Published : 30 Apr 2026, 09:03 AM
২০১৩ সালে নিউ জিল্যান্ড দলের হয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন তরুণ এক লেগ স্পিনার। চট্টগ্রাম টেস্ট দিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটেসেবার পথচলায় শুরু হয়েছিল তার। সেই তিনি এবার চট্টগ্রামেই দুটি উইকেট নিয়ে স্পর্শ করলেন নিউ জিল্যান্ডের সর্বোচ্চ টি-টোয়েন্টি উইকেটের রেকর্ড। সম্ভাবনাময় টেস্ট লেগ স্পিনার থেকে দেশের সফলতম টি-টোয়েন্টি বোলার হয়ে ওঠার গল্প শোনালেন ইশ সোধি।
৩৩ বছর বয়সী লেগ স্পিনার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে কথা বললেন তার উপমহাদেশের শেকড়, নিউ জিল্যান্ডের ক্রিকেটীয় আবহে বেড়ে ওঠা, লেগ স্পিনের নানা কৌশল, নিজের ক্যারিয়ার, শেন ওয়ার্ন ও ড্যানিয়েল ভেটোরির সঙ্গে সম্পর্ক, বাংলাদেশের লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেনের প্রতি মুগ্ধতাসহ অনেক কিছু নিয়ে।
একটু ব্যক্তিগত প্রশ্ন দিয়েই শুরু করা যাক, স্রেফ কৌতূহল মেটানোর জন্য। আপনার পুরো নাম ইন্দারবির সিং সোধি, সেখান থেকে ‘ইশ’ নামটি কিভাবে এলো?
ইশ সোধি: বলতে গেলে, ছেলেবেলায় বাবা-মা আমাকে মাঝেমধ্যে ‘ইশু’ বলে ডাকতেন। আবার যখন নিউ জিল্যান্ডে থিতু হলাম, তখন ওখানকার লোকেদের ‘ইন্দারবির’ নামটা বলতে বিপাকে পড়তে হতো। তো, একটা গল্পের বই ছিল, যেখানে ‘ইশমায়েল’ নামের একটা পাখি ছিল। ‘ইন্দারবির’ নামটা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারত না বলে আমার বন্ধুরা আমাকে সংক্ষেপে ‘বার্ডি’ বলে ডাকত। সেই ‘বার্ড’ থেকে ‘ইশমায়েল’, তারপর ‘ইশমায়েল’ থেকে ‘ইশ’ বলে ডাকতে শুরু করে। ব্যস!
নামের দারুণ বিবর্তনই বলতে হবে! আপনার জীবনের পথও তো নানা বাঁক নিয়েছে। আপনার দাদা-দাদী তো পাকিস্তান থেকে ভারতে এসেছিলেন। আপনার জন্ম পাঞ্জাবের লুধিয়ানায়। সেখান থেকে আপনি নিউ জিল্যান্ডের হয়ে সবচেয়ে বেশি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলা ক্রিকেটার। বিস্ময়কর এক ভ্রমণ!
সোধি: দেশভাগের আগেই আমার দাদা-দাদী পাকিস্তানের সেই অঞ্চল ছেড়ে ভারতে চলে যান। আমার জন্ম পাঞ্জাবে। আমার বয়স যখন চার বছর, তখন বাবা-মা ঠিক করলেন যে, তাঁরা নতুন জীবন, নতুন চ্যালেঞ্জ আর নতুন পেশার জন্য বিদেশে চলে যাবেন। তাই তারা চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
প্রথমে তারা কানাডায় যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ভিসা পাননি। এরপর অস্ট্রেলিয়ায় যাওয়ার চেষ্টা করেন। তারপর, নিউ জিল্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ আসে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৯৬ সালে তারা সেখানে যান। আমি খুবই কৃতজ্ঞ যে, তারা একটি ছোট পরিবার নিয়ে দেশান্তরের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পরিবারের ভবিষ্যতের স্বার্থে, নতুন জীবন শুরু করার কঠিন কাজটি তারা করেছিলেন এবং সবকিছু দারুণভাবে এগিয়েছে।
আপনি এখন সেই দেশের সফলতম টি-টোয়েন্টি বোলার। আগের ম্যাচে দুই উইকেট নিয়ে টিম সাউদির রেকর্ড স্পর্শ করেছেন (১৬৪ উইকেট) । এই অর্জনকে কিভাবে দেখেন?
