Published : 06 Jan 2026, 07:08 PM
গ্র্যান্ড হোটেল সিলেটের লবিতে দেখা সাবেক এক ক্রিকেটারের সঙ্গে। এখন আছেন বিপিএলের একটি দলের কোচিং স্টাফে। কুশলাদি বিনিময় শেষেই তার প্রশ্ন, ‘কি হবে ভাই বলুন তো, বাংলাদেশের দাবি কি মানবে আইসিসি?’ ততক্ষণে সেই আলোচনায় যোগ দিয়েছেন আরেক ক্রিকেটার। তার কৌতূহলী জিজ্ঞাসা, “মুস্তাফিজের টাকাটা কি হবে? কিছু অংশ কি দেবে…?”
শুধু ওই দুজনেরই নয়, প্রশ্নগুলো এখন অসংখ্য মানুষের। মুস্তাফিজকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ব্যাপারটি যেমন শুধু ক্রিকেটে সীমাবদ্ধ নয়, পুরো প্রসঙ্গ ঘিরে আগ্রহ ও আলোচনাও ক্রিকেটের সীমানা ছাড়িয়ে স্পর্শ করেছে তারা আঙিনা। বিপিএলের চেনা ক্রিকেটীয় আবহেও ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে এই বিতর্ক। ক্রিকেটার, কোচ এবং সংশ্লিষ্ট অনেকেরই নানা প্রশ্ন, মতামত আর ভাবনার ওড়াউড়ি চলছে সিলেটে।
এবারের বিপিএলে মুস্তাফিজ যেমন বোলিং করে চলেছেন, তাকে নিয়ে আলোচনা স্বাভাবিক। কিন্তু সব ছাপিয়ে গেছে তার আইপিএল থেকে বাদ পড়াকে ঘিরে সৃষ্ট পরিস্থিতি। বিপিএল তথা দেশের ক্রিকেট এখন মুস্তাফিজময়।
টানা দুই দিন ম্যাচ খেলার পর মঙ্গলবার অনুশীলন ছিল না রংপুর রাইডার্সের। সতীর্থদের সঙ্গে দিনটি বিশ্রামে কাটিয়েছেন মুস্তাফিজ। পরিবারকে নিয়ে ঘুরতেও বেরিয়েছিলেন এ দিন। বিকেলের দিকে স্ত্রী-সন্তানকে নিয়েই একটু ঢু মেরে গেলেন সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে। বেশ ফুরফুরেই দেখা গেল তাকে। তবে ভারত-বাংলাদেশের ক্রিকেট উত্তাল এখন তাকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়া নিয়েই।
সিলেট আন্তর্জাতিক স্টেডিয়ামে এ দিন অনুশীলন করতে আসা চার দলের সংবাদ সম্মেলনেই উঠেছে মুস্তাফিজের প্রসঙ্গ। সাধারণ আড্ডা কিংবা আলোচনাতেও এটির উপস্থিতি তীব্র। ক্রিকেট বা দুই দেশের বোর্ড ছাপিয়ে দুই দেশের টানাপোড়েন, দুই দেশের সংবাদ মাধ্যমেই চলছে বিতর্কে ঝড়। ক্রিকেটীয় রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক নানা বাস্তবতা নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ।
বিসিবি সভাপতি সোমবার জানিয়েছে, আইসিসির তরফ থেকে সভায় ডাকা হবে বিসিবিকে এবং তারা সেটির অপেক্ষা করছেন। অনলাইনেই হবে সভাটি। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্তও সেটি হয়নি। এরপর আইসিসি কর্তাদের নিজেদের মধ্যে আলোচনার ব্যাপার তো আছেই। আপাতত চূড়ান্ত কিছু না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা ও উৎকণ্ঠার পালা হয়তোচলতেই থাকবে ।
মুস্তাফিজকে অবশ্য এসব স্পর্শ করছে সামান্যই। বরাবরই তিনি একটু নির্লিপ্ত ধরনের মানুষ। উচ্ছ্বাস কিংবা হতাশা, বা কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়াই কখনও খুব একটা তীব্রভাবে দেখা যায় না তার মধ্যে। আইপিএল থেকে বাদ পড়ায় তার ক্রিকেটীয় ক্ষতির পাশাপাশি বিশাল অঙ্কের আর্থিক প্রাপ্তির হাতছানিও মিলিয়ে গেছে। তবে তার বিপিএল দলের অধিনায়ক নুরুল হাসান সোহান বলছেন, “মুস্তাফিজ বিন্দাস আছে।” বিপিএল দলের ব্যাটিং কোচ আশরাফুল বলছেন, “মুস্তাফিজ চিল মুডে আছে।”
সিলেটে মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় দলে তার সতীর্থ ও ঢাকা ক্যাপিটালস দলের অলরাউন্ডার মোহাম্মদ সাইফ উদ্দিন শোনালেন মজার কথা। মুস্তাফিজের মন ভার হতে পারে মনে করে কিছুটা দুর্ভাবনা ছিল তাদের। কিন্তু তিনি দেখেছেন পুরো উল্টো চিত্র।
“আমরা তো সবাই জানি মুস্তাফিজ আমাদের জন্য অনেক বড় একটা সম্পদ। ওর সঙ্গে ড্রেসিংরুম ভাগাভাগি করতে পেরে, জাতীয় দলে একসঙ্গে থাকতে পেরে আমরা সবাই গর্বিত। সবশেষ ম্যাচে যেহেতু আমরা (ঢাকা ক্যাপিটালস) রংপুরের সঙ্গে খেলেছি, খেলা শেষে যখন আমরা সঙ্গে ডাইনিংয়ে খাচ্ছিলাম, ওকে ডাকলাম আমার পাশে বসতে। আমরা যতটা চিন্তিত বা হতাশ, ওকে দেখে একদমই তেমন মনে হলো না।”
“ওকে দেখে বরং মনে হলা রিল্যাক্সড আাছে। ও সবসময় যে রকম গান শোনে, রিল্যাক্সড থাকে, ওরকমই মনে হয়েছে। চিন্তা করলাম যে, ও এত রিল্যাক্সড আছে, আমরা এত চিন্তা করে লাভ কী! এরপর আমরাও রিল্যাক্সড আছি!”

