Published : 24 Apr 2026, 09:36 PM
অভিষেক টেস্টে ১৭১ রানের ইনিংস, এরপরও টেস্ট ক্যারিয়ার স্রেফ ১৬ ম্যাচের। হ্যামিশ রাদারফোর্ডের ক্যারিয়ারটা যেন অপূর্ণতার গল্প। বয়স এখনও মোটে ৩৬। কিন্তু ক্রিকেট ক্যারিয়ার অতীত হয়ে গেছে বেশ আগেই। তার বাবা কেন রাদারফোর্ড ১০ বছর খেলেছেন নিউ জিল্যান্ডের হয়ে। কিন্তু হ্যামিশ রাদারফোর্ডের ক্যারিয়ার দীর্ঘ হয়নি। অনেক অপ্রাপ্তিকে সঙ্গী করেই সব ধরনের ক্রিকেট থেকে অবসর নিয়ে ফেলেছেন স্রেফ ৩৪ বছর বয়সে। বাংলাদেশ-নিউ জিল্যান্ড সিরিজে এসেছেন তিনি ধারাভাষ্য দিতে। চট্টগ্রামে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে সাবেক এই ওপেনার ফিরে তাকালেন তার ক্যারিয়ারের নানা অধ্যায়ে, কথা বললেন নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেটের নানা দিক ও প্রাসঙ্গিক আরও অনেক কিছু নিয়ে।
ধারাভাষ্য দিতে এসেছেন, কিন্তু এই সিরিজে তো আপনি খেলতেও পারতেন! আপনার যে বয়স, এখনও খেলা চালিয়ে যাওয়ার কথা। কোথায় গড়বড় হলো? কেন ক্রিকেট ছাড়তে হলো?
হ্যামিশ রাদারফোর্ড: অনেক কিছু মিলিয়েই ছাড়তে হয়েছে। শরীরটা আর চলছিল না। আমার নিতম্বের অবস্থা খারাপ ছিল, বদলানো জরুরি ছিল। এখন আমার দুটি নিতম্বই নতুন। কিন্তু স্রেফ এটিই নয়, খেলা নিয়েও আমার পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, যথেষ্ট হয়েছে, আর পারছি না।
১৬ বছর ক্রিকেট খেলেছি আমি। একদিক থেকে ভাবলে, যথেষ্ট দিয়েছি খেলাটাকে। ওটাগোর হয়েও ১৬ বছর খেলেছি। মানে ১৬ বছর ধরে একই জায়গায় ছিলাম এবং একটা পর্যায়ে একঘেয়ে লাগছিল। আমার তখন স্রেফ দরকার ছিল সামনে তাকানো ও ভিন্ন কিছু করার।
নিউ জিল্যান্ডের হয়ে আবার খেলার স্বপ্নটাও ততদিনে মরে গিয়েছিল…।
মানে, খেলা চালিয়ে যাওয়ার কোনো তাড়নাই ছিল না আপনার…?
রাদারফোর্ড: একদমই না! বরং মনে হচ্ছিল, কেন খেলছি আমি! আমার পরিবারও একদম কাঁচা ছিল, শরীর আর নিতে পারছিল না। সবকিছুই তাই এক বিন্দুতে মিলে গিয়েছিল।
নিউ জিল্যান্ডে আমরা পারিশ্রমিক খারাপ পেতাম না। তবে এটাও সত্যি, জাতীয় দলে না খেললে ও বিদেশে কোনো চুক্তি না থাকলে, যথেষ্ট আয় হয় না। আমি এমন একটা পর্যায়ে চলে গিয়েছিলাম যে, ক্রিকেট পরবর্তী জীবন নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলাম এবং খেলা চালিয়ে যাওয়াই স্বার্থপর মনে হচ্ছিল।
বিদেশের কিছু টি-টোয়েন্টি লিগ এবং এই ধরনের টুর্নামেন্টে খেলতে পারলে ভালো হতো, কিন্তু কোনো এক কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। টেস্ট ক্রিকেটকে আমি অনেক গুরুত্ব দিই, সবসময় টেস্ট দলে ফিরতে চেয়েছি। সেটাও সম্ভব হচ্ছিল না।
লোকে বলবে, নিতেম্বর চোটের কারণে আমি অবসর নিয়েছি, যা কিছুটা সত্যি বটে, তবে মূল ব্যাপার হলো, খেলাটার প্রতি ভালোবাসা হারিয়ে ফেলেছিলাম।
অভিষেকে টেস্টে জিমি অ্যান্ডারসন, স্টুয়ার্ট ব্রডদের সামনে ১৭১ রানের স্ট্রোকসমৃদ্ধ ইনিংস খেলেছিলেন যিনি, তার ক্যারিয়ার শেষ ১৬ টেস্টেই। পেছন ফিরে তাকালে কেমন লাগে?