সোধি: খুবই গর্বিত। নিউ জিল্যান্ডে যেখানে আমরা থাকতাম, যেখান থেকে উঠে এসেছি, জায়গাটির নাম পাপাটোয়টোয়, দক্ষিণ অকল্যান্ডের একটি ছোট্ট উপশহর, সেখান থেকে উঠে আসতে পারা….খুব বেশি ক্রীড়াবিদ উঠে আসেনি সেখান থেকে, ক্রিকেটার তো নয়ই। কিছু রাগবি খেলোয়াড় আছেন, কিন্তু ক্রিকেটার খুব বেশি নেই। মাঝেমধ্যে নানা কারণে দুর্নামও হয় এই অঞ্চলেন। তো একজন অভিবাসী হয়ে, দক্ষিণ অকল্যান্ডের ওই এলাকা থেকে উঠে এসে একজন গর্বিত ক্রিকেটার হিসেবে একটি রেকর্ড নিজের করে নিতে পারাটা আমার কাছে সত্যিই বিশেষ কিছু।
এই মাইলফলকের মানে আপনার কাছে কী?
সোধি: স্রেফ সংখ্যা বা এসবের নিরিখে এই মাইলফলকটির তেমন কোনো তাৎপর্য নেই। কিন্তু আরও বৃহত্তর ছবিটা দেখলে, আমি দেখেছি, আধুনিক যুগের বেশ কিছু সেরা স্পিন বোলার নিউ জিল্যান্ডে এসে আমাদের কন্ডিশনে টি-টোয়েন্টিতে রীতিমতো হিমশিম খেয়েছেন, যা প্রমাণ করে যে টি-টোয়েন্টির জন্য এটি কতটা কঠিন একটি জায়গা। শুধু টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলাই নয়, বরং এত দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকার ব্যাপারটিও আছে।
আমার সবচেয়ে গর্বের ব্যাপার হলো এই যে, এত দীর্ঘ সময় ধরে নিউ জিল্যান্ডে একজন লেগ-স্পিনার হিসেবে ক্যারিয়ার চালিয়ে যেতে পেরেছি। আমি পেছন ফিরে তাকাই অনেক বেশি গর্ব নিয়ে, তবে সেটা সংখ্যার জন্য নয়। দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে পথ খুঁজে নিয়ে এখানে টিকে থাকার অনুভূতিটাই আসল।
একজন লেগ-স্পিনারের জন্য যে কোনো সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো টিকে থাকার ক্ষমতা। তবে নিউ জিল্যান্ডে স্পিনার হিসেবে খেলাটা আরও চ্যালেঞ্জের… ছোট মাঠ, খুব ভালো উইকেট, পেস বান্ধব কন্ডিশন। লেগ স্পিনার হওয়াটা এখানে সহজ নয়। সেখানে এত লম্বা ক্যারিয়ার গড়তে পারাটা দারুণ।

আপনার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা টেস্ট ক্রিকেট দিয়ে, সাড়ে ১২ বছর আগে এই বাংলাদেশেই। কিন্তু আপনি হয়ে উঠলেন টি-টোয়েন্টি বিশেষজ্ঞ কিংবা সাদা বলের স্পেশালিস্ট। এই পরিবর্তনটাকে কিভাবে দেখেন?