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের আউটার মাঠের এক প্রান্তে অনুশীলন ছিল সাইফ উদ্দিনদের ঢাকা ক্যাপিটালসের, আরেক প্রান্তে ছিল রাজশাহী ওয়ারিয়র্সের অনুশীলন। এই দলের পেসার তানজিম হাসানকে একটু পরে পাওয়া গেল সংবাদ সম্মেলনে। বাংলাদেশের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে তিনিও আছেন সাইফ, মুস্তাফিজের সঙ্গে।
মুস্তাফিজকে বাদ দেওয়ার পর বিসিবি যে শক্ত অবস্থান নিয়েছে, সেটির প্রশংসা করলেন তানজিম। ভবিষ্যতে আইপিএলের নিলামে নাম দেওয়া নিয়ে বাড়তি ভাবনার কথাও তিনি জানালেন।
“এটাই বোর্ডের কাজ আসলে। এখানে বোর্ড অবশ্যই তাকে সাপোর্ট করবে এবং সাপোর্ট করেছেও, যেটা খুবই প্রশংসাযোগ্য এবং এটাই বোর্ডের কাজ।”
“আইপিএল থেকে উনাকে (মুস্তাফিজ) কেন সরিয়ে দিল বা ইয়ে করল, এটা আসলে আমরা কেউই জানি না। হয়তো পলিটিক্যাল ইস্যু হতে পারে, তবে ক্রিকেটে রাজনীতি না আসাটাই ভালো। আমরা তো চাই… আমরা তো আসলে পলিটিক্যাল দিক দিয়ে চিন্তা করি না। ক্রিকেটার হিসেবে আইপিএল খেলায় ইচ্ছা থাকে। ওই হিসাবে আমরা নাম দেই (নিলামে)। পরের বছর যদি… এজেন্টের সাথে কথা বলে বা দেশের যারা আছে, তাদের সাথে কথা বলে আমরা বুঝব নাম দেব নাকি নাম দেব না।”
সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার ও সিলেট টাইটান্সের ব্যাটিং কোচ ইমরুল কায়েস অবশ্য ব্যাপারটির খুব গভীরে যেতে চাইলেন না।
“এটা আসলে ভূ-রাজনীতির ব্যাপার। এটা আমার বিষয় নয়, আমার কথায় কোনো কিছুর সমাধান হবে না। আপনিও জানেন এসব কেন হচ্ছে, আমিও জানি কেন হচ্ছে। সাবেক ক্রিকেটাররা যারা টুইট করেছেন, তারাও জানেন কী হয়েছে। আমি বলে কোনো লাভ নেই, আপনি বলেও লাভ নেই। যেটা বলার, সেটাই হচ্ছে।”
বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেটীয় সম্পর্কের যে টানাপোড়েন, এর চেয়েও অনেক বড় টানাপোড়েন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চলছে অনেক বছর ধরেই। সেই উত্তাপের আঁচ অবশ্য এখনও সেভাবে পুরোপুরি পাননি পাকিস্তানের উঠতি অলরাউন্ডার মাজ সাদাকাত। তবে ক্রিকেটকে রাজনীতিমুক্ত রাখার আহবান জানালেন নোয়াখালী এক্সপ্রেসে খেলতে আসা এই ২০ বছর বয়সী ক্রিকেটারও।
“ক্রিকেটের মধ্যে রাজনীতি টেনে আনা ঠিক নয়। খেলা পাকিস্তান-ভারত হোক বা ভারত-বাংলাদেশ, সিম্পল ক্রিকেট রাখা উচিত। আমি এসব ব্যাপার নিয়ে খুব বেশি বলতে চাই না। তবে ক্রিকেটে এসব আসা ঠিক নয়।”
সব মিলিয়ে সংবাদ সম্মেলন, মাঠ, হোটেল, দেশের ক্রিকেটের অলিগলি থেকে শুরু করে নানা প্রান্তে এখন মুস্তাফিজের উপস্থিতি। এটির দাপটে ম্লান বিপিএলের সব ধরনের ক্রিকেটীয় আলোচনা।