Published : 01 Jul 2026, 08:21 AM
এখন তাকে ঘিরে কত উচ্ছ্বাস, প্রশংসার স্রোত বইছে। কিন্তু কিছু দিন আগেও ওর্লান্দো হিল অনেকের কাছে ছিলেন অচেনা। কয়েক বছর আগে কেমন ছিলেন, সেটাও অনুমান করা কঠিন নয়। আর্থিকভাবে ছিলেন চরম সংকটে; সময়টা তার জন্য এতটাই কঠিন ছিল যে, সন্তান জন্মের সময় হাসপাতালের খরচ তাকে জোগাতে হয়েছিল জার্সি, স্নিকার্সের মতো প্রিয় জিনিসগুলো বিক্রি করে!
উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে প্যারাগুয়ে নকআউট পর্ব শুরু করেছে জার্মানিকে নাটকীয় টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হারিয়ে। পাঁচ শটের পর্বে দুটি সেভ করে, দলের জয়ের নায়ক হিল। অথচ, এই ম্যাচের আগেও তিনি সেভাবে ছিলেন না পাদপ্রদীপের আলোয়।
ছয় ফুট ছয় ইঞ্চি লম্বা এই গোলকিপার আসলে গত বছর জানুয়ারির আগ পর্যন্ত কারো নজরেই পড়েননি সেভাবে! পড়বেনই বা কীভাবে। ২০২৫ সালের জানুয়ারির আগ পর্যন্ত ক্লাবের সিনিয়র টিমের হয়ে যে তিনি ম্যাচই খেলেছিলেন মাত্র তিনটি!
প্যারাগুয়ের ক্লাব থার্টিন দে জুনিও এবং সিএস সান লরেন্সোর যুব দলের হয়ে ক্লাব ফুটবলে যাত্রা শুরু হিলের। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে দক্ষিণ আমেরিকান অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপের প্যারাগুয়ে দলে ডাক পান তিনি।
২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে সান লরেন্সোর সিনিয়র দলে অভিষেক, কিন্তু ম্যাচ খেলতে পেরেছিলেন মাত্র দুটি। পরের বছর মেলিসা আভালোসকে বিয়ে করেন হিল। ২০২২ সালে অন্তসত্ত্বা হয়ে পড়েন মেলিসা।
৩১ ডিসেম্বরে হিল-মেলিসা দম্পতির ছেলের পৃথিবীর আলোয় আসার কথা ছিল, কিন্তু সাস্থ্যগত সমস্যার কারণে আগেভাগে, ৩০ নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় মেলিসাকে। ৭ ডিসেম্বরে কৃত্রিমভাবে প্রসব বেদনা তৈরি করা হয়।
জটিলতার কারণে, একদিন পর জরুরি অস্ত্রোপচার করে লাউতারোকে আনা হয় পৃথিবীর আলোতে। রাখা হয় নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে।

বড়দিনের আগেই ছেলে নিয়ে ঘরে ফিরতে পেরেছিলেন হিল-মেলিসা, কিন্তু হিলের অবস্থা তখন কপর্দকহীন! হাসপাতালের খরচ মেটাতে প্রিয় সবকিছু বেচতে বাধ্য হয়েছিলেন সেদিন। সেই দুঃসময়ের কথা হিল নিজে বলেননি, তার স্ত্রী মেলিসা ইনস্টাগ্রামে তুলে ধরেন গত বছর। সেটাই এখন আলোচনায় ফিরে এসেছে জার্মানি ম্যাচের পর।
“আমাদের ছেলে জীবনের জন্য পাঞ্জা লড়ছিল এবং তার বাবা, সবসময় পাশে ছিল। হিল তার সবকিছু বিসর্জন দিয়েছিল। সবকিছু বেচে দিয়েছিল: তার জামাকাপড়, তার স্নিকার্স, এমনকি তার অনূর্ধ্ব-২০ দলের জার্সি, যেটা সে স্মৃতি হিসেবেও রাখতে পারেনি।”
লাউতারে যেন বাবার জন্য সৌভাগ্য হয়ে আসেন। ছেলের জন্মের এক বছর পর, হিলের সামনে খুলে যায় দুয়ার। আর্জেন্টিনার শীর্ষ লিগের ক্লাব সান লরেন্সো বাজি ধরে এই ‘অখ্যাত’ গোলকিপারের ওপর, ধারে তাকে দলে টানে।
২০২৪ সাল অবশ্য হিলের পার হয়ে যায় রিজার্ভ দলে খেলে। ২০২৫ সালে এসে মূল দলে নিয়মিত হন তিনি। এবার তিনি নজরে পড়েন প্যারাগুয়ে কোচ গুস্তাভো আলফারোর। আর পিছন ফিরে তাকানো নয়।
মার্চ ও জুনের উইন্ডোতে প্যারাগুয়ে দলে ডাক পান হিল। ততদিনে বাছাই পেরিয়ে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত হয়ে গেছে আলফারোর দলের। গত সেপ্টেম্বরে পেরুর বিপক্ষে বাছাইয়ের শেষ ম্যাচে সিনিয়র দলের জার্সিতে হিলকে নামিয়ে দেন কোচ।
এরপর হিল প্রীতি ম্যাচ খেলেন পাঁচটি এবং আলফারোর প্রথম পছন্দের গোলকিপার হয়ে যান। বিশ্বকাপ অভিষেক অবশ্য তার জন্য আনন্দের হয়নি; সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ৪-১ গোলে হেরে যায় প্যারাগুয়ে।
কিন্তু এর পরের তিন ম্যাচে দারুণভাবে পোস্ট আগলে রাখলেন হিল। গ্রুপ পর্বের দুই ম্যাচ জাল অক্ষত রাখলেন। তৃতীয় সেরা আট দলের একটি হয়ে প্যারাগুয়ে উঠে এলো নকআউট পর্বে, ১৬ বছর পর প্রথমবার।
জার্মানির বিপক্ষে অতিরিক্ত সময় মিলিয়ে এই তিন ম্যাচে কেবল একটি গোল হজম করেন হিল, লক্ষ্যে থাকা ১৭ শটের ১৬টিই রুখে দেন তিনি।
জার্মানির বিপক্ষে অনুমিতভাবেই ম্যাচের সেরা খেলোয়াড় হিল। পুরস্কারটি তিনি উৎসর্গ করেছেন, হাসপাতালে থাকা ভাতিজাকে। তিনি এমনই পরিবার অন্তপ্রাণ।
“আলেক্সান্দের, এই ট্রফি তোমার জন্য। আশা করি, দ্রুত সেরে উঠবে। তোমার চাচা দূর থেকে পাশে আছে।”
আর হিলের পাশে এখন পুরো প্যারাগুয়ে আছে।