Published : 25 Dec 2025, 10:58 PM
আবু ধাবিতে ২০২৬ আইপিএলের নিলাম হলো যেদিন, তার আগ পর্যন্ত স্বীকৃত ক্রিকেটে মাঙ্গেশ ইয়াদাভের অভিজ্ঞতা বলতে ছিল কেবল একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলা। তবে তার প্রতিভা ও সামর্থ্য সম্পর্কে আইপিএলের ফ্র্যাঞ্চাইজিদের ধারণা ছিল আগে থেকেই। তাই তো নিলামে নাম ওঠার পরই তাকে পেতে উঠেপড়ে লাগে চারটি দল। ৩০ লাখ রুপি ভিত্তিমূল্য থেকে তরতরিয়ে বাড়তে থাকে দাম। শেষ পর্যন্ত পাঁচ কোটি ২০ লাখ রুপিতে তাকে পেয়ে যায় আইপিএলের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু।
আইপিএল নিলামের পর কেটে গেছে এক সপ্তাহের বেশি সময়। এত বেশি পারিশ্রমিকে দল পেয়ে এখনও যেন ঘোরের মধ্যে আছেন মাঙ্গেশ। ২৩ বছর বয়সী ভারতীয় ক্রিকেটার বললেন, ট্রাক চালক বাবার কাছ থেকে আর টাকা চাইতে হবে না, এটাই তার কাছে বড় অর্জন মনে হচ্ছে এখন।
ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফোকে মাঙ্গেশ জানালেন, আইপিএলে দল পাওয়ার পর কেমন বদলে গেছে সবকিছু।
“আগের চেয়ে অনেক বেশি ফোন পেয়েছি আমি। তবে ভবিষ্যতে আমাকে এই বিষয়গুলো সামলাতে হবে।”

মাঙ্গেশ মূলত বাঁহাতি পেস বোলিং অলরাউন্ডার। ১৪০ কিলোমিটার গতিতে টানা বল করে যাওয়ার সামর্থ্য আছে তার। একটা সময় তার মূল শক্তির জায়গা ছিল স্টক ডেলিভারি। ধীরে ধীরে গতির বৈচিত্রও এনেছেন।
বেঙ্গালুরু দলে ইয়াশ দায়ালের বিকল্প ভাবা হচ্ছে তাকে। যৌন নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত বাঁহাতি পেসার দায়ালের আইপিএলে খেলা অনিশ্চিত। বেঙ্গালুরুর স্কাউটদের বিশ্বাস, মাঙ্গেশ সরাসরি মূল একাদশে থাকার জন্য যথেষ্ট ভালো।
জীবনের শুরুতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে মাঙ্গেশকে। সাত বছর আগেও তিনি ছিলেন টেনিস বল ক্রিকেটার। অর্থের জন্য উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ ও ছাত্তিশগাড়ে স্থানীয় টুর্নামেন্টে খেলতে যেতেন। ভ্রমণ করতেন সাধারণ ট্রেনের কামরা বা রাজ্য পরিবহণের বাসে। এই ম্যাচগুলো থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে চলত তার খরচ।
“বাবার কাছে অর্থ চাইতে হবে না, এটাই একটা অর্জনের মতো মনে হচ্ছে। আজ, এখনও জানি না এত পারিশ্রমিক পাওয়ার অনুভূতি কেমন হয়। আমি চাই আমার বাবা-মা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকুক। এর জন্য আমাকে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।”
“আমার যখন সাত বছর বয়স, বোরাগাঁওয়ে আমাদের বাড়ির সামনে আমার মা আমাকে বল ছুড়তেন। এভাবেই আমার শুরু হয়েছিল। আমার বাবা ট্রাক চালান। যখন তাকে প্রতিদিন রাত ৩টায় ঘুম থেকে উঠতে এবং বিপজ্জনক রাস্তায় সারাদিন গাড়ি চালাতে দেখেছি, তখন থেকে অর্থ ও কঠোর পরিশ্রমের মূল্য বুঝতে শিখেছি।”

এখন তাই বাবার জন্য কিছু করতে চান মাঙ্গেশ। আরেকটি লক্ষ্যের কথাও বললেন তিনি।
“তিনি এত বছর ধরে পরিবারের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছেন। এখন তাকে আরামে রাখতে চাই আমি। আমার ছোট বোন (মোট চার ভাই-বোন) ক্রিকেট ভালোবাসে এবং উদ্যমী এক বোলার সে। আর্থিক বিষয়ে চিন্তামুক্ত হয়ে পূর্ণকালীন খেলার জন্য অনুপ্রাণিত করতে চাই তাকে।”
মাঙ্গেশের সত্যিকারের ক্রিকেটার হওয়ার পথে যাত্রা শুরু হয় ১৬ বছর বয়সে, যখন তিনি পাড়ি জমান নয়ডায়। সুনিল সিনহা নামে তাদের এক পারিবারিক বন্ধু স্থানীয় একটি টুর্নামেন্টে মাঙ্গেশের খেলা দেখার পর তার বাবাকে তার প্রতিভা সম্পর্কে বোঝাতে সক্ষম হন। ওই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন মাঙ্গেশ। নগদ অর্ধ পুরষ্কার হিসেবে পেয়েছিলেন ২১ হাজার রূপি।
সাবেক অস্ট্রেলিয়ান পেসার মিচেল জনসন ও সাবেক ভারতীয় পেসার আরপি সিংয়ের বোলিং অ্যাকশন অনুকরণ করা ছেলেটি যোগ দেয় ফুলচাঁদ শার্মার ওয়ান্ডার ক্রিকেট ক্লাবে। ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে সুপরিচিত কোচ ফুলচাঁদ। ভুবনেশ্বর কুমার, শিভাম মাভিদের মতো ক্রিকেটারদের কোচিং করিয়েছেন তিনি।