সোধি: আমার তো দারুণ লাগে। সত্যি বলতে, আমাদের ছেলেবেলায়.. এমনকি সম্ভবত ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়েও, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটকে আমরা সম্ভাব্য পেশা হিসেবে দেখতাম না। এটা ছিল নিছক বিনোদনের জন্য। টেস্ট ক্রিকেটই ছিল চূড়ান্ত। সবসময় ভাবতাম যে, যেহেতু লাল বলের ক্রিকেটে প্রথমে সুযোগ পেয়েছি, এটাই হবে আমার ক্যারিয়ারের গতিপথ।
কিন্তু সমস্যা হলো, আপনি যদি গত ১০- ১৫-২০ বছরে দেখে থাকেন, দেখবেন খুব বেশি লেগ স্পিনার নেই, যাদের টেস্ট ক্যারিয়ার দীর্ঘ হয়েছে। ফিঙ্গার স্পিনাররা বেশি কার্যকর হয়েছে তাদের নিখুঁত নিশানা ও পিচে বল পড়ার পর যেভাবে সাড়া দেয়, সবকিছু মিলিয়ে। এই সময়ে সম্ভবত কেবল ইয়াসির শাহ টেস্ট ক্রিকেটে অসাধারণ পারফর্ম করেছেন। আমি যখন খেলা শুরু করি, তখন দানিশ কানেরিয়া ছিলেন, অনিল কুম্বলে এবং শেন ওয়ার্নও ছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় টেস্টে লেগ স্পিনারদের জন্য খুব বড় কোনো জায়গা ছিল না। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেভেন্দ্রা বিশু একটা সময় বেশ ভালো করছিলেন।
আমার হয় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে আসাটা একটা সহজাত বিবর্তন ছিল, বিশেষ করে ২০১০-এর দশকের শুরুতে, বা পরে ২০১৩- ১৪- ১৫-১৬ সালের সময়টায়। যে বোলাররা দুদিকেই বল ঘোরাতে পারে, তারা ওই সময়টায় টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে বড় সম্পদ হয়ে উঠল এবং সেই সামর্থ্য আমার ছিল। একটা লম্বা সময় ধরে সেটা করেছি।
এখন পরিস্থিতি হয়তো আবার কিছুটা বদলাচ্ছে, ফিঙ্গার স্পিনাররা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে খুব ভালো করছে। এখন মনে হচ্ছে, লেগ স্পিনার হিসেবে টিকে থাকতে হলে, আমাদের হয়তো এমন কিছু স্কিল গড়ত হবে, যা এই মুহূর্তে ফিঙ্গার স্পিনাররা করছে, যাতে আমরা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে নিজেদের গুরুত্ব বাড়াতে পারি।
এখন ক্যারিয়ারের যে পর্যায়ে আছি, এখান থেকে সামনের পথচলাও একটা দারুণ অভিজ্ঞতা হতে চলেছে।
টি-টোয়েন্টিতে কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য বলের গতিও বাড়াতে হয়েছে আপনার!
সোধি: তা তো বটেই। এখনও আরও দ্রুত বল করার নতুন নতুন উপায় শিখছি। জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় আমি চেষ্টা করেছি শেন ওয়ার্ন বা স্টুয়ার্ট ম্যাকগিলের মতো বল ঝুলিয়ে সামনে রাখতে ও ড্র্রিফটিং স্লো লেগ-স্পিন করতে। কিন্তু খেলাটা বদলে গেছে, আমাদেরও এসবের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।
ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আপনাকে টেস্ট ক্রিকেটের জন্যই বেশি সম্ভাবনাময় মনে করা হয়েছে। ড্যানিয়েল ভেটোরি থেকে শুরু করে অনেকেই আপনার দারুণ সম্ভাবনা দেখেছেন। কিন্তু মাত্র ২১টি টেস্ট খেলতে পেরেছেন। মনে হয় না, ক্যারিয়ারটা অপূর্ণ রয়ে গেছে বা অসমাপ্ত কাজ কিছু আছে?
