Published : 23 Jul 2025, 11:56 AM
বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বারবার জোর দিয়েই বললেন, তারা কেবলই এই সভার ‘হোস্ট’, কেবল ‘লজিস্টিকাল সাপোর্ট’ দেওয়া ছাড়া আর কোনো ভূমিকা নেই তাদের। কিন্তু যে সভায় বিসিসিআইয়ের (বোর্ড অব কন্ট্রোল ফর ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া) কোনো প্রতিনিধি থাকছেন না, বরং তারা সভা বয়কট করেছেন বলে খবর সংবাদমাধ্যমের, অনুপস্থিত থাকতে পারেন আরও কিছু দেশের প্রতিনিধি, সেই সভা ঘিরে নানা প্রশ্ন তা থাকেই। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আঞ্চলিক ক্রিকেট রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচে কি পড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ?
ঢাকায় বৃহস্পতিবার এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিলের (এসিসি) বার্ষিক সাধারণ সভা। বাংলাদেশ বা বিসিবি এই সভার আয়োজক হলো প্রথমবার।
যদিও নানা দেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় সম্ভাব্য কোরাম সঙ্কটের কারণে সভা পিছিয়ে যাওয়ার নানা গুঞ্জনও ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সভা হচ্ছে বলেই জানিয়েছে বিসিবি। বুধবার হবে প্রধান নির্বাহীদের বৈঠক।
এসিসির এই সভা নিয়ে গত কিছুদিন ধরেই চলছে নানা আলোচনা ও গুঞ্জন। বিশেষ করে, ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের নানা খবর বাড়িয়ে দেয় কৌতূহলের উপকরণ।
বাংলাদেশ-পাকিস্তান সিরিজের দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টি শেষে বিসিবি সভাপতি আমিনুল সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ব্যাখ্যা করলেন এই সভায় বিসিবির ভূমিকা কেমন।
“এসিসির সভার ব্যাপারটি পরিষ্কার করি। এশিয়ার ৫টি পূর্ণ সদস্য ও ২৫টি সহযোগী সদস্য নিয়ে তারা কাজ করে। এসিসির কাজ থেকে আমাদের কাছে প্রস্তাব এসেছিল যে আমরা এই এজিএম আয়োজন করতে চাই কি না। আমরা রাজি হয়েছি।”
“এটি এসিসিরই প্রোগ্রাম। আমরা তাদেরকে লজিস্টিকাল সাপোর্ট করছি। এটাই একমাত্র ব্যাপার, যা আমরা করছি।”
সভা নিয়ে বারংবার প্রশ্নে বিসিবি সভাপতি আবারও বললেন একই ধরনের কথা।
“আমরা এসিসির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। তারা জানাচ্ছে কে আসছেন, কে আসছেন না, তাদের কখন এয়ারপোর্ট থেকে পিক করতে হবে, হোটেল বুকিং, অনুষ্ঠানস্থলে আমাদের কী কী সাপোর্ট দিতে হবে, এসব। এর বাইরে আমাদের কোনো কাজ নেই।”
কিন্তু ব্যাপারটি কি এতটাই জলবৎ তরলং? গোটা ক্রিকেট বিশ্বের জানা, এসিসি তো বটেই, আইসিসিতেও মূল ভূমিকা থাকে ভারতীয় বোর্ডের। তাদের সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করে অনেক কিছু। সেই ভারতীয় বোর্ডের কোনো প্রতিনিধি যে সভায় থাকছে না, এটা নিশ্চিত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তো দাবি, ভারতীয় বোর্ড এই সভা বয়টক করেছে।
পদাধিকার বলে এসিসির বর্তমান প্রধানের দায়িত্ব পালন করছেন পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) সভাপতি মহসিন নাকভি। ভারতীয় বোর্ড বরাবরই এসিসিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না। নাকভি দায়িত্বে আসার পর থেকে সেই পাত্তা না দেওয়ার ব্যাপারটি বেড়েছে আরও। রাজনৈতিক টানাপোড়েনের জের ধরে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দেশের ক্রিকেটীয় সম্পর্ক তো অনেক বছর ধরেই বন্ধ। গত এপ্রিলে কাশ্মীরের পাহেলগাঁওয়ে সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে দুই দেশের মতো দুই বোর্ডের সম্পর্কও বিস্ফোরন্মুখ হয়ে উঠেছে।