রাদারফোর্ড: একদম অল্প বয়সেই দলে সুযোগ পেয়েছিলাম। বয়স মনে হয় ২৩ ছিল… ঠিক জানি না। জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার আগে ঘরোয়া ক্রিকেটে পুরো এক বছরও খেলিনি। ১৯ বছর বয়সে ওটাগোর হয়ে খেলি এবং পরের কয়েক বছর দলে আসা-যাওয়ার মধ্যেই ছিলাম। যখন নিউ জিল্যান্ড দলে সুযোগ পেলাম, ঘরোয়া ক্রিকেটে তখনও খুব বেশি ম্যাচ খেলিনি।
হ্যাঁ, টেস্ট অভিষেকে ভালোই করেছিলাম। দলে সুযোগ পাওয়ার আগে বছর দেড়েক ধরে ভালো ফর্মে ছিলাম। ভালো ফর্মে থাকলেই সবসময় দলে সুযোগ মেলে না, কিন্তু সৌভাগ্যবশত আমি পেয়েছিলাম। খেলা ছিল আমার ঘরের মাঠে (ডানেডিন), কন্ডিশন চেনা ছিল। ভালো করে ফেলেছিলাম।
কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ক্রমাগত শিখে যেতে হয়। অভিষেক সিরিজের পর ইংল্যান্ড সফরে গেলাম, আগে কখনও ইংল্যান্ডে খেলিনি। পরের সফর বাংলাদেশে, উপমহাদেশেই আগে কখনও খেলিনি। খেলতে খেলতেই শিখতে হচ্ছিল। দলে জায়গা ধরে রাখার জন্য যতটা রান করতে হতো, তা করার জন্য নিজের খেলার ধরনে উন্নতি করতে পারিনি।
পারছিলেন না কেন? শুরুর ইনিংসের পর তো আত্মবিশ্বাস চূড়ায় থাকার কথা…
রাদারফোর্ড: পেছন ফিরে তাকালে এখন মনে হয়, আমি খুব দ্রুত অনেক বেশি উন্নতির চেষ্টা করছিলাম। উচিত ছিল দীর্ঘ সময় ধরে নিজের শক্তির জায়গাগুলোর ওপর মনোযোগ দেওয়া এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা কিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া। দ্রুত উন্নতি করতে গিয়ে উল্টো অনেক কিছু হারিয়েছি।
যাহোক, যতদিন খেলেছি, মজাই পেয়েছি। বছর তিনেক নিউ জিল্যান্ড দলে আসা-যাওয়ার মধ্যে ছিলাম। দারুণ কয়েকটি সফরে গিয়েছি। স্মৃতিগুলোই সঙ্গী।
আমার বয়স যখন ২৯, তখন আসলে নিজের খেলার চূড়ায় ছিলাম এবং খেলাটা ধরতে পেরেছিলাম। তখন প্রায়ই মনে হতো, এখন জাতীয় দলে সুযোগ পেলে দারুণ হবে। নির্বাচক ও কোচদের সঙ্গে কথাও বলেছিলাম যে, আর কী কী করলে আমানে সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তবে সুযোগটি আসেনি।
