Published : 09 Oct 2025, 01:48 AM
টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন চলছে দিনবদলের গান, কিন্তু ওয়ানডের রথ ছুটছে যেন পেছন পানে। আইসিসি র্যাঙ্কিংয়ে ১০ নম্বরে নেমে যাওয়া দল আরেকটি সিরিজের শুরুটা করল পরাজয় দিয়ে। টি-টোয়েন্টি সিরিজে হোয়াইটওয়াশড হওয়া আফগানিস্তান ৫০ ওভারের সংস্করণে নিজেদের মেলে ধরল ভিন্ন রূপে।
তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথমটিতে বাংলাদেশকে ৫ উইকেটে হারাল আফগানিস্তান।
আবু ধাবিতে দারুণ বোলিং পারফরম্যান্সে মেহেদী হাসান মিরাজের দলকে ২২১ রানে আটকে রেখে আফগানরা জয় পায় ১৭ বল বাকি রেখে।
বল হাতে তিন উইকেটের পর ব্যাটিংয়ে ৪০ রানের কার্যকর ইনিংস খেলে ম্যাচের সেরা আজমাতউল্লাহ ওমারজাই।
আলাদা করে বলতে হবে রাশিদ খানের কথাও। দুর্দান্ত এক স্পেলে তিন উইকেট নিয়ে ইনিংসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে তিনি বড় ভূমিকা রাখেন বাংলাদেশের রান এত কমে রাখতে।
টস জিতে ব্যাটিং নিয়ে অধিনায়ক মিরাজ বলেন, ২৮০ রানের আশেপাশে স্কোর গড়তে চান তারা। কিন্তু টপ অর্ডার পারেনি দলকে শক্ত ভিড় গড়ে দিতে। মিডল অর্ডারে মিরাজ ও হৃদয় ফিফটি করেছেন। কিন্তু বল খেলে ফেলেছেন বড্ড বেশি। ১০১ রানের জুটি গড়তে মান্ধাতার আমলের ব্যাটিংয়ে বল লেগেছে তাদের ১৪২টি!
দুজনের কেউ পরে তা পুষিয়ে দিতে পারেননি। এরপর নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানোয় প্রত্যাশিত উচ্চতা স্পর্শ করেনি স্কোর।
বাংলাদেশের ইনিংসের ১৬৯ বল থেকে কোনো রান আসেনি। আফগানদের ইনিংসেও ‘ডট’ ডেলিভারি ছিল ১৫৩টি। তবে তাদের জন্য সেটি বড় ব্যাপার হয়নি, রান তাড়ায় লক্ষ্য তো আর বড় ছিল না!
ম্যাচের শুরুতে বাংলাদেশকে জোড়া ধাক্কা দেন আজমাতউল্লাহ ওমারজাই। বরাবরের মতোই সুইং ও মুভমেন্ট আদায় করে নেন তিনি। চার রানে সহজ ক্যাচ দিয়ে জীবন পেয়ে এক বল পরই আউট হন তানজিদ হাসান (১০)। আলতো করে মিড অফে ক্যাচ দেন নাজমুল হোসেন শান্ত (১০)।
টি-টোয়েন্টি রাঙিয়ে ওয়ানডেতে এসে সাইফ হাসানের শুরুটা ছিল আশা জাগানিয়া। তবে ওয়ানডে অভিষেকে তার সম্ভাবনাময় ইনিংসের অপমৃত্যু হয় ২৬ রানে। বাঁহাতি স্পিনার নানগেলিয়া খারোটের প্রথম ওভারেই ইনসাইড-আউট খেলে রাশিদ খানের দারুণ ক্যাচের শিকার হন তিনি।

৫৩ রানে ৩ উইকেট হারানো দলকে এগিয়ে নেন হৃদয় ও মিরাজ। তবে আবু ধাবিতে এমন বড় মাঠে এক-দুই রান বেশি নেওয়ার অবারিত সুযোগ থাকলেও ততটা পারেননি দুই ব্যাটসম্যানের কেউই। হৃদয়ের ভোগান্তিই ছিল বেশি। চাপ কমাতে হুট করে বড় শট খেলে তিনটি ছক্কা তিনি আদায় করতে পেরেছেন, কিন্তু রানের গতি বাড়াতে পারেননি সেভাবে।
মন্থর জুটিপর পরও আড়াইশ রান পেরিয়ে যাওয়ার পথে ছিল বাংলাদেশ। ৩৫ ওভার শেষে রান ছিল ৩ উইকেটে ১৫৩। এরপরই ইনিংসের উল্টোযাত্রা।
শতরানের জুটি ভাঙে রান আউটে। টানা তৃতীয় ফিফটিতে হৃদয় ফেরেন ৮৫ বলে ৫৬ রান করে।
এরপর বাংলাদেশকে চেপে ধরেন রাশিদ। গুগলিতে মিরাজকে ফিরিয়ে প্রথম আফগান বোলার হিসেবে স্পর্শ করেন ২০০ ওয়ানডে উইকেট। ৮৭ বল খেলে বাংলাদেশ অধিনায়ক করেন ৬০ রান।
