Published : 26 Jul 2025, 10:14 AM
নিজের ব্যাটে অপরাজিত সেঞ্চুরি, দলের রান ২১৪। শেই হোপ হয়তো ভাবছিলেন, ম্যাচ জয়ের রসদ জোগাড় হয়ে গেছে। কে জানত, ক্যারিবিয়ান সাগর শান্ত থাকলেও সাগরপাড়ের মাঠ হয়ে উঠবে উত্তাল! ওয়ার্নার পার্কের ২২ গজে স্রেফ সুনামি বইয়ে দিলেন টিম ডেভিড। তার ব্যাটের স্রোতে ভেসে গেল সব চ্যালেঞ্জ। মাঠের বাইরে বল আছড়ে পড়ায় কত বার নতুন বলের বাক্স নিয়ে মাঠ নামতে হলো চতুর্থ আম্পায়ারকে, ইয়ত্তা নেই। সেই খুনে ব্যাটে রচিত হলো রেকর্ডের পর রেকর্ড আর অস্ট্রেলিয়ার দারুণ জয়ের গল্প।
সদ্য অবসরে যাওয়া আন্দ্রে রাসেলের কাছ থেকে বছরখানেক আগে ব্যাটটি উপহার পেয়েছিলেন ডেভিড। সেই ব্যাটেই তিনি পিষ্ট করলেন ক্যারিবিয়ানদের আশা। তার ব্যাটিং তাণ্ডবে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৬ উইকেটে উড়িয়ে দিল অস্ট্রেলিয়া। পাঁচ ম্যাচের সিরিজ তারা জিতে নিল প্রথম তিন ম্যাচেই।
সেন্ট কিটসে বাংলাদেশ সময় শনিবার সকালের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২০ ওভারে তোলে ২১৪ রান। ইনিংস শুরু করতে নেমে শেষ পর্যন্ত খেলে ৫৭ বলে ১০২ রানে অপরাজিত থাকেন হোপ।
রান তাড়ায় ডেভিড যখন ক্রিজে যান, অস্ট্রেলিয়া তখন পাওয়ার প্লেতেই হারিয়ে ফেলেছে তিন উইকেট। কিন্তু ডেভিডের প্রবল পাল্টা আক্রমণের কোনো জবাব দিতে পারেনি ক্যারিবিয়ানরা। তাকে দারুণ সঙ্গ দেন এই সিরিজের অভিষিক্ত মিচেল ওয়েন। দুজনের রেকর্ড জুটিতে ম্যাচ শেষ ২৩ বল আগেই!
১৬ বলে পঞ্চাশ ছুঁয়ে অস্ট্রেলিয়ার দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড গড়েন ডেভিড। সেটিকে পরে তিনি রূপ দেন অস্ট্রেলিয়ার দ্রুততম সেঞ্চুরিতে। বাউন্ডারিতে সেঞ্চুরি ছুঁয়ে যখন ম্যাচ শেষ করে যখন হুঙ্কার ছোঁড়েন ২৯ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান, তার নামের পাশে তখন জ্বলজ্বল করছে ৬ চার ও ১১ ছক্কায় ৩৭ বলে ১০২!
