Published : 12 Oct 2023, 05:42 PM
মাঠের ৬ ও ৭ নম্বর গেট দিয়ে ঢুকলেই সামনে চোখে পড়বে মহেন্দ্র সিং ধোনিকে। নান্দনিক সেই দেয়ালচিত্রে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই পাশ থেকে শোনা গেল একজনের কণ্ঠ। এক নিরাপত্তাকর্মী হাসিমুখে তামিল ভাষায় কিছু একটা বললেন। একটি শব্দই শুধু বোঝা গেল- ‘থালা।’ যেটির মানে নেতা বা সর্দার। এই আঙিনায়, এই শহরে ধোনিকে সবাই ভালোবেসে এই নামেই ডাকে। ‘থালা’ মানেই ধোনি।
ঝাড়খাণ্ডের ধোনি বা রাঁচির মাহি অনেক আগেই হয়ে গেছেন চেন্নাইয়ের ‘থালা।’ ক্রিকেট অনুসারীমাত্রই সেই গল্প অজানা থাকার কথা নয়। আইপিএলে চেন্নাই সুপার কিংসের নেতৃত্বে ধোনির এমনই সাফল্য ও প্রভাব যে, এই শহর তাকে আপন করে নিয়েছেন গভীরভাবে।
তার অধিনায়কত্বে আইপিএলে ৫টি শিরোপা জিতেছে চেন্নাই, রানার্স আপ হয়েছে আরও ৫ বার। ধোনির চেন্নাই আইপিএলের সবচেয়ে ধারাবাহিক ও সফলতম দল। বছরের পর বছর এই দলে খেলে, এই শহরের মানুষের মুখে হাসি ফুটিয়ে, তাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ধোনি হয়ে উঠেছেন এখানকারই সন্তান। এই শহরের ক্রিকেটীয় হৃৎস্পন্দন। তার চেয়ে জনপ্রিয় কেউ সম্ভবত এই তল্লাটে নেই।
ধোনির সেই রাজত্বেই এবার পা পড়েছে বাংলাদেশের। বিশ্বকাপের পথচলা মসৃণ করে তুলতে এখানেই বিচরণ করতে হবে শক্ত পায়ে। কাজটা সহজ নয়। টালমাটাল করে দেওয়ার জন্য যে চেষ্টায় কমতি রাখবে না নিউ জিল্যান্ড!
বিশ্বকাপের আমেজ অবশ্য খুব বেশি নেই এখানে। মাঠকে অবশ্য সাজানো হয়েছে বিশ্বকাপের রঙে। স্টেডিয়ামের গেটের ভেতরে ঢুকলে বোঝা যায়, কোনো একটা যজ্ঞ চলছে। তবে স্রেফ ওইটুকুই। ফটকের বাইরে গেলেই আর বোঝার উপায় নেই, ক্রিকেট শ্রেষ্ঠত্বের মহারণ চলছে এখানে। শহরের নানা জায়গাতেও দু-একটি প্ল্যাকার্ড, ব্যানার ছাড়া সেরকম কোনো প্রচারণা নেই।
মাঠের ঠিক বাইরে কথা হলো ভিজায় কুমার নামের স্থানীয় একজনের সঙ্গে। মাঠের কাছেই তার বাড়ি। তিনি বললেন, বিশ্বকাপকে ঘিরে ঠিক উন্মাদনা তেমন নেই এখানে।
“ভারত-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের সময় অনেক দর্শক ছিল। তবে মানুষের আগ্রহ ততটা নেই। আইপিএলের সময় এলে দেখতে পাবেন, চেন্নাইয়ের মানুষ কতটা ক্রিকেট পাগল। উৎসব হয় তখন এখানে। কিন্তু বিশ্বকাপে সেইরকম পাগলামো নেই। খেলার দিন ভিড় থাকতে পারে।”
পাশ থেকে রামানাথান নামের আরেকজন ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বললেন ধোনির আবেদনের কথা, “আইপিএলের সময় ধোনির টানেই লোকে মাঠে আসে। ধোনিকে দেখতে অনেক দূর থেকেও দর্শকরা আসে খেলা দেখতে। তার জন্য এখানকার লোক পাগল। বিশ্বকাপে তো সেরকম টান নেই। ভারতের ম্যাচ নিয়েই যা কিছু আগ্রহ আছে।”
এখানকার লোকের আগ্রহ থাকুক বা না থাকুক, বাংলাদেশের ক্রিকেট অনুসারীদের দৃষ্টি এখন চেন্নাইতেই। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে, এমএ চিদাম্বারাম স্টেডিয়ামে। ভারতের দ্বিতীয় সবচেয়ে পুরনো ক্রিকেট স্টেডিয়াম এটি। অনেক ইতিহাসের স্বাক্ষী ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই স্টেডিয়াম। তবে এসব কারণে নয়, বাংলাদেশ দল বা ক্রিকেট অনুসারীদের আগ্রহ মূলত এই মাঠের উইকেটকে ঘিরে।
এবারের বিশ্বকাপে এখনও পর্যন্ত একটি ম্যাচ হয়েছে এই মাঠে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই ম্যাচে ভারতের তিন স্পিনার যেভাবে দাপট দেখিয়েছেন, উইকেটে স্পিনারদের সহায়তা যতটা মিলেছে, সেখান থেকেই বাংলাদেশের স্বপ্ন ও আশার বুনন চলছে। স্পিন দিয়ে যদি কাবু করা যায় কিউইদের!