রাশিদের বলেই বিভ্রান্ত হয়ে এলবিডব্লিউ হন জাকের আলি (১০) ও দুই বছর পর ওয়ানডে খেলতে নামা নুরুল হাসান সোহান (৭)।
কিছুটা লড়াই করে তানজিম হাসান ফেরেন ১৭ রানে। ১২ ওভারে ৫২ রানের মধ্যে ৬ উইকেট হারায় বাংলাদেশ।
শেষ ব্যাটসম্যান তানভির ইসলাম ছক্কা ও চারে ২২০ ছাড়ায় দলের রান।
এই পুঁজি নিয়ে বোলিংয়ে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল দ্রুত উইকেট। কিন্তু ইব্রাহিম জাদরান ও রাহমানউল্লাহ গুরবাজ আফগানিস্তানকে এনে দেন ভালো শুরু। দুজনের সাবলীল ব্যাটিংয়ে নবম ওভারে পঞ্চাশ পেরিয়ে যায় দল।
দশম ওভারে তানভিরের স্পিনে ইব্রাহিম (২৩) স্টাম্পড হলে ভাঙে এই জুটি। তিনে নামা সেদিকউল্লাহ আটালকে টিকতে দেননি তানজিম।
তবে গুরবাজ ও রেহমাত শাহর জুটি টেনে নেয় আফগানদের। বাংলাদেশ অবশ্য বেশ আঁটসাঁট বোলিং করে এই সময়টায়। তবে রান রেটের চাপ ছিল না বলে দুই ব্যাটসম্যানের কেউ খুব তাড়া দেখাননি। এক পর্যায়ে টানা ৭৩ বলে আসেনি বাউন্ডারি।
আফগানিস্তানের প্রথম পঞ্চাশ আসে ৫০ বলে, পরের পঞ্চাশ ৯৪ বলে।
রেহমাতের শুরুটা অস্বস্তিময় হলেও পরে কাটিয়ে উঠে ফিফটি করন ৬৮ বলে। আফগানিস্তানের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে চার হাজার ওয়ানডে রানও পেরিয়ে যান এই পরিক্রমায়।
তবে ফিফটি ছোঁয়ার পরই তাকে থামান তানজিম। অন্য প্রান্তে ঠিক ৫৯ রানেই মিরাজের দুর্দান্ত ডেলিভারিতে বোল্ড গুরবাজ। দুজনের জুটিতে আসে ৭৮ রান।
জোড়া উইকেটে ম্যাচে প্রাণ ফেরায় বাংলাদেশ। হাশমাতউল্লাহ শাহিদি প্রথম বলেই ক্যাচ হননি অল্পের জন্য। আজমাতউল্লাহ ওমারজাইকে শূন্য রানেই আউট দিয়েছিলেন আম্পায়ার, তবে টিকে যান তিনি রিভিউ নিয়ে। এই দুজনই পরে দলকে নিয়ে যান জয়ের দিকে।
শুরুতে সময় নেন দুজনই। প্রথম ১৫ বলে ওমারজাইয়ের রান ছিল ১, শাহিদির ছিল ২১ বলে ৭। থিতু হয়ে দারুণ কিছু শটে দ্রুত রান বাড়ান ওমারজাই।
কাজ অবশ্য শেষ করতে পারেননি তিনি। তানজিমকে টানা তিনটি বাউন্ডারির পর আউট হয়ে যান আলগা শটে। তবে তার ৪৪ বলে ৪০ রানের ইনিংস কার্যত ফয়সালা করে দেয় ম্যাচের।
৪৬ বলে ৩৩ রানে অপরাজিত থেকে যান অধিনায়ক শাহিদি। মোহাম্মাদ নাবির ছক্কায় শেষ হয় ম্যাচ।
সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচ এই মাঠেই শনিবার।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ: ৪৮.৫ ওভারে ২২১ (সাইফ ২৬, তানজিম ১০, শান্ত ২, হৃদয় ৫৬, মিরাজ ৬০, জাকের ১০, সোহান ৭, তানজিম ১৭, হাসান ৫, তাসকিন ৪*, তানভির ১১; বাশির ৪-০-২৫-০, ওমারজাই ৯-০-৪০-৩, গাজানফার ৯.১-১-৫৫-২, খারোটে ১০-১-৩২-১, রাশিদ ১০-০-৩৮-৩, নাবি ৬-০-২৭-০)
আফগানিস্তান: ৪৭.১ ওভারে ২২৬/৫ (গুরবাজ ৫০, ইব্রাহিম ২৩, আটাল ৫, রেহমাত ৫০, শাহিদি ৩৩*, ওমারজাই ৪০, নাবি ১১*; তাসকিন ৮-০-৫০-০, হাসান ৮-০-৪০-০, তানভির ১০-০-৪২-১, তানজিম ৭-১-৩১-৩, মিরাজ ১০-১-৩২-১, সাইফ ৩.১-০-২৪-০, শান্ত ১-০-৪-০)।
ফল: আফগানিস্তান ৫ উইকেটে জয়ী।
সিরিজ: তিন ম্যাচ সিরিজে আফগানিস্তান ১-০তে এগিয়ে।
ম্যান অব দা ম্যাচ: আজমাতউল্লাহ ওমারজাই।