সিরিজের প্রথম ম্যাচে অভিষেকে ঝড়ো ফিফটি করা ওয়েন এবার অপরাজিত থাকেন ১৬ বলে ৩৬ রান করে।
দুজনের জুটিতে স্রেফ ৪৬ বলে আসে ১২৮ রান। পঞ্চম উইকেটে যা অস্ট্রেলিয়ার রেকর্ড। পেছনে পড়ে যায় ৯৭ রানের আগের রেকর্ড, যেটিতে মিচেল মার্শের সঙ্গী ছিলেন এই ডেভিডই।
টি-টোয়েন্টিতে ডেভিডের আগের সর্বোচ্চ ছিল ৯৩ রান, যখন তিনি ছিলেন সিঙ্গাপুরের ক্রিকেটার। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে আগের ৪১ ম্যাচে তার ফিফটি ছিল স্রেফ দুটি ৫৪ ও ৬৪ রানের। এই সেঞ্চুরি তাই তার প্রতি দলের এতদিনের আস্থার একটি প্রতিদান।
অথচ ম্যাচের প্রথম ভাগে দাপট ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের। টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা দল উদ্বোধনী জুটিতেই তোলে ১২৫ রান।
প্রথম ওভারে ব্র্যান্ডন কিংয়ের ছক্কায় শুরু। পরে আক্রমণে যোগ দেন হোপ। পাওয়ার প্লেতে রান আসে ৬৬। ১০ ওভারের আগেই হয়ে যায় ১০০।
২৬ বলে ফিফটি করেন হোপ, ৩০ বলে কিং।
জুটি থামে ছয় ছক্কায় ৩৬ বলে ৬২ করে কিং বিদায় নিলে।
মঞ্চ প্রস্তুত থাকলেও পরের ব্যাটসম্যানরা কেউ প্রত্যাশিত ঝড় তুলতে পারেননি। দলকে এগিয়ে নেন মূলত হোপই। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে প্রথম শতরানে পা রাখেন তিনি ৫৫ বলে।
তার আগে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে তিন সংস্করণেই সেঞ্চুরির স্বাদ পেয়েছেন কেবল আর ক্রিস গেইল।
শেষ দুই বলে রোমারিও শেফার্ডের দুই চারে শেষ হয় ইনিংস।
ওয়ার্নার পার্কের ব্যাটিং স্বর্গ আর ছোট বাউন্ডারিতে ২১৪ রান নাগালের বাইরে না হলেও দুইশর বেশি রান তাড়া তো সবসময়ই সব মাঠেই চ্যালেঞ্জিং। সেই লড়াই হয়েছেও অস্ট্রেলিয়ার রান তাড়ার শুরুতে। কিন্তু ডেভিড নামার পরই ম্যাচ হয়ে যায় এক তরফা।
আগের ম্যাচের মতোই ইনিংস শুরু করেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। ৭ বলে ২০ রানের ক্যামিও খেলে ফিরে যান তিনি তৃতীয় ওভারেই। আগের ম্যাচের নায়ক জশ ইংলিস এবার বড় করতে পারেননি ইনিংস (৬ বলে ১৫)।
অধিনায়ক মিচেল মার্শ পাঁচটি বাউন্ডারি মারলেও ২২ রান করতে ১৯ বল খেলেন। আগের দুই ম্যাচেই ফিফটি করা ক্যামেরন গ্রিন এদিন ছিলেন বিবর্ণ (১৪ বলে ১১)।
৮৭ রানে ৪ উইকেট হারানো অস্ট্রেলিয়া তখন সত্যিকারের পরীক্ষার মুখে। ডেভিডের সঙ্গে ব্যাটসম্যান বলতে ছিলেন মিচেল ওয়েন আর অলরাউন্ডার কুপার কনোলি, দুজনই নবীন ও অনভিজ্ঞ। কিন্তু ডেভিডই হয়ে ওঠেন অপ্রতিরোধ্য।

প্রথম বলেই চার দিয়ে তার শুরু, একটু পর প্রথম ছক্কাটি মারেন গুডাকেশ মোটিকে। নবম ওভারে গ্রিন যখন আউট হলেন, ডেভিডের রান ৭ বলে তখন ১৫। পরের ওভার থেকেই তার অসাধারণ প্রতিআক্রমণের শুরু। এক চার ও টানা চার ছক্কায় মোটির ওভার থেকে নেন ২৮ রান!
