Published : 21 Dec 2025, 10:39 AM
জশ টংয়ের ব্যাট ছুঁয়ে আসা বল স্লিপে মুঠোয় জমিয়েই ছুট দিলেন মার্নাস লাবুশেন। তবে খুব বেশি দূর যেতে পারলেন না। দ্রুতই ধরা পড়লেন সতীর্থদের আলিঙ্গনে। মানববৃত্ত তৈরি করে চলল আনন্দনৃত্য। অধিনায়ক প্যাট কামিন্স একটু পেছনে পড়ে গিয়েছিলেন। তিনি ছুটে এসে কোনোরকমে জায়গা করে নিলেন সেই বৃত্তে। ট্রাভিস হেড তো সেই জায়গাও পেলেন না। একটু পরে এসে তিনি লাফিয়ে উঠে গেলেন সেই বৃত্তের মাথায়। চোট পেয়ে মাঠের বাইরে ক্রাচে ভর দিয়ে থাকা ন্যাথান লায়নও তখন পারলে মাঠে ছুটে যান!
সেই আনন্দ, এই উচ্ছ্বাস শুধু ম্যাচ জয়ের নয়, এটি অ্যাশেজ জয়ের উদযাপন। কত আলোচনা, কত উত্তেজনা এই সিরিজ নিয়ে, ইংল্যান্ডের কত স্বপ্ন আর আকাশছোঁয়া প্রত্যাশা! সবকিছুর সমাপ্তি প্রথম তিন টেস্টেই। দুর্দান্ত পেশাদারিত্ব, অসাধারণ স্কিল আর দারুণ উজ্জীবিত পারফরম্যান্সে প্রথম তিন টেস্টেই সিরিজ জিতে অ্যাশেজ ধরে রাখা নিশ্চিত করল অস্ট্রেলিয়া।
পার্থে দুই দিন, ব্রিজবেনে চার দিনে জয়ের পর অ্যাডিলেইডে ম্যাচ গড়ায় পঞ্চম দিনে। শেষ দিনে কিছুটা লড়াইও করে ইংল্যান্ড। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া ম্যাচ জিতে নেয় ৮২ রানে। তুমুল আলোচিত অ্যাশেজের ফয়সালা স্রেফ ১১ দিনের ক্রিকেটেই!
এই নিয়ে টানা পাঁচ সিরিজ ধরে অ্যাশেজ ধরে রাখল অস্ট্রেলিয়া। এর মধ্যে তিনটি তারা জিতেছে, দুটি হয়েছে ড্র। ইংল্যান্ড সবশেষ অ্যাশেজ জিতেছে ঘরের মাঠে ২০১৫ সালে।
এই ম্যাচের ভাগ্য মোটামুটি গড়া হয়েছিল আগের দিনই। স্রেফ চার উইকেট হাতে নিয়ে শেষ দিন শুরু করে ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার জয় ছিল সময়ের ব্যাপার। কিন্তু প্রথম সেশনে ফিল্ডিংয়ের সময় চোট পেয়ে লায়নের ছিটকে পড়া, ফলো থ্রুতে পিচের বিপজ্জনক অংশে পা পড়ায় দুবার ‘ওয়ার্নিং’ পাওয়া মিচেল স্টার্ক শুধু রাউন্ড দা উইকেটে বোলিং করতে বাধ্য হওয়া, চোট কাটিয়ে ফেরা প্যাট কামিন্সের বোলিং সীমাবদ্ধতা আর ইংলিশদের প্রতিরোধ, সব মিলিয়ে লড়াই জমে ওঠে বেশ। অভাবনীয় কিছু অবশ্য পরে আর হয়নি। স্টার্কের দারুণ বোলিংয়ের সঙ্গে মার্নাস লাবুশেনের অবিশ্বাস্য স্লিপ ক্যাচিংয়ে ম্যাচ শেষ দ্বিতীয় সেশনে।

৬ উইকেটে ২০৭ রান নিয়ে রোববার দিন শুরু করে ইংল্যান্ড। জেমি স্মিথ ও উইল জ্যাকস লড়াই চালিয়ে যান। দিনের খেলার ৪৮ মিনিট হওয়ার পর নামে বৃষ্টি। গ্যালারিতে থাকা ‘বার্মি আর্মি’ উল্লাসে স্বাগত জানায় সেই বৃষ্টিকে। তবে খুব বেশিক্ষণ বন্ধ থাকেনি খেলা। স্মিথ ও জ্যাকসের লড়াই চলতে থাকে।
৫টি চার ও ২ ছক্কায় পঞ্চাশে পা রাখেন স্মিথ, তার প্রথম অ্যাশেজ ফিফটি।
দ্বিতীয় নতুন বল নেওয়ার তৃতীয় ওভারে এই জুটি থামে ৯১ রানে। স্টার্ককে দারুণ দুটি শটে টানা দুটি বাউন্ডারির পর নিজেকে সামলাতে পারেননি স্মিথ। পরের বলেই চেষ্টা করেন উড়িয়ে মারতে। মিড অনে ক্যাচ নেন কামিন্স।
