Published : 11 Mar 2026, 08:21 PM
রোজার কারণে হোক বা অন্য নানা কারণে, গ্যালারির বেশির ভাগ অংশই ফাঁকা। শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে দর্শক বড়জোর হাজার দুয়েক। যারা মাঠে এলেন, তারা স্বাক্ষী হলেন স্মরণীয় অভিজ্ঞতার। বাংলাদেশের একজন ফাস্ট বোলার ওয়ানডেতে ব্যাটসম্যানদের মনে কাঁপন ধরাচ্ছেন, আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন, নাড়িয়ে দিচ্ছেন প্রতিপক্ষকে, এমন কিছু আর হয়েছে কবে!
ফাল্গুনের দুপুর-বিকেলে গতি আর বাউন্সের সৌরভ ছড়ালেন নাহিদ রানা। প্রতিটি ডেলিভারিই যেন একেকটি ঘটনা, প্রতিটি উইকেটই রোমাঞ্চের রসদ।
ধ্বংস আর সৌন্দর্য সাধারণত একসঙ্গে থাকে না। ভয় আর ভালো লাগাও খুব একটা থাকে না পাশাপাশি। কিন্তু নাহিদ রানার বোলিংয়ে বিপরীতধর্মী ব্যাপারগুলিও যেন একাকার হয়ে গেল মিলে মিশে।
তার রান আপের সঙ্গে মাঠের গুটিকয় দর্শক সুর ধরলেন দারুণ কিছু আকাঙ্ক্ষা নিয়ে, তার উইকেট প্রাপ্তিকে ওই হাজার দুয়েক দর্শকই গলা ফাটিয়ে তুললেন গর্জন। একজন গতিময় পেসারকে দেখার যে আনন্দ, একজন এক্সপ্রেস বোলারের যে রোমাঞ্চ, বাংলাদেশের ক্রিকেটে গত বছর দুয়েক ধরেই তা বয়ে চলেছেন নাহিদ। এবার তা প্রথমবার উপহার দিলেন তিনি দেশের হয়ে রঙিন পোশাকে।
টানা পাঁচ ওভারে পাঁচ উইকেট, মিরপুরে বুধবার নাহিদ একাই ধসিয়ে দিলেন পাকিস্তানের ব্যাটিং। সেই ধস শুধু উইকেট শিকারের দিক থেকেই নয়, মানসিকভাবেও। তার গতির সামনে স্বস্তিতে ছিলেন না পাকিস্তাসের একজন ব্যাটসম্যানও। কতবার তারা পরাস্ত হয়েছেন, কতবার অল্পের জন্য বল ছোবল দেয়নি ব্যাটে, কতবার শরীরে বাতাস লাগিয়ে কিপারের কাছে চলে গেছে বল, সেসবের ইয়ত্তা নেই। সত্যিকার অর্থেই যেন আতঙ্ক ছড়িয়েছিলেন তিনি পাকিস্তানের ড্রেসিং রুমে।

তার সবকটি উইকেটই মূলত গতির অবদান। সাহিবজাদা ফারহানকে আউট করা ডেলিভারিটি খুব ভালো ছিল না। তবে গতির কারণেই চার মারার মতো ডেলিভারিতে পয়েন্টে ক্যাচ দিয়েছেন এই পেসার। শামিল হুসাইন ও মাজ সাদাকাত শর্ট বল ঠিকমতো সামলাতে পারেননি গতির কারণেই।
মোহাম্মদ রিজওয়ানকে আউট করা ডেলিভারিটি গর্বিত করতে পারে শোয়েব আখতার, ব্রেট লি, শেন বন্ড বা যে কোনো এক্সপ্রেস বোলারকেই। তুমুল গতির সঙ্গে ছিল সুইং ও মুভমেন্ট, লাইন ও লেংথ ছিল নিখুঁত। উইকেটের পেছনে লিটন দাসের দারুণ ক্যাচ পুরো ব্যাপারটিকে দিয়েছে পূর্ণতা।
সালমান আলি আগার উইকেটও এসেছে গতির ঝড়েই। শরীর তাক করা ডেলিভারি কাঁপিয়ে দেয় ব্যাটসম্যানকে। শর্ট লেগে একজন ফিল্ডার রাখা ছিল এই ডেলিভারির জন্যই। সালমানের ব্যাট থেকে তীব্র গতিতে আসা বল দারুণ ক্ষিপ্রতায় হাতে জমান তানজিদ হাসান।
পাকিস্তানের বিপক্ষে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের হয়ে এতদিন ৫ উইকেট শিকারের একমাত্র কীর্তি ছিল মুস্তাফিজুর রহমানের। তবে সেটিকে আদতে ‘কীর্তি’ বলা কঠিন। ২০১৯ বিশ্বকাপে সেই ম্যাচে ৭৫ রান খরচায় ৫ উইকেট কিনেছিলেন তিনি। এবার নাহিদ সত্যিকার অর্থেই ৫ উইকেট আদায় করে নিলেন।
আম্পায়ার আঙুল তুললে বা বাংলাদেশ রিভিউ নিলে পরের ওভারে ফাহিম আশরাফের উইকেটও পেতে পারতেন তিনি। সেটা হয়নি। তবে টানা সাত ওভারের স্পেল করে বুঝিয়ে দিয়েছেন, ফিটনেসেও উন্নতি করছেন।
সব মিলিয়ে নাহিদের এই পারফরম্যান্স বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য দারুণ এক সুখবর। এরকম ‘ইম্প্যাক্ট’ বোলার দলে থাকা, মুহূর্তেই খেলার রঙ বদলে দেওয়ার মতো একজন ফাস্ট বোলার থাকা যে কোনো দলের জন্যই আশীর্বাদ।
নাহিদের আবির্ভাব বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য সৌভাগ্যের। তার যত্ন ও পরিচর্যা করা, তাকে লালন করার দায়িত্বও বাংলাদেশ ক্রিকেটের।