আমি অল্প বয়সেই দলে সুযোগ পেয়েছিলাম, যা দারুণ ব্যাপার। কিন্তু যদি এখন নিউ জিল্যান্ড দলের দিকে তাকান, দেখবেন অনেক ক্রিকেটার দেরিতে সুযোগ পেয়েছে এবং তারা ভালো করছে। আমারও মনে হয়েছিল, ঘরোয়া ক্রিকেটে ও কাউন্টি ক্রিকেটে যখন অনেক ভালা করছিলাম, তখন টেস্ট দলে নেওয়া হলে হয়তো বুঝতে পারতাম, আসলেই আমি কতটা ভালো। সেটি না জেনেই ক্যারিয়ারটা শেষ করতে হয়েছে।
কখনও কখনও এরকম হয়, অনেক কিছুই পক্ষে থাকে না। হয়তো অন্যরা ভালো খেলছে, দলটা থিতু, বাইরে কেউ ভালো করলেও সুযোগটা আসে না।
এসব বলেও আসলে লাভ নেই। আমি ভালো করতে পারিনি, পরে আর ফিরতে পারিনি, মানে আমি যথেষ্ট ভালো ছিলাম না। মুখে ‘ভালো’ বলে তো লাভ নেই, কাজে দেখাতে পারিনি।
২০-৩০ রানে বেশ কবার আউট হয়েছেন। শুরুর ইনিংসের মতো বড় ইনিংস আর খেলতে পারেননি। থিতু হয়ে বারবার আউট হওয়ার কারণ কী ছিল? মনোযোগে ঘাটতি? টেকনিক্যাল? অন্য কিছু!
রাদারফোর্ড: জানি না। এটা সম্ভবত আমার পুরো ক্যারিয়ারেরই একটা উপযুক্ত প্রতিফলন। শুরু করতাম খুব সহজে, কিছুই মনে হতো না। হয়তো বেশ আক্রমণাত্মক ছিলাম বলেই, সবসময় স্কোরিং শট খেলতে পছন্দ করতাম। কিছু রান করার পরে কীভাবে কীভাবে যেন আউট হয়ে যেতাম।
ক্যারিয়ারের প্রথমভাগে বোলারদের ওপর বেশি চড়াও হয়ে খেলতাম। পরের দিকে ঘরোয়া ক্রিকেটে ও কাউন্টিতে নিজের খেলা বদলে ফেলেছিলাম। তখনই ধারাবাহিকতা খুঁজে পেয়েছিলাম, নিজের একটা গেম প্ল্যান তৈরি করতে পেরেছিলাম, যা লম্বা ইনিংস খেলার সহায়ক ছিল। অনেক রানও করেছি তখন। কিন্তু আমি নিজেকে পুরনো আমাকে মিস করতাম তখন, সেই দাপুটে আমাকে খুঁজতাম। বড় রান করার স্বার্থে বদলটা করতে হয়েছিল।
২০-৩০ রানে বারবার আউট হওয়ার পেছনে ফিটনেসেরও ভূমিকা থাকতে পারে। তখন সম্ভবত খুব একটা ফিট ছিলাম না। ফিটনেসের অনেক কিছুই জানতাম না। আগেই বলেছি, যখন আমাকে দলে নেওয়া হয়, তখন আমি একদমই অপরিণত ছিলাম। মাত্র এক বছরের চুক্তি হয়েছিল আমার সঙ্গে। দলের আশেপাশে থাকলেও, তখনও পূর্ণকালীন ক্রিকেটার ছিলাম না। সব মিলিয়ে সম্ভবত পুরোপুরি তৈরি ছিলাম না।
আপনার ক্যারিয়ারকে বলা যায় আপনার বাবার ক্যারিয়ারের পুরো উল্টো। আপনি বড় সেঞ্চুরি দিয়ে শুরু করেছেন, আপনার বাবার শুরুটা ছিল দু্ই ইনিংসেই শূন্য দিয়ে, প্রথম সাত ইনিংসে তার রান ছিল ১২।
পরে তিনি খেলেছেন ৫৬ টেস্ট ও ১২১ ওয়ানডে। আপনার অমন শুরুর পর বাবার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?