নিউ জিল্যান্ডের স্পিন আক্রমণও যদিও বেশ ধারাল। ইশ সোধি, মিচেল স্যান্টনার, রাচিন রবীন্দ্ররা ভোগাতে পারেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। তবে উইকেট যদি প্রথম ম্যাচের মতো বা কাছাকাছিও থাকে, সত্যিই যদি তাতে স্পিন ধরে, বাংলাদেশেরই বেশি খুশি হওয়ার কথা। এই ধরনের উইকেটে অভ্যস্ততা তাদেরই তো বেশি।

ভিনু মানকাড় থেকে শুরু করে নারেন্দ্র হিরওয়ানি, অনিল কুম্বলে থেকে হারভাজান সিং কিংবা রাভিচন্দ্রন অশ্বিন ও রবীন্দ্র জাদেজা, এই মাঠে অসাধারণ সব পারফরম্যান্স আছে ভারতীয় স্পিনারদের। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এই মাঠে ওয়ানডেতে সবচেয়ে বেশি উইকেট বাংলাদেশের একজন স্পিনারের! ৩ ম্যাচ খেলে এখানে ৮ উইকেট নিয়েছেন মোহাম্মদ রফিক। এতেই তিনি সেরা। খুব বেশি ওয়ানডে ম্যাচ আসলে এখানে হয় না। এটি ভারতের শীর্ষ টেস্ট ভেন্যুগুলোর একটি। আইপিএলের প্রচুর ম্যাচ তো হয়ই।
আইপিএলে বছরের পর বছর ধোনিও তার স্পিনারদের এই মাঠে দারুণ চাতুর্যে ব্যবহার করে ম্যাচের পর ম্যাচ জিতেছেন। উইকেটে স্পিন ধরলে এবং দ্রুত মানিয়ে নিতে পারলে, সাকিব আল হাসান ও মেহেদী হাসান মিরাজদেরও এখানে কার্যকর না হওয়ার কারণ নেই।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশ এই মাঠে একবারই খেলেছে। ১৯৯৮ সালে ত্রিদেশীয় সেই টুর্নামেন্টের স্মৃতি অবশ্য সুখকর নয় মোটেও। কেনিয়ার কাছে সেই ম্যাচে হেরে গিয়েছিল বাংলাদেশ। ওই ম্যাচে খেলা দুজন এবার আছেন ভারতে বিশ্বকাপ অভিযানে। একজন এসেছেন ধারাভাষ্য দিতে- আতহার আলি খান। আরেকজন দলের সঙ্গেই আছেন, তবে টিম ডিরেক্টরের ভূমিকায়- খালেদ মাহমুদ।
২৫ বছর পরে ওই ম্যাচ অবশ্য এমনিতেও অপ্রাসঙ্গিক। তবে সেই ম্যাচেই দুই দলের স্পিনাররা ভালো করেছিলেন। স্পিনাররা আশার ছবি আঁকতে পারেন এবারও।
আইপিএলের ম্যাচ নয় কিংবা ধোনি নেই বলে হয়তো স্থানীয়দের আগ্রহ নেই ম্যাচকে ঘিরে। কিন্তু সাকিব-মিরাজরা এই মাঠের ঐতিহ্য ধরে ছুটতে পারলে, এখান থেকে স্মরণীয় কিছু পেতেই পারে বাংলাদেশের ক্রিকেট!