সোধি: অসমাপ্ত কাজ কিছু আছে বলে মনে করি না, তবে অবশ্যই আবার (টেস্টের) বিবেচনায় থাকতে চাই। আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হলো, ঘরোয়া ক্রিকেটে (প্রথম শ্রেণির ম্যাচে) যখন ফিরি, দু-একটি ম্যাচই কেবল খেলতে পারি। এরপর টি-টোয়েন্টিতে ফিরে আসতে হয়, জাতীয় দলে খেলি, বিশ্বকাপ বা এরকম আসরে দলের সঙ্গে থাকি। সারা বছর ধরে খুব বেশি ক্রিকেট খেলার সুযোগ হয় না।
এমন যদি হয় যে, চার দিনের ম্যাচ একটু বেশি পরিমাণে খেলতে পারলাম দেশে এবং এমন পারফর্ম করতে পারি যে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা যায় না আমাকে, তখন দারুণ একটা ইতিবাচক জায়গায় থাকা যাবে। ব্যাপারটা এমন নয় যে টেস্টে আরও কিছু উইকেট নেওয়া বা রান করতে হবে আমাকে। মূল ব্যাপার হলো, টেস্ট ম্যাচ জয়ের অংশ হতে আমি ভালোবাসি। আমার মনে হয়, ক্রিকেট মাঠে আমার সবচেয়ে তৃপ্তিদায়ক অনুভূতি এটিই। সেই অনুভূতিটা আবার ফিরে পাওয়ার তাড়নাটাই আমাকে আরও বেশি টেস্ট খেলার জ্বালানি হিসেবে কাজ করে।

এই চট্টগ্রামেই আপনার টেস্ট অভিষেক। কতটা মনে আছে সেই ম্যাচের?
সোধি: কিছুই না। একদম শূন্য! ভীষণ নার্ভাস ছিলাম। বয়স তখন মাত্র ২০, খুবই ছোট ছিলাম। মাথা একদম ফাঁকা। পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে গেছে (হাসি)।
আমি শুধু... ওহ, আসলে আমার মনে আছে, একটা ব্যাপার মনে আছে, ব্যাট করতে নেমে সাকিব আল হাসানের মুখোমুখি হওয়ার কথা। নিঃসন্দেহে যিনি সর্বকালের সেরা টেস্ট অলরাউন্ডারদের একজন। ওরকম একজন বোলারের মুখোমুখি হওয়াটা এমন ছিল… আমার শুধু মনে আছে, আগে কখনও ওরকম স্পিনারের মুখোমুখি হইনি। এর আগে তো বলতে গেলে বাচ্চাদের সঙ্গেই খেলতাম, আগের বছরই অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ছিলাম। সেখান থেকে এসে এই ধরনের বল খেলা… আমার মনে আছে, যে বলটায় আমাকে আউট করেছিল, এলবিডব্লিউ হয়েছিলাম, বলটা যখন তার হাত থেকে বের হলো, এত বেশি ঘূর্ণন ছিল, ড্রিফট করে ভেতরে ঢুকে পিচ করে গতি আরও বেড়ে যায় এবং আমি কিছু বোঝার আগেই বল আমার প্যাডে লেগে যায়। আমি ভাবছিলাম, এটা কী হলো! টেস্ট ক্রিকেটের স্তরটাও বুঝতে পারলাম যে এত উঁচু।
এশিয়ায় যারা প্রচুর রান করে, তাদের সত্যিই দারুণ প্রশংসা করি আমি। এই কন্ডিশনে এত উঁচু মানের বোলারদের বিপক্ষে খেলাটা খুবই কঠিন।
আপনিও তো কঠিন কাজটি করেছিলেন। দ্বিতীয় টেস্টেই মিরপুরে ফিফটি করেছিলেন ১০ নম্বরে নেমে!
সোধি: হ্যাঁ, ৬০ করেছিলাম (৫৮)।। আমি তো খুবই দক্ষ ও গোছানো ব্যাটসম্যান! (হাসি)।
কিন্তু না, কাজটা যে কত কঠিন, সেই উপলব্ধিটা খুব ভালোভাবেই হয়েছিল। এজন্যই যখন কাটেনে ক্লার্ক প্রথম ম্যাচে ভালো করল… এশিয়ায় আগে খেলেনি সে, কিন্তু এবার এসে প্রথম ম্যাচে ফিফটি করেছে, এতেই ফুটে ওঠে, নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেটের গভীরতা কতটা।
নিউ জিল্যান্ডের নানা জনকে এই প্রশ্নটা নানা সময়েই করা হয়। স্রেফ ৫২-৫৫ লাখ মানুষের দেশ, ক্রিকেট সেখানে প্রধান খেলাও নয়, তার পরও এত প্রতিভা উঠে আসে কিভাবে?
