Published : 17 Jan 2026, 08:15 PM
পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস খেলে ম্যান অব দা ম্যাচ দাভিদ মালান। তবে পুরস্কারটি নাহিদ রানা পেলেও হয়তো খুব বিস্ময়ের কিছু থাকত না। বল নয়, এ দিন যেন একের পর এক গোলা ছুড়েছেন তিনি। তার পারফরম্যান্সে প্রশ্নটিও জেগে উঠল, বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে কি তিনি জায়গা করে নিতে পারেন!
দল ঘোষণা হয়ে গেলেও সুযোগটি আছে এখনও। তিনি নিজে অবশ্য এসব নিয়ে ভাবতে নারাজ। রংপুর রাইডার্সের ফাস্ট বোলার স্রেফ করে যেতে চান নিজের কাজটা। তবে এটুকু জানিয়ে রাখলেন, সুযোগটা এলো চেষ্টা করবেন রাঙিয়ে রাখতে।
বিপিএলে শনিবার ঢাকা ক্যাপিটালসের বিপক্ষে চার ওভারে স্রেফ ১১ রানে ৩ উইকেট নিয়ে রংপুর রাইডার্সের জয়ে অবদান রাখেন নাহিদ। টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে এর চেয়ে কম রান তিনি আগে কখনও দেননি।
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে এ দিন তার বোলিংয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেড়শ কিলোমিটার গতির আশেপাশে বোলিং করেছেন। পুরো সময়টাতে তাকে মনে হয়েছে ধারাবাহিক ও ছন্দময়। আগের ম্যাচগুলিতে এই নাহিদকে দেখা যায়নি।
এই ম্যাচের আগে পাঁচ ম্যাচে তার শিকার ছিল চার উইকেট। ওভারপ্রতি রান দিয়েছিলেন ৭.৩১। দলের তিনটি ম্যাচে তিনি ছিলেন একাদশের বাইরে।
এই ম্যাচে ঢাকার রান তাড়ায় পঞ্চম ওভারে বোলিং পান নাহিদ। প্রথম বলেই বুঝিয়ে দেন, এই দিনটি অন্যরকম। গতিময় ডেলিভারিতে বোল্ড করে দেন সাইফ হাসানকে। ওভারে রান আসে কেবল দুটি।
পরের ওভারে আবার তিনি উইকেটের দেখা পান প্রথম বলে। অফ স্টাম্পের বাইরের বলে থার্ডম্যানে ধরা পড়েন সাব্বির রহমান। সেখানেও গতির কারণেই মূলত টাইমিং করতে পারেননি অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান। এই ওভারে রান আসে তিনটি।
আবার বোলিংয়ে ফেরেন তিনি দ্বাদশ ওভারে। উইকেট না পেলেও এবার আসে তিন রান। পরের ওভারে ধরা দেয় তৃতীয় উইকেট। উড়িয়ে মারার চেষ্টায় কাভারে ধরা পড়েন ঢাকার অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন। এই ওভারে রান হয় তিনটি।
সব মিলিয়ে তার ২৪ বলের ১৪টিতে কোনো রান আসেনি। বাউন্ডারি হজম করেননি একটিও।
আসরে আগের পাঁচ ম্যাচের মধ্যে তিনি একাধিক উইকেট পেয়েছিলেন একবার, আগের ম্যাচটিতে সিলেট টাইটান্সের বিপক্ষে ১৮ রানে ২ উইকেট।
পুরো চার ওভার বোলিং পেলেন তিনি এই নিয়ে দ্বিতীয়বার। সব মিলিয়ে স্বপ্নময় একটি দিন বলা যায় তার জন্য।
ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন উঠল, এই ম্যাচের আগে প্রস্তুতিতে তিনি ভিন্ন কিছু করেছিলেন কি-না। নাহিদ বললেন, শুধু দলের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেছেন তিনি।
“না আসলে ভিন্ন কিছু না (প্রস্তুতিতে)। কারণ হচ্ছে আমার পেস, আগেও যা ছিল এখনও তা-ই আছে। সিলেটে শেষ যে কয়েকটা ম্যাচ খেলেছি, ভালো হয়েছে। আমি কখনও ব্যক্তিগত লক্ষ্য হিসেবে দেখি না, আগেও আমার দল চেয়েছে, ডট বল করতে হবে আমি ওটা করার চেষ্টা করছি। যখন আমার দল চেয়েছে যে, তুমি উইকেট টেকিং বোলিং করার চেষ্টা করো, রান বের হয়ে গেলে সমস্যা নাই, আমি ওটাই চেষ্টা করেছি।”
“এখানে আমি স্রেফ একটা জিনিসই চেষ্টা করেছি, এর আগে যেগুলো করছিলাম যে, আমার দল যেটা চাইছে সেটা বাস্তবায়ন মাঠে করতে পারছি কি না। যেমন আজকে দলের একটাই পরিকল্পনা ছিল যে, তুমি রান ছাড়া বোলিং করো এবং উইকেট আসলে অটোমেটিক উইকেট আসবে। ওই জিনিসটা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করছি মাঠে।”
