Published : 01 Jan 2026, 10:39 PM
নিরুত্তাপ ম্যাচে শেষ দিকে হঠাৎই ছড়াল উত্তেজনা। শেষ ওভারে জমে উঠল নাটক। বারবার রঙ পাল্টাল লড়াইয়ের। রংপুর রাইডার্সের মুঠো থেকে ছুটে গেল জয়। পরাজয়ের দুয়ার থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ম্যাচ ‘টাই’ করার পর, সুপার ওভারে জিতল রাজশাহী ওয়ারিয়র্স।
মূল ম্যাচে শেষ ওভার ও সুপার ওভারে দারুণ বোলিংয়ে রাজশাহীর নায়ক পেসার রিপন মন্ডল।
১৬০ রানের লক্ষ্য তাড়ায় তাওহিদ হৃদয় ও দাভিদ মালানের ফিফটিতে সহজ জয়ের পথে ছিল রংপুর। ৮ উইকেট হাতে নিয়ে শেষ ৩ ওভারে তাদের প্রয়োজন ছিল ২২ রান।
অষ্টাদশ ওভারে স্রেফ ২ রান দিয়ে কাইল মেয়ার্সের উইকেট নিয়ে লড়াই জমিয়ে তোলেন এসএম মেহেরব। পরের ওভারে খুশদিল শাহ ও মালানের একটি করে চারে আসে ১৩ রান।
শেষ ওভারে চাই ৭। রিপন প্রথম বল করেন অফ স্টাম্পের বাইরে, ডিপ পয়েন্টে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন বাঁহাতি খুশদিল। ক্রিজে এসে প্রথম বলে চার মারেন নুরুল হাসান সোহান। পরের বলে অফ স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারিতে ব্যাট ছোঁয়াতে পারেননি তিনি। রংপুর অধিনায়ক ওয়াইডের আবেদন করলেও আম্পায়ার তা দেননি।
চতুর্থ বলে শর্ট ডেলিভারি লেগ সাইডে খেলার চেষ্টায় ঠিকমতো পরেননি সোহান। ব্যাটের কানায় লেগে বল চলে যায় উইকেটের পেছনে। বাউন্ডারিতে শেষ মুহূর্তে পা দিয়ে বল থামান ফিল্ডার, আসে ২ রান। স্কোর তখন সমান।
পঞ্চম বলে লেগ সাইডে মুশফিকুর রহিমের হাতে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন সোহান। শেষ বলে ফুল টসে গ্যাপ খুঁজে পাননি মাহমুদউল্লাহ। শর্ট মিডউইকেটে চমৎকার ফিল্ডিংয়ে বল থামিয়ে, বল হাতে রেখে দৌড়ে এসে নন স্ট্রাইক প্রান্তের স্টাম্প ভেঙে দেন মেহেরব, মাহমুদউল্লাহ রান আউট ও ম্যাচ টাই।
সুপার ওভারে রিপনের দুটি ওয়াইডের পরও ২ উইকেট হারিয়ে রংপুর করতে পারে কেবল ৬ রান। ৩ বলে ১ রান করে বোল্ড হন কাইল মেয়ার্স। শেষ বলে রান আউট হন খুশদিল। এক বল খেলে হৃদয় করতে পারেন ১ রান।
মুস্তাফিজুর রহমানকে দুটি চার মেরে তিন বলেই রাজশাহীকে জিতিয়ে দেন তানজিদ হাসান।
ছয় বছর পর ‘টাই’ দেখল বিপিএল। এর আগে ২০১৯ সালে খুলনা টাইটান্স ও চিটাগং ভাইকিংস এবং পরের বছর কুমিল্লা ওয়ারিয়র্স ও সিলেট থান্ডারের ম্যাচ ‘টাই’ হয়েছিল।