রাদারফোর্ড: ভালো প্রশ্ন… কেমন ছিল তার প্রতিক্রিয়া… যতটা মনে পড়ে, খুব উচ্ছ্বসিত ছিলেন না। অবশ্যই খুশি ছিলেন, পিঠ চাপড়ে দেওয়া, এসব ছিল। তবে তিনি সম্ভবত মিডিয়ায় এরকম বলেছিলেন যে, ‘সেঞ্চুরির বদলে ৩০-৩৫ রান দিয়ে শুরু হলে ভালো হতো।’
কোন ভাবনা থেকে এমনটি বলেছিলেন, সেটিও জানি। তিনি জানতেন যে, শুরুতেই বড় স্কোর হলে আত্মতু্ষ্টি চলে আসতে পারে। তাছাড়া প্রত্যাশার চাপও তৈরি জয়। তিনি চেয়েছিলেন, আমি যেন কষ্ট করে শিখি, ঠেকে শিখি।
অন্যদের কথা জানি না, নিজের প্রতি প্রবল প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল আমার। সেজন্যই প্রচণ্ড বিরক্ত লাগত নিজের ওপর। আমি জানতাম যে, কাজটা আমি পারি। সমস্যাও আমি জানি। কিন্তু মাঠে গিয়ে পারছি না। নিজের ওপর মেজাজ খারাপ হতো। জানতাম যে এই লেভেলে খেলার জন্য যথেষ্ট ভালো আমি। কিন্তু মাঠে গিয়ে তা দেখাতে না পারলে তো মূল্য নেই। হয়তো বাবাই ঠিক ছিলেন, ৩০-৩৫ রান দিয়ে শুরু হলেই ভালো হতো!
বেড়ে ওঠার সময় বাবার প্রভাব কতটা ছিল আপনার ওপর?
রাদারফোর্ড: খুব বেশি না। সাধারণত ক্রিকেটারের ছেলে ক্রিকেটার হওয়া মানে সেখানে বাবার বড় ভূমিকা থাকে। আমাদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি ছিল, তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় থাকতেন, এরপর সিঙ্গাপুরে থিতু হয়েছিলেন। নিউ জিল্যান্ডে খুব একটা থাকতেন না, এলেও লম্বা সময় থাকতেন না।
তার সঙ্গে ফোনেই যোগাযোগ হতো বেশি। বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ নিতাম। তবে হাতেকলমে শেখানো বা কোচিং করানো বলতে যা বোঝায়, তার কাছ থেকে তা তেমন একটা পাইনি।
ছেলেবেলায় বাবার সঙ্গে ড্রেসিং রুমে যাওয়া, বড় তারকাদের দেখার কোনো স্মৃতি মনে পড়ে?
রাদারফোর্ড: নিউ জিল্যান্ডের ড্রেসিং রুমে যাওয়ার সেরকম স্মৃতি নেই। তবে দক্ষিণ আফ্রিকায় গটেংয়ের হয়ে তিনি যখন খেলতেন, আমি তখন ছোট, আমার ভাইয়ের সঙ্গে ড্রেসিংরুমে যেতাম তখন। মাঠে, নেটে, গান অ্যান্ড মুর ফ্যাক্টরিতে যেতাম, এই ধরনের দারুণ সব জায়গায়। তাই সেই স্মৃতিগুলো আমার খুব ভালো করে মনে আছে। তখনকার দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেট বেশ শক্তিশালী, বেশ বড় ছিল, জানেন তো... ? যেহেতু তিনি গটেংয়ের হয়ে খেলতেন, শুক্রবার রাতে বুলরিংয়ের সব টিকেট বিক্রি হয়ে যেত। এই স্মৃতিগুলো মনে পড়ে। যতদূর মনে পড়ে, তার কারণে এবং তারপর অবশ্যই আমার নিজের খেলার কারণে, ক্রিকেট আমার জীবনের একটা বড় অংশ হয়ে গেছে।
আপনি ও টম ল্যাথাম একসঙ্গেই টেস্ট স্কোয়াডে সুযোগ পেয়েছিলেন। দুজনই সাবেক ক্রিকেটারের ছেলে। আপনার অভিষেকই আগে হয়েছিল, ল্যাথাম তো আরও বেশ পরে টেস্ট ক্যাপ পেয়েছিলেন। সেই ল্যাথাম এখন ৯১ টেস্ট খেলে ফেলেছেন, ১১ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক রান, দলের অধিনায়ক…