ইংল্যান্ডের লড়াই থামেনি এরপরও। জ্যাকসের সঙ্গে এবার প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ব্রাইডন কার্স। চোটের কারণে লায়ন ছিটকে পড়ায় ট্রাভিস হেড, মার্নাস লাবুশেনের মতো অনিয়মিত বোলারদের আক্রমণে আনতে হয় অস্ট্রেলিয়াকে। হেড বোলিং করেন ১৫ ওভার।
এই জুটিও পেরিয়ে যায় ফিফটি। জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় রান নেমে আসে একশর নিচে। অভাবনীয় কিছু ইংল্যান্ড করে ফেলবে কি না, সেই আলোচনা টুকটাক শুরু হয়ে যায় ধারাভাষ্যকক্ষে। তখনই জাদুকরি একটি মুহূর্ত।
স্টার্কর বলে জ্যাকসের ব্যাটের কানায় ছোবল দিয়ে বল যায় পেছনে। কিপার অ্যালেক্স কেয়ারি ডাইভ দিয়ে বল গ্লাভসে জমানোর পথেই ছিলেন। কিন্তু স্লিপ থেকে বাঁদিকে ফুল লেংথ ডাইভ দিয়ে অবিশ্বাস্যভাবে বাঁ হাতে বল জমিয়ে ফেলেন লাবুশেন। প্রথম ইনিংসেও বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে বল মাটি ছোঁয়ার ঠিক আগে চোখধাঁধানো ক্যাচ নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এবারের ক্যাচে ছাড়িয়ে গেলেন বুঝি নিজেকেও। ব্যাটসম্যান জ্যাকস যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। ১৭৭ মিনিট লড়াই করে তার ইনিংস থামে ৪৭ রানে।
এরপর স্রেফ শেষের অপেক্ষা। স্টার্ককে উড়িয়ে ডিপ পয়েন্টে ধরা পড়েন জফ্রা আর্চার। টংকে ফিরিয়ে ম্যাচ শেষ করে দেন স্কট বোল্যান্ড। লাবুশেনের ক্যাচে ম্যাচের সমাপ্তি মানিয়ে যায় যেন দারুণভাবে।
অস্ট্রেলিয়ার এই জয়ে অবদান বেশ কজনের। ম্যাচ সেরার লড়াইয়ে ছিলেন দ্বিতীয় ইনিংসে ১৭০ রানের ইনিংস খেলা হেড, চোট কাটিয়ে ফিরেই ম্যাচে ছয় উইকেট নেন কামিন্স, অলরাউন্ড পারফরম্যান্স মেলে ধরেন স্টার্ক। তবে প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরি ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৭২ রানের পাশাপাশি ম্যাচে সাতটি ডিসমিসাল করে ঘরের মাঠে ম্যান অব দা ম্যাচ অ্যালেক্স কেয়ারি।
৩-০ হয়ে যাওয়ার পর এবার অস্ট্রেলিয়ার অভিযান ৫-০ করার। ঐতিহ্যবাহী বক্সিং ডে টেস্ট মেলবোর্নে শুরু আগামী শুক্রবার।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ৩৭১
ইংল্যান্ড ১ম ইনিংস: ২৮৬
অস্ট্রেলিয়া ২য় ইনিংস: ৩৪৯
ইংল্যান্ড ২য় ইনিংস: (লক্ষ্য ৪৩৫, আগের দিন ২০৭/৬) (স্মিথ ৬০, জ্যাকস ৪৭, কার্স ৩৯*, আর্চার ৩, টং ১; স্টার্ক ১৭-৩-৬২-৩, কামিন্স ১৭-৪-৪৮-৩, বোল্যান্ড ১৭.৫-৫-৩৫-১, লায়ন ২৫-৬-৭৭-৩, গ্রিন ১০-০-৪৪-০, হেড ১৫-৩-৬১-০, লাবুশেন ১-০-৭-০)।
ফল: অস্ট্রেলিয়া ৮২ রানে জয়ী।
সিরিজ: পাঁচ ম্যাচ সিরিজের তিনটি শেষে অস্ট্রেলিয়া ৩-০তে এগিয়ে।
ম্যান অব দা ম্যাচ: অ্যালেক্স কেয়ারি।