেন ও ক্যাপের ব্যাটে তবু ভালোভাবেই এগোচ্ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা। তবে ৪৫ রান করা ডার্কসেনকে ফিরিয়ে আবার বাংলাদেশকে আশা দেখান নাহিদা।
দারুণ কিছুর সম্ভাবনায় দল উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। আঁটসাঁট বোলিংয়ে কমে আসে রানের গতি। ফিনিশার নেডিন ডি ক্লার্ক দুটি বাউন্ডারিতে কিছুটা সরিয়ে দেন চাপ। তবে স্বর্ণার অসাধারণ ক্যাচ ফেরায় তাকেও। রান আউট হয়ে যান অভিজ্ঞ ক্যাপ। কিন্তু কোনোরকমে শেষ পর্যন্ত উতরে গেল দক্ষিণ আফ্রিকা।
পাঁচ ম্যাচে দুই জয় তিন পরাজয় নিয়ে শেষ হলো বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অভিযান। দক্ষিণ আফ্রিকা এখন তাকিয়ে দিনের অন্য ম্যাচে। অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারলে ভারত উঠে যাবে সেমি-ফাইনালে, ভারত হেরে গেলে শেষ চারে পা রাখবে দক্ষিণ আফ্রিকা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ: ২০ ওভারে ১১৭/৫ (জুয়ায়রিয়া ০, তাজ ১, সোবহানা ৪২, শারমিন ২২, নিগার ৩২*, স্বর্ণা ৪, রিতু ১*; ক্যাপ ৪-০-৯-১, শাবনিম ৪-১-১৫-১, এমলাবা ৪-০-২২-২, ট্রায়ন ২-০-১৩-০, খাকা ৪-০-২৯-০, ডি ক্লার্ক ২-০-১৭-১)।
দক্ষিণ আফ্রিকা: ১৯.২ ওভারে ১১৮/৬ (ভুলভার্ট ০, ব্রিটস ২০, ডার্কসেন ৪৫, ফন নিকার্ক ৪, ক্যাপ ১৬, ডি ক্লার্ক ১৫, ট্রায়ন ৮*, জাফটা ০*; মারুফা ৩.২-০-২৩-১, মেঘলা ৪-০-২৮-১, রাবেয়া ৪-০-১৭-০, রিতু ৪-০-২৪-১, নাহিদা ৪-০-২৪-২)।
ফল: দক্ষিণ আফ্রিকা ৪ উইকেটে জয়ী।
প্লেয়ার অব দা ম্যাচ: মারিজান ক্যাপ।