শেষ ওভারের আগ পর্যন্ত এদিন ভীষণ খরুচে ছিলেন রিপন। প্রথম ৩ ওভারে দিয়েছিলেন ৩৭ রান। শেষ পর্যন্ত ৪৩ রানে ২ উইকেট নিয়ে তিনিই টানা দ্বিতীয় ম্যাচে পান সেরার স্বীকৃতি। আগের ম্যাচে আসরে প্রথম খেলতে নেমে ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে ১৩ রানে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন ২২ বছর বয়সী পেসার।
সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ ওভারে ১ উইকেটে ১০৫ রানের শক্ত অবস্থানে ছিল রাজশাহী। সেখান থেকে পথ হারিয়ে ২০ ওভারে ৮ উইকেটে ১৫৯ রানের বেশি করতে পারেনি তারা।
প্রথম তিন ম্যাচে ব্যর্থতার পর এবার ৮ চার ও ২ ছক্কায় ৪৬ বলে ৬৫ রানের ইনিংস খেলেন পাকিস্তানি ওপেনার সাহিবজাদা ফারহান। অধিনায়ক নামজুল হোসেন শান্ত ৫ চার ও এক ছক্কায় করেন ৩০ বলে ৪১। দলটির আর কেউ উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেননি।
প্রথম ম্যাচে ১৭ রানে ৫ উইকেট নেওয়া ফাহিম আশরাফ আবারও রংপুরের সফলতম বোলার ৩ উইকেট নিয়ে, তবে এবার তিনি ছিলেন খরুচে। ৪ ওভারে ৪৩ রান দেন পাকিস্তানের পেস বোলিং অলরাউন্ডার।

দলের সেরা বোলার ছিলেন আসলে আলিস আল ইসলাম। ৪ ওভারে কেবল ১৬ রান দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ২টি উইকেট নেন ২৯ বছর বয়সী রহস্য স্পিনার।
রান তাড়ায় প্রথম ম্যাচে ব্যর্থতার পর এবার ৭ চারে ৩৯ বলে ৫৩ রানের ইনিংস খেলেন হৃদয়। টানা দ্বিতীয় ফিফটিতে ৬ চার ও ২ ছক্কায় ৫০ বলে ৬৩ রান করে অপরাজিত রয়ে যান মালান।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামে রাজশাহী। ম্যাচের প্রথম বলে চার মেরে শুরু করেন সাহিবজাদা। পরের ওভারে তিনি চার মারেন আলিসকে। ওই ওভারেই তানজিদের বিদায়ে থেমে যায় শুরুর জুটি।
এই উইকেটে বড় অবদান আসলে ফিল্ডার লিটন কুমার দাসের। উড়িয়ে মেরে বল আকাশে তুলে দেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান তানজিদ। মিড-অন থেকে বলের দিকে চোখ রেখে লং-অনের দিকে অনেকটা দৌড়ে ফুল লেংথ ডাইভে বল মুঠোয় জমান লিটন।
দারুণ সব শটে এগিয়ে যান সাহিবজাদা। পঞ্চম ওভারে তিনি দুটি ছক্কা মারেন ফাহিমকে, প্রথমটি ডিপ স্কয়ার লেগের ওপর দিয়ে গিয়ে পড়ে গ্যালারিতে।
অন্য প্রান্তে আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনী মেলে ধরেন শান্তও। গতিময় পেসার নাহিদ রানাকে পরপর চার ও ছক্কা মারেন বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।