রাদারফোর্ড: ক্যারিয়ারজুড়ে নানা সময়েই পরস্পরকে কাছ থেকে দেখেছি আমরা। হ্যাঁ, লাল বলের ক্রিকেটে সে বেশ ধারাবাহিক এবং প্রভাববিস্তারি ক্রিকেটার হয়ে উঠেছে। সাদা বলেও অনেক ম্যাচ খেলেছে। তার একটা সুবিধা ছিল, সে কিপার। এই কারণে দলে সুযোগ পাওয়া বা জায়গা ধরে রাখায় সুবিধা হয়েছে তার। ব্যাট হাতেও ভালো করেছে। প্রাপ্যটাই পাচ্ছে সে।
সে সবসময়ই ভালো নেতা ছিল। শুরু থেকেই তাকে নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো এবং এটাও তাকে সহায়তা করেছে ক্যারিয়ার থিতু করতে।
২০১৩ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন, এই চট্টগ্রামে টেস্ট খেলেছিলেন। ওই সফরের কতটুকু মনে পড়ে?
রাদারফোর্ড: খুব বেশি না। মনে রাখার মতো তেমন কিছু তো করতে পারিনি। যেটা বলেছি আগেই, উপমহাদেশে খেলার কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না আমার। সেবারের হোটেল অতটা ভালো ছিল না। খাবারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলাম না। এরকম ছোটখাটো বিষয়গুলো…. একটা ‘কালচারাল শক’ ছিল আমার জন্য।
ক্রিকেট মাঠেও বড় ধাক্কা খেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, এখানে বল টার্ন করবে। কিন্তু দেখলাম যে, বল এখানে স্পিন খুব একটা করে না, বরং সোজা আসে এবং স্কিড করে। সবাই আমাকে ইনসাইডে পরাস্ত করছিল। আমার কোনো ধারণাই ছিল না, কীভাবে সামলাতে হয় এসব ডেলিভারি। এজন্য স্পিনের সামনে স্রেফ আগ্রাসী হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই টিকতে পারিনি বেশিক্ষণ (দুই ইনিংসে করেছিলেন ৩৪ ও ৩২)।
আর ছিল গরম। অক্টোবর মাস ছিল যদিও, কিন্তু গরমে আমি স্রেফ পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম। মনে আছে, ১০ মিনিট ব্যাটিং করেই গ্লাভস বদলাতে হচ্ছিল ঘামের কারণে।

বাংলাদেশের একজন সেই ম্যাচে হ্যাটট্রিক ও সেঞ্চুরি করেছিলেন, টেস্ট ইতিহাসের যা একমাত্র নজির!
রাদারফোর্ড: সোহাগ গাজি না তার নাম? দারুণ অর্জন। তবে খুবই নিষ্প্রাণ উইকেট ছিল। ম্যাচ তো ড্র হয়েছিল। ট্রেন্ট বোল্টও ফিফটি করেছিল (১১ নম্বরে নেমে ৫২)।
তবে ওই উইকেটে স্পিন বোলিং সামলানোর মতো খেলা আমার আসলে সেভাবে জানা ছিল না। আর গরম তো ছিলই। আধ ঘণ্টা ক্রিজে থেকেই আমার ক্র্যাম্প করা শুরু করেছিল।
আপনার পুরো টেস্ট ক্যারিয়ারই ব্রেন্ডন ম্যাককালামের অধিনায়কত্বে। বাইরে থেকে আমরা তো দেখেছি, তিনি কেমন অধিনায়ক ছিলেন। দলের ভেতরে আপনার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল? তার বিশেষত্ব কি ছিল? ড্রেসিং রুমে কি অনেক কথা বলতেন?