জাতীয় দলের হয়ে এরই মধ্যে তিন সংস্করণেই খেলার স্বাদ পেয়েছেন নাহিদ। তবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে তাকে টেস্টে। সেখানেও তাকে সামলানো হচ্ছে সতর্কতায়। ম্যাচ খেলানো হচ্ছে বেছে বেছে। সব মিলিয়ে তিনি টেস্ট খেলেছেন ১০টি, ওয়ানডে ৫টি, টি-টোয়েন্টি ১টি।
গত বছরের মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি অভিষেকে শারজাহতে ২টি উইকেট পেলেও চার ওভারে রান দিয়েছিলেন তিনি ৫০। এরপর আর সুযোগ মেলেনি এই সংস্করণে।
কিন্তু এমন গতিময় একজন ফাস্ট বোলার, এই বিপিএলে তার যা গতি বা পারফরম্যান্স, সব মিলিয়ে আগামী মাসে শুরু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের স্কোয়াডে তাকে না দেখে অবাক হয়েছেন বিপিএলের বিদেশি ধারাভাষ্যকাররা। ইংলিশ পেস গ্রেট ড্যারেন গফ তো সরাসরিই বলেছেন, নাহিদ রানাকে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ দলে দেখতে চান তিনি।

বিশ্বকাপ দল ঘোষণা করা হলেও ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত দলে পরিবর্তন আনার সুযোগ আছে। তবে বিশ্বকাপ স্কোয়াডে জায়গা না পাওয়া নিয়ে ভাবতেই চান না ২৩ বছর বয়সী। তার মতে, নিজের কাজ ঠিকঠাক করে গেলে সুযোগ আপনাআপনিই আসবে।
“দল নির্বাচনের ব্যাপারটি আমার হাতে নেই, এটা প্রথম কথা। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, আমার কাজ একটাই, কীভাবে পারফর্ম করব। এই জিনিসটা করে যাচ্ছি। আমি জানি যে, আমার যে কোনো সময় সুযোগ আসবে, সুযোগ এলে তখন আমি প্রমাণ করব।”
“আমি তো এখন বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নেই, এজন্য কখনও চিন্তা করি না যে, আমি কেন নেই। যদি আমার ভেতরে স্কিল থাকে, যদি আমি যোগ্য হই, অটোমেটিক আমি ওই জায়গাতে যাব, একদিন পরে, দশ দিন পরে, একদিন আমি সেই জায়গাতে পৌঁছাতে পারব, যদি আমার মধ্যে সেই প্রতিভাটা থাকে।”
গতির রেকর্ডের আনু্ষ্ঠানিক হিসেবে নাহিদ বাংলাদেশের ইতিহাসের দ্রুততম বোলার। ১৫২ কিলোমিটার গতি ছাড়িয়েছেন তিনি। ১৫০ ছাড়িয়েছেন বেশ কবার।
গতিময় বোলারদের অনেকের হয়তো লক্ষ্যে থাকে, পরের ম্যাচে নিজেকে আরও ছাড়িয়ে যাওয়া। নাহিদ অবশ্য বললেন, গতি নিয়ে তার নিজের কোনো লক্ষ্য নেই।
“আমার ব্যক্তিগত লক্ষ্য বলতে একটাই ছিল, সেটা হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলা এবং তিন ফরম্যাটে খেলেছি। এখন একটাই লক্ষ্য, বাংলাদেশ দলে যতদিন সার্ভিস দিতে পারি। ফিট থেকে এটাই হচ্ছে লক্ষ্য, বাংলাদেশকে ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স দেওয়া কিংবা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে যে ফ্র্যাঞ্চাইজিতে থাকব, ওই দলকে ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স দেওয়া। এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান যে, কীভাবে ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স দিব।”
“পেস নিয়ে অত চিন্তা করি না, কারণ এটা কিছুটা গড গিফটেড। আমি চেষ্টা করি কীভাবে ডিসিপ্লিনে থাকা যায় এবং চেষ্টা করি কীভাবে আরও স্কিলের উন্নতি করা যায়। পেস ব্যাপারটি ঠিক আছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেট যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, পেসের সঙ্গে যদি স্কিলের উন্নতি না করেন, আপনি বেশিদিন টিকতে পারবেন না। চেষ্টা করছি পেসের সঙ্গে কীভাবে আমার স্কিলটা আরও উন্নত করা যায়।”
এই উন্নতির পথ ধরে এগিয়ে যেতে পারলে, বিশ্বকাপ খেলতে খুব বেশিদিন হয়তো অপেক্ষায় থাকতে হবে না নাহিদকে।