গত এক বছরে পিসিবির সঙ্গে বিসিবির ঘনিষ্ঠতাকে ঘিরে এই অঞ্চলের ক্রিকেট রাজনীতি এমনিতেই নতুন মোড় নিয়েছে। এবার এসিসি তথা মহসিন নাকভির অনুরোধে বিসিবির এই সভা আয়োজনকেও ভারতীয় বোর্ড খুব ভালোভাবে দেখছে না বলেই খবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের।
ভারতীয় বোর্ডের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার তাগিদ আছে এই অঞ্চলের বেশির ভাগ বোর্ডেরই। শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট ও আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডও এই সভায় কোনো প্রতিনিধি পাঠানো নিশ্চিত করেনি এখনও। এশিয়াতে আইসিসির পূর্ণ সদস্য পাঁচ দেশের তিনটিই যদি অনুপস্থিত থাকে, তাহলে সভার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই তো প্রশ্ন উঠবে প্রবলভাবে। সহযোগী দেশগুলির বেশ কিছু বোর্ডও প্রতিনিধি পাঠাবে না বলে শোনা যাচ্ছে।
পিসিবি ও বিসিবি মিলে কয়েকদিন ধরে আফগান বোর্ডকে রাজি করাতে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে। লঙ্কান বোর্ডের কোনো প্রতিনিধিকেও অনলাইনে রাখার চেষ্টা চলছে। সবকিছু নিশ্চিত হতে পারে বুধবার। তবে ভারতীয় বোর্ডের প্রতিনিধি না থাকা মানে এশিয়া কাপ নিয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে না এখানে।
এই সভা ঘিরে শেষ পর্যন্ত এই অঞ্চলের ক্রিকেট রাজনীতির সমীকরণে বাংলাদেশ বিপাকে পড়তে পারে কি না, এই প্রশ্ন সরাসরিই করা হয়েছিল বিসিবি প্রধানকে। তিনি এই শঙ্কা উড়িয়েই দিলেন।
“আমার মনে হয় না (সমস্যা হবে)। ক্রিকেট সবার ওপরে। এই ধরনের সমস্যা হবে না বলেই মনে হয়। আমি আবারও বলছি, আমরা কেবলই আয়োজক। আগে কখনও আমরা এজিএম হোস্ট করিনি। বোর্ডের সবাই মিলে, দেশের সবাই মিলে আমরা চেষ্টা করব যেন ভালো একটা এজিএম হয়।”
আইসিসির ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় দীর্ঘদিন সহযোগী দেশগুলোতে কাজ করা আমিনুল বেশ রোমাঞ্চিত এই দেশগুলোকে বাংলাদেশে আমন্ত্রণ জানাতে পেরে।
“আমাদের জন্য এটা ভালো বিষয় যে বিভিন্ন সহযোগী দেশগুলি আমাদের এখানে আসছে। আগে আমরা যেমন পূর্ণ সদস্য দেশগুলোকে বড় ভাই হিসেবে দেখতাম, এখন তারা আমাদেরকে সেভাবে দেখছে। আমাদের যে ক্রিকেট সংস্কৃতি আছে, আমরা চেষ্টা করব তুলে ধরতে। ওদের সামনে আমরা এখানে পাকিস্তানের সঙ্গে সিরিজ জিতেছি, ওরাও দেখবে আমরা কত শক্তিশালী ক্রিকেট জাতি।”
এসিসির সভার ফাঁকে পিসিবি সভাপতির সঙ্গে আলাদা বৈঠক করার কথাও বললেন বিসিবি সভাপতি।
“পাকিস্তান বোর্ডের প্রেসিডেন্ট আসছেন, তিনি এখন এসিসির প্রধান। এটা তার প্রোগ্রাম। এর ফাঁকে ফাঁকে আমরা আলোচনা করব যদি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বাড়ানো যায়, ক্রিকেট নিয়ে আরও যদি আলোচনা বাড়ানো যায়, সেই চেষ্টা করব।”
তবে বিসিবি সভাপতি যেটাই বলুন, শঙ্কার মেঘ কিছুটা থাকছেই। এসিসির বার্ষিক সাধারণ সভা বরাবরই ছিল স্রেফ আনুষ্ঠঅনিকতার ব্যাপার। সেই সভায় অংশগ্রহণ নিয়ে সদস্য দেশগুলোর এত টানাপোড়েন, এমন বিভাজন আগে দেখা যায়নি।