রাদারফোর্ড: কথা বলার দরকার হলে কথা বলতেন... প্রয়োজনের সময় বলতেন। এমনিতে কাজ দিয়েই নেতৃত্ব দিতেন। ‘আমার ওপর চেপে বসো, আমার সঙ্গে চলো’, অনেকটা এই ধরনের অধিনায়ক ছিলেন তিনি। নিজে করে দেখাতেন এবং অন্যদের কাছ থেকে তেমন কিছু্ প্রত্যাশা করতেন।
ব্রেন্ডন, মাইক হেসন (তখনকার কোচ) ও মাইক স্যান্ডল (পারফরম্যান্স ম্যানেজার) মিলে তখন নিউ জিল্যান্ড দলের সংস্কৃতি বদল করার চেষ্টা করছিলেন। শুরুর দিকে সেটার অংশ ছিলাম আমি, দেখতে পাচ্ছিলাম তারা আসলে কী করতে চাচ্ছেন। তারা ঠিকই সফল হয়েছিলেন। ২০১৫ বিশ্বকাপে আমরা দেখেছি এবং পরের বছরগুলোয় দেখেছি। ব্রেন্ডন, মাইকদের বয়ে আনা সংস্কৃতিই নিউ জিল্যান্ডকে পরের বছরগুলোয় বিশ্ব ক্রিকেটে দারুণ ধারাবাহিক করে তুলেছে।
তখন কি ভেবেছিলেন, ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ভবিষ্যতে কোচ হতে পারেন?
রাদারফোর্ড: সত্যি বলতে, তিনি কোচিং বেছে নেওয়ায় একটু অবাকই হয়েছিলাম। তার সঙ্গে কোচিংটা যায় না বলেই মনে হয়েছিল আমার।
নেতা হিসেবে তিনি দারুণ, মানুষকে সামলাতে পারেন খুব ভালোভাবে। কোচ হিসেবেও… হয়তো একটু রূঢ় শোনাতে পারে… আসলে তিনি যতটা না কোচ, এর চেয়ে বেশি বরং একজন ম্যানেজার। ব্যাটিং নিয়ে তার নিজস্ব ধারণা অবশ্যই আছে, কিপিং নিয়েও আছে। কিন্তু আমার মতে, কোচ হিসেবে তিনি মূলত সবাইকে সামলানোর কাজ করেন, সবার থেকে সেরাটা বের করে আনেন।
তিনি ম্যান-ম্যানেজমেন্টে খুব ভালো; একজন মানুষের কী প্রয়োজন, তা জেনে তার কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনার চেষ্টা করেন এবং এটাই তার কাজের ধরণ। ইংল্যান্ডের হয়তো এটাই দরকার ছিল। তাদের তো অর্থের অভাব নেই, সব বিভাগেই ভালো ভালো স্পেশালিস্ট কোচ আছে। ব্রেন্ডনকে তার শক্তির জায়গা ভেবেই হয়তো তারা নিয়েছে।
‘বাজবল’ দিয়েও তো তিনি তোলপাড় ফেলে দিয়েছেন!
রাদারফোর্ড: ‘বাজবল’ নিয়ে আমার মনে হয়, বড্ড বেশিই চর্চা হয়। এটা স্রেফ খেলার একটা ধরন, তিনি নিজেই তো আরও অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করতেন। ক্যারিয়ারের শেষ টেস্টেও সম্ভবত দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়েছেন।
বাজবলের ব্যাপারটি হলো, তিনি মানুষের মনকে উন্মুক্ত করতে এবং তাদেরকে স্বাধীনভাবে খেলতে দিতে চাইছেন। ক্রিকেট খেলাটা কঠিন। কেউ যদি মানসিকভাবে নিজেকে শেকলে আটকে রাখে…সেটা যেকোনো কিছু থেকেই আসতে পারে, মিডিয়া, বাড়ির লোকজন, ভক্ত-সমর্থক, যা-ই হোক না কেন… উনি এই সবকিছু দূর করার চেষ্টা করেন।
অবশ্যই এটা দারুণ ব্যাপার। কিন্তু মাঝেমধ্যে এত বাড়াবাড়ি করা হয়! খেলাটার বদলে শুধু খেলার ধরন নিয়েই কথা বলতে থাকে, এটা দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে গেছি।

রস টেইলর ও কেন উইলিয়ামসন, দুজনের সঙ্গেই কিছুদিন খেলেছেন। দীর্ঘসময় তাদের খেলা দেখেছেন। এগিয়ে রাখবেন কাকে?