সোধি: আমরা খেলতে ভালোবাসি। প্রতিযোগিতা করতে ভালোবাসি। জন্মগতভাবেই আমরা খুবই প্রতিভাবান এবং ক্রীড়ানৈপুণ্য সম্পন্ন জাতি। একেবারে শুরু থেকেই, যত শিশুকে দেখবেন, তারা সবাই বাড়ির পেছনের উঠোনে খেলাধুলা করে। সেখানে প্রচুর পার্ক এবং খোলা জায়গা আছে, সেসব জায়গায় গিয়ে সবাই খেলে।
আরেকটি কারণ হলো, আমরা বেশ কিছুদিন ধরে আন্তর্জাতিকভাবে নানা খুবই শক্তিশালী, যা শিশুদের শেখার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে দেয়। ক্রিকেট, রাগবি, সব খেলাতেই আমরা নিজেদের সামর্থ্যের চেয়ে ভালো করার চেষ্টা করি।
আরও অনেক কিছু নিশ্চয়ই আছে। পুরো ব্যাপারটিই চমৎকার। আসলে এটি নিয়ে গবেষণা করা উচিত। আপনি ঠিকই বলেছেন, ৫৫ লাখ মানুষের দেশ থেকে এসে বিভিন্ন ইভেন্টে বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা করছে, নিশ্চয়ই বিশেষ কিছু সেখানে আছে। নিউ জিল্যান্ডের বাইরের কেউ এই প্রশ্নটি যখন কেউ করে, উত্তর দেওয়া খুব কঠিন হয়ে যায়, কারণ খেলাধুলা করা, খেলার জন্য মুখিয়ে থাকা, প্রতিযোগিতা করা এবং মজা করা, এসব আমাদের ডিএনএ-র মধ্যেই রয়েছে।
কিছুদিন আগে একটি সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছিলেন, ফ্লিপার নিয়ে কাজ করে চলেছেন। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে লিটন দাসকে আউট করা ডেলিভারিটি কি ফ্লিপারের চেষ্টা করেছিলেন?
সোধি: না, ওটা ফ্লিপার ছিল না। ফ্লিপার অনেক করছি এখন, কিন্তু ওই বলটা শুধু হাতের সামনের দিক থেকে করা। ওই সময়ে ওই প্রান্তে বল করা বেশ কঠিন ছিল, কারণ বাতাস খুব জোরাল ছিল, তাই বলটাকে আরেকটু ‘ফ্ল্যাট’ আর নিচু করার চেষ্টা করছিলাম।
শেষ পর্যন্ত যেভাবে বলটা হয়েছে, তাতে আমি সত্যিই খুশি। লিটন দাস খুব ভালো ব্যাটসম্যান, আইপিএলে ছিল, দীর্ঘ সময় ধরে রান করেছে এবং স্পিন খুব ভালো খেলে থাকে। ওরকম একজন ভালো ব্যাটসম্যানকে এভাবে আউট করতে পারা সত্যিই তৃপ্তিদায়ক।
কিছুদিন আগে একটি সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছেন, এখনও মাঝেমধ্যে শেন ওয়ার্নকে টেক্সট পাঠান, বিশেষ করে ফ্লিপারে উইকেট পেলে। সবশেষ টেক্সট কবে দিয়েছেন?
সোধি: সবশেষটি পাঠিয়েছিলাম গত বিশ্বকাপের সময়… কিংবা সম্ভবত একটি (দ্বিপাক্ষিক) সিরিজের সময়, কারণ ফ্লিপারে উইকেট নিয়েছিলাম একটি। ভিডিও পাঠিয়ে বলেছিলাম, “দেখো বন্ধু, ফ্লিপারে উইকেট নিয়েছি। যদি তুমি দেখতে পেতে…!”
তো এরকমই আর কী। আশা করি, কোনোভাবে তিনি মেসেজটি দেখতে পাবেন। সত্যি বলতে, আমাদের বেড়ে ওঠার সময়টায় আমাদের ওপর এত প্রভাব ছিল তার! তার সঙ্গে আমার সম্পর্কটাও ছিল খুবই স্পেশাল এবং আজীবন তা লালন করব।
বেড়ে ওঠার সময় তো ড্যানিয়েল ভেটোরির ভক্তও ছিলেন! আপনাদের বাসায় নাকি ভেটোরি ছিলেন ইশ্বরের মতো!