পরের ওভারে আরেক বাঁহাতি স্পিনার আকিল হোসেনের টানা তিন বলে ছক্কা-চার-ছক্কার পথে ফিফটি হয়ে যায় ১৬ বলে। অতীত হয়ে যায় ট্রাভিস হেড ও মার্কাস স্টয়নিসের ১৭ বলের ফিফটির রেকর্ড।
অনেকবারই ঝড়ো শুরুর পর ইনিংস বয়ে নিতে পারেননি ডেভিড। এবার নিজেকে মেলে ধরেন তিনি ভিন্ন রূপে। রোস্টন চেইসের এক ওভারে তিন ছক্কা ও এক চারে এগিয়ে যান শতরানের দিকে।
৯০ রানে অবশ্য জীবন পান একবার। রোমারিও শেফার্ডের বলে তার সহজ ক্যাচ ছাড়েন ব্র্যান্ডন কিং। আরেকপাশে ওয়েনের আগ্রাসী ব্যাটিংই হুমকি হয়ে উঠেছিল ডেভিডের শতরানের পথে। তার রান যখন ৯৩, জিততে তখনও ২৩ রান লাগে, এক ওভারে তখন দুটি ছক্কা মেরে দেন ওয়েন।
তবে শেষ পর্যন্ত সুযোগটা পেয়ে যান ডেভিড। ৯৮ থেকে শেফার্ডকে গ্ল্যান্স করে চার মেরে শতরান আর দলের জয়, একসঙ্গেই আদায় করে নেন।

ম্যাচের পর ডেভিড জানালেন ব্যাটিং নিয়ে বিশেষ কাজ করার কথা। শোনালেন রাসেলের ব্যাটের গল্পও।
“কখনও ভাবিনি অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সেঞ্চুরির সুযোগ পাব। আমি তাই খুবই রোমাঞ্চিত। পিচ ভালো ছিল, বাউন্ডারি ছোট ছিল। ওয়ার্নার পার্কে ব্যাটিং করা সবসময়ই দারুণ, সিপিএলের অভিজ্ঞতা কাজে লেগেছে। পাওয়ার ব্যাটিং নিয়ে তো অনেক কাজ করেছি, এখন শট নির্বাচন নিয়ে কাজ করছি।”
“ড্রে রাসের (আন্দ্রে রাসেল) এই ব্যাটটি আমি প্রায় এক বছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছি। আজকে মনে হলো, এই ব্যাট ব্যবহারের সেরা সময় এখনই।”
সিরিজের পরের ম্যাচ সেন্ট কিটসেই, রোববার বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায়।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
ওয়েস্ট ইন্ডিজ: ২০ ওভারে ২১৪/৪ (কিং ৬২, হোপ ১০২*, হেটমায়ার ৯, রাদারফোর্ড ১২, পাওয়েল ৯, শেফার্ড ৯*; ডোয়ার্শিস ৪-০-৪৬-০, অ্যাবট ৪-০-২১-০, এলিস ৪-০-৩৭-১, ম্যাক্সওয়েল ২-০-৩১-০, জ্যাম্পা ৪-০-৫১-১, ওয়েন ২-০-২৩-১)
অস্ট্রেলিয়া: ১৬.১ ওভারে ২১৫/৪ (মার্শ ২২, ম্যাক্সওয়েল ২০, ইংলিস ১৫, গ্রিন ১১, ডেভিড ১০২*, ওয়েন ৩৬*; ব্লেডস ৩-০-৪০-০, হোল্ডার ৩-০-৩৫-১, আকিল ৪-০-৩৯-০, শেফার্ড ৩.১-০-৩৯-২, মোটি ২-০-৩৮-০, চেইস ১-০-২৩-০)
ফল: অস্ট্রেলিয়া উইকেটে ৬ জয়ী
সিরিজ: ৫ ম্যাচ সিরিজে অস্ট্রেলিয়া ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে
ম্যান অব দা ম্যাচ: টিম ডেভিড
৩৭ বলের সেঞ্চুরিতে ডেভিডের 'শৈশবের স্বপ্ন' পূরণ
ডেভিডের দ্রুততম ফিফটি ও সেঞ্চুরির দিনে রেকর্ড বইয়ে আরও যত আঁকিবুকি