সাহিবজাদা ফিফটি করেন ৩৪ বলে। পাওয়ার প্লেতে ৫০ রান করা রাজশাহী ১২ ওভারে করে ১ উইকেটে ১০২। তখন ১৮০-৯০ রানে হয়তো চোখ রাখছিল তারা। কিন্তু পরের ওভারে শান্তর দৃষ্টিকটু রান আউটে বদলে যায় চিত্র।
নাহিদ রানাকে পয়েন্টের দিকে খেলে এক রান পূর্ণ করেন শান্ত। ফিল্ডার আলিস প্রথম দফায় বল ধরতে না পারলেও পরে থ্রো করে পাঠান বোলারের কাছে। নাহিদ বল মুঠোয় নিতে না পারলেও, স্টাম্পের কাছেই ছিল বল। কিন্তু সেদিকে খেয়াল না করে দ্বিতীয় রানের জন্য দৌড় শুরু করেন শান্ত। বল ধরে স্টাম্প ভেঙে দেন বোলার।
এরপর অন্যরা যোগ দেন আসার-যাওয়ার মিছিলে। ছক্কার চেষ্টায় বাউন্ডারিতে লিটনের হাতে ধরা পড়েন মুশফিকুর রহিম (১১ বলে ১০)। লিটন আরেকটি অসাধারণ ক্যাচে ফেরেন মোহাম্মদ নাওয়াজ। ইয়াসির আলি, মেহেরবরাও পারেননি শেষের দাবি মেটাতে।
লক্ষ্য তাড়ায় দ্বিতীয় ওভারে রিপনকে তিনটি চার মারেন লিটন। কিন্তু চতুর্থ ওভারে তানজিম হাসানের শর্ট বলে আলগা শট খেলে বিদায় নেন তিনি।
তিন নম্বরে নেমে দারুণ ব্যাটিংয়ে এগিয়ে যান হৃদয়। মালান এদিন শুরুতে সংগ্রাম করছিলেন। পরে ছন্দে খুঁজে পান ইংলিশ ব্যাটসম্যান। জমে ওঠে তাদের জুটি।
হৃদয় ফিফটি করেন ৩৫ বলে। ষোড়শ ওভারে মেহরবের বলে বাউন্ডারিতে তানজিদের দারুণ ক্যাচে ফেরেন তিনি। জুটি থামে ৭২ বলে ১০০ রানে।
মালান ফিফটি করেন ৪৩ বলে। সপ্তদশ ওভারে তানজিমকে মেয়ার্সের ছক্কা ও মালানের চারে রান আসে মোট ১৩।
ম্যাচ তখন রংপুরের মুঠোয়। কিন্তু শেষ দিকে তালগোল পাকিয়ে ম্যাচ টাই করে সুপার ওভারের লড়াইয়ে হেরে গেল তারা।
চার ম্যাচে তিন জয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষস্থান মজবুত করল রাজশাহী। প্রথম ম্যাচে ৭ উইকেটের জয়ে অভিযান শুরু করা ফেভারিট রংপুর এবার পারল না। ২ পয়েন্ট নিয়ে তিন নম্বরে আছে তারা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
রাজশাহী ওয়ারিয়র্স: ২০ ওভারে ১৫৯/৮ (সাবিহজাদা, ৬৫, তানজিদ ২, শান্ত ৪১, মুশফিক ৯, নাওয়াজ ১০, ইয়াসির ৬, তালাত ৬*, মেহরেব ০, তানজিম ৮, রিপন ১*; মেয়ার্স ২-০-১১-০, আলিস ৪-০-১৬-২, ফাহিম ৪-০-৪৩-৩, মুস্তাফিজ ৪-০-৩৪-১, নাহিদ রানা ৩-০-২৭-০, খুশদিল ৩-০-২৬-০)
রংপুর রাইডার্স: ২০ ওভারে ১৫৯/৬ (মালান ৬৩*, লিটন ১৬, হৃদয় ৫৩, মেয়ার্স ৯, খুশদিল ৭, সোহান ৬, মাহমুদউল্লাহ ০; বিনুরা ৪-০-৩১-০, রিপন ৪-০-৪৩-২, তানজিম ৪-০-৩০-১, নাওয়াজ ২-০-২৩-০, মেহেরব ৪-০-১৭-২, তালাত ২-০-১৩-০)
ফল: ম্যাচ টাই ও সুপার ওভারে জয়ী রাজশাহী
ম্যান অব দা ম্যাচ: রিপন মন্ডল