সোধি: একদম, ঠিকই শুনেছেন। আমরা তাকে খুব ভালোবাসতাম। ক্যারিয়ারের শুরুতে তার সঙ্গে ড্রেসিংরুমে থাকতে পারাটা ছিল আমার পরম সৌভাগ্য। তার শেষ টেস্ট ম্যাচে খেলার সুযোগও পেয়েছিলাম।
এমন কিছু মানুষ থাকেন, ছেলেবেলায় যারা আপনার নায়ক হয়ে ওঠেন, পরে কখনও দেখা হলে তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্য শব্দও ঠিকমতো খুঁজে পাওয়া যায় না, তাদের চারপাশ থেকে যেন দ্যুতি ঠিকরে বেরোয়। আমি জানি না সবার ক্ষেত্রে এমনটা হয় কি না, কিন্তু যেহেতু আমার শেকড় এই অঞ্চলে, বেড়ে ওঠার সময় তারকাদের প্রতি মুগ্ধতাটা খুবই প্রবল। সেরকম ব্যাপারই ছিল।
তার সঙ্গে সময় কাটানো এবং তার কাছ থেকে শেখার অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ।
এখনও যোগাযোগ হয় তার সঙ্গে?
সোধি: ইদানিং খুব বেশি হয় না। যতদূর জানি, তার সঙ্গে মিচ স্যান্টনার বেশ কথা বলেন। বাঁ হাতি স্পিনটাই তাদেরকে সেভাবে বেঁধে রেখেছে। আমার অনেক দিন দেখা হয়নি তার সঙ্গে।
সামনে এরকম আদর্শ কেউ থাকা জরুরি। ছেলেবেলায় কাউকে আদর্শ মানা, কেউ কারও মতো হতে চাওয়াটা একটা প্রেরণা বা তাড়না হিসেবে কাজ করে। ড্যানও আমার জন্য তেমনই একজন ছিলেন।

আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে আপনি এত সফল, কিন্তু আইপিএলে খুব বেশি খেলার সুযোগ পাননি (২০১৮ ও ২০১৯ আসর মিলিয়ে রাজস্থান রয়্যালসে ৮টি ম্যাচ)। আদিল রাশিদ, অ্যাডাম জ্যাম্পার মতো লেগ স্পিনারদের ক্ষেত্রেও বাস্তবতা এরকমই। কারণটা কি মনে হয়?
সোধি: বিদেশি লেগ স্পিনারদের জন্য ওখানে কাজটা বেশ কঠিন। এই স্পিনারদের মধ্যে রাশিদ খানের মান তো অন্য পর্যায়ের। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তিনি অবিশ্বাস্যরকম ভালো খেলছেন। ভেতরে আনা ও বাইরে নেওয়া, দুটিতেই তার যে গতি, তা দারুণ।
আইপিএলে বিদেশি স্পিনারদের কথা বললে… আসলে ভারতেই অনেক ভালো স্পিনার আছে, ভারতের যেখানেই যান না কেন, খুব ভালো স্পিনার পাবেনই। বিদেশি স্পিনারদের মধ্যে যারা আইপিএলে সুযোগ পেয়েছে এবং বেশ কিছুদিন টিকে আছেন, তারা শীর্ষ সাতের মধ্যে ব্যাটও করতে পারেন। মিচ স্যান্টনার যেমন বিশ্বের বৈচিত্রময় স্পিনারদের একজন, কিন্তু সে ব্যাট হাতেও বড় শট খেলতে পারে এবং ক্রিজে গিয়েই ঝড় তুলতে পারে (ব্যাট হাতে)। জর্জ লিন্ডা যেমন, নিঃসন্দেহে খুব কার্যকর বোলার কিন্তু আগ্রাসী ব্যাট করার দারুণ সামর্থ্যও তার আছে এবং সম্প্রতি বদলি হিসেবে দল পেয়েছে।
এই কারণেই হয়তো আমার বা আদিল রাশিদের মতো বোলার, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাদের অনেক উইকেট আছে, কিন্তু ওসব লিগে আমরা ততটা সুযোগ পাই না। তাই এখন নিউ জিল্যান্ডে যখন তরুণ স্পিন বোলারদের উঠে আসতে দেখি, তাদেরকে উৎসাহ দেই প্রথম দিন থেকেই যেন তারা ছক্কা মারতে শেখে। কারণ তারা যদি ওই ধরনের লিগে খেলতে যায়, তবে তাহলে একাধিক স্কিল কাজে লাগাতে পারবে।
রিশাদ হোসেনের সঙ্গে দেখা করবেন বলে জানিয়েছিলেন। দেখা হয়েছে?