সহজাত সুইং বোলিং দিয়ে ফুলচাঁদকে মুগ্ধ করেন মাঙ্গেশ। পরবর্তী তিন বছরের জন্য তার হোস্টেল ফি মওকুফ করে দেন ফুলচাঁদ। একাডেমিতে কোচিং সেশন পরিচালনা করা উত্তর প্রদেশের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান বিসিসিআই আম্পায়ার তান্মায় শ্রিভাস্তভকেও মুগ্ধ করেন মাঙ্গেশ।
অনেক বছর ধরে সব ধরনের সাহায্য করায় তান্মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন মাঙ্গেশ।
“কিছুদিন আগ পর্যন্তও তান্মায় ভাই আমাকে বছরের পর বছর ধরে স্পাইক, কিট, পোশাক, ক্রিকেট সরঞ্জাম সবকিছুই দিয়েছেন। তিনি আমাকে পথ দেখিয়েছেন। তিনি আমার প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছিলেন, আমার স্কিলের উন্নতি, আমার খেলা নিয়ে কাজ করার বিষয়ে আমাকে অনেক কিছু বলতেন।”
“আমার ট্রেইনার আঙ্কুর তিয়াগিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, রিকভারি, স্ট্রেন্থ ও কন্ডিশনিং কী, তা বুঝতে সাহায্য করেছিলেন। তিনিই আমার অনুশীলনের ধরনে একটি কাঠামো দাঁড় করিয়েছিলেন।”
মাঙ্গেশকে উত্তর প্রদেশের কাঠামোয় ঢোকাতে সাহায্য করার চেষ্টা করেছিলেন তান্মায়। তবে আইপিএল ও মধ্য প্রদেশের সাবেক ফাস্ট বোলার আনন্দ রাজান সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলে মাঙ্গেশের ক্যারিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মোড় নেয়।
তান্মায়ের সুপারিশে মাঙ্গেশকে ইন্দোরে নিয়ে আসেন রাজান। মাঙ্গেশের ধারাবাহিকভাবে খেলার সুযোগ নিশ্চিত করে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটের পথ তৈরি করেন এবং পরে জাবালপুরে জেলা ট্রায়ালের ব্যবস্থা করে দেন তিনি। এরপরই মধ্য প্রদেশের কাঠামোয় ঢুকে যান মাঙ্গেশ।
রাজান বললেন, “তাকে জাবালপুরে যেতে বলার পেছনে ভাবনা ছিল আরও বেশি খেলা নিশ্চিত করা… সে দ্রুতই তাদের জেলা দলে জায়গা করে নিল, এক মৌসুমে ৩৫-৪০ উইকেট নিল।”
এমন পারফরম্যান্সের পর ২০২৪ সালে তামিলনাড়ুতে অনুষ্ঠিত বুচি বাবু আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্টের জন্য মধ্য প্রদেশ দলে জায়গা পান মাঙ্গেশ। তবে তিনি আলোয় আসেন মূলত ২০২৫ সালে মধ্য প্রদেশ টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট দিয়ে। গোয়ালিয়র চিতাসের হয়ে ৬ ম্যাচে ১৪ উইকেট নিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন তিনি।
ওই সময়ই আইপিএল স্কাউটদের নজরে পড়েন মাঙ্গেশ। বেঙ্গালুরু, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স, দিল্লি ক্যাপিটালস ও রাজস্থান রয়্যালসে ট্রায়াল দেন তিনি। ডিসেম্বরের শুরুতে ভারত জুড়ে ব্যাপকহারে ফ্লাইট বাতিলের কারণে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ ও পাঞ্জাব কিংসে ট্রায়াল দেওয়া হয়নি তার।
মধ্য প্রদেশ টি-টোয়েন্টির পারফরম্যান্সের কারণেই অবশেষে ২০২৫-২৬ সৈয়দ মুশতাক আলি ট্রফি দিয়ে সিনিয়র দলে অভিষেক হয় মাঙ্গেশের। আইপিএল নিলামের একদিন আগে অভিষেকে, ৪ ওভারে ৪৭ রান দিয়ে একটি উইকেট পান তিনি ঝাড়খান্ডের বিপক্ষে। নিলামের দিন পাঞ্জাবের বিপক্ষে ৪টি চার ও একটি ছক্কায় ১২ বলে ২৮ রানের ক্যামিও খেলে ব্যাটিং সামর্থ্যেরও প্রমাণ দেন তিনি। পরে বল হাতে নেন ২টি উইকেট।
এখন পর্যন্ত তিনি স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন এই দুটিই। একদিনের ম্যাচের টুর্নামেন্ট ভিজায় হাজারে ট্রফি দিয়ে বুধবার লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। রাজস্থানের বিপক্ষে ৬ ওভারে ৪২ রান দিয়ে নেন একটি উইকেট।
চোখধাঁধানো পারিশ্রমিকে আইপিএলে দল পেলেও পা মাটিতেই রাখছেন মাঙ্গেশ। ক্রিকেটে সবকিছু কত দ্রত বদলে যায়, তা ভালো করেই উপলব্ধি করতে পারেন তিনি। তাই করে যেতে চান শুধু নিজের কাজটা। এখন তার পুরো মনোযোগ ভিজায় হাজারে ট্রফির দিকেই।
“আরসিবির জার্সি পরে বোলিংয়ের রান-আপে দাঁড়ানোর অনুভূতি কেমন হবে, তা কল্পনা করেছি আমি। মধ্য প্রদেশের হয়ে উইকেট নেওয়া ও ম্যাচ জয়ের কল্পনাও করেছি। এটাই আমার প্রাথমিক লক্ষ্য।”