সোধি: হ্যাঁ, খানিকটা কথা হয়েছে। প্রথম ম্যাচে মাঠেই দেখা হয়েছিল এবং খেলার পর অল্প কিছুক্ষণ কথা হয়েছে। তার সঙ্গে বসে কিছুক্ষণ গল্প করার সুযোগ আসলে এখনও হয়নি, তবে কোনো এক সময় করব অবশ্যই, হয়তো সিরিজের শেষে।
সেদিন সংবাদ সম্মেলনে রিশাদের অনেক প্রশংসা করলেন। তাকে টেস্টে দেখতে চান বলে জানালেন। তার কোন ব্যাপারটি আপনার স্পেশাল মনে হয়?
সোধি: সে খুবই প্রথাগত লেগ-স্পিনার। বেশ লম্বা হওয়ায় প্রচুর বাউন্স পায়, যা মারাত্মক। বলে প্রচুর ঘূর্ণন দিতে পারে এবং উচ্চতাকে দারুণভাবে কাজে লাগাতে পারে, যা চমৎকার একটি গুণ।
তিন সংস্করণেই তার খেলতে না পারার কোনো কারণ আমি দেখি না। যদিও এরকম বোলার এখন কম এবং শেন ওয়ার্নের মতো কাউকে দখার সৌভাগ্য অনেক দিন ধরেই হচ্ছে না আমাদের। সেরকম বৈচিত্রময় স্পিনার এখন নেই। ব্যাপারটি হয়ে গেলে ভালো টেস্ট বোলার অথবা ভালো সাদা বলের বোলার। ভালো টেস্ট লেগ-স্পিনার হতে হলে সাদা বলের স্কিল বিসর্জন দিতে হয়, আবার সাদা বলের ভালো লেগ স্পিনার হতে হলে লাল বলের স্কিল ত্যাগ করতে হয়। কিন্তু এই যুগেও রিশাদ যা করছে, তা হলো প্রথাগত লেগ স্পিন বোলিং করে যাওয়া এবং টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এটি বেশ সফল হচ্ছে। হয়তো সে এটা করতে পারবে (টেস্টে সফল হতে)।
বাংলাদেশের সঙ্গে তো বেশ ম্যাচ খেলেছেন। কোন ব্যাটসম্যান আপনাকে সবচেয়ে ভালো সামলেছে?
সোধি: মুশফিকুর রহিম বেশ ভালো ব্যাটসম্যান। সাকিব তো নিঃসন্দেহে অসাধারণ। লিটন দাসও খুব ভালো একজন ব্যাটসম্যান, সুইপ, স্লগ সুইপ, কাভারের ওপর দিয়ে খেলা, এরকম অনেক অপশন তার আছে। অনেকেই খুব ভালো।
সাব্বির রহমান নামে একজন ছিল, খুব ভালো ব্যাটসম্যান, নিউ জিল্যান্ডে এসে দুর্দান্ত খেলেছে। আমার মনে আছে, এখানে যখন শুরুতে এসেছিলাম, আমার টেস্ট সিরিজের সময়, মুমিনুল হককে আউটই করা যেত না! যত পরিকল্পনা, যত চেষ্টাই করা হোক, মনে হতো সে যেন টানা আট দিন ব্যাট করার পরিকল্পনা নিয়ে নেমেছে!
স্পিনের বিপক্ষে ভালো খেলে, এরকম বেশ কজনই আছে।
আপনার র্যাপ কেমন চলছে?
সোধি: খুব ভালো, শিগগিরই রকস্টার হতে চলেছি! (হাসি)… নাহ, টেরিবল, খুব বাজে অবস্থা, অনেক দিন ধরেই র্যাপ করছি না। আপাতত একটু জিরিয়ে নিচ্ছি।