রাদারফোর্ড: কেন উইলিয়ামসন, অবশ্যই। ১৫-১৬ বছর বয়স থেকেই কেনের সঙ্গে খেলছি। প্রত্যেকটি বয়সভিত্তিক গ্রুপে তাকে খেলতে দেখেছি এবং প্রতিটিতেই সে সেঞ্চুরি করেছে। সে নিঃসন্দেহে অসাধারণ এবং নিউ জিল্যান্ডের সর্বকালের সেরাদের একজন।
স্যার রিচার্ডকে (হ্যাডলি) নিয়ে লোকে যুগ যুগ ধরে কথা বলবে, ক্রোয়ি ছিল (মার্টিন ক্রো), নানা প্রজন্মের নানাজন। কিন্তু কেনের স্থির থাকার ক্ষমতা, পরিস্থিতি বুঝে খেলার এবং নিজের খেলার ধরনে পরিবর্তন আনার দক্ষতা অসাধারণ। এই গুণটি সে অন্যদের মধ্যেও সঞ্চারিত করেছে এবং দলের মধ্যে তা স্পষ্ট দেখা যায়। তার রান, সেঞ্চুরি, এসবের চেয়েও বড় প্রভাব, তার সত্যিকারের লেগ্যাসি এটিই। ছেলেরা যেভাবে খেলে, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে যেভাবে সাড়া দেয়, সেটি দেখলেই বোঝা যায়, এর পেছনে কেনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।
৩৪ বছর বয়সে অবসর নেওয়ার পর জীবন এখন কেমন?
রাদারফোর্ড: ভালো, বেশ ভালো। খুবই শান্ত ও স্থির। কোনো চাপ নেই, টেনশন নেই। আমার পরিবারটা বেশ ব্যস্ত। পরিবার নিয়ে ভালো আছি। এখানে ধারাভাষ্য দিতে এসেছি, ক্রিকেট নিয়ে কথা বলছি, ভালোই লাগছে।
ধারাভাষ্যকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ইচ্ছে আছে?
রাদারফোর্ড: জানি না, চেষ্টা করছি বাড়তি কিছু করার। যেটাই করি, ভালোভাবে করার চেষ্টা করি। ভবিষ্যতে পূর্ণকালীন পেশায় পরিণত হবে কিনা, জানি না। সুযোগ পেলে হয়তো গ্রহণ করব এবং ভালোভাবে করার চেষ্টা করব।
ক্রিকেট আপনাকে কি শিখিয়েছে?
রাদারফোর্ড: ক্রিকেট থেকে…. ক্রিকেট মানে আমার কাছে সহনশীলতা। মানে যা-ই ঘটুক না কেন, নিজেকে সামলে নেওয়ার ক্ষমতা। আমার মনে হয়, চাপপূর্ণ পরিস্থিতি সামলানো, চাপের মধ্যে দ্রুত ও পরিষ্কারভাবে চিন্তা করতে পারা।
আমি এখন একজন প্রজেক্ট ম্যানেজার এবং সেখানে ক্রিকেটের শিক্ষা আমার অনেক কাজে লাগে।। একটা হাই-স্কোরিং টি-টোয়েন্টির মতো আর কিছুই নেই, আপনি একজন অধিনায়ক, আপনাকে প্রতি মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে হয়… এর কোনো বিকল্প নেই। এটা অনেকটা ক্রিকেটের হাই-পারফরম্যান্স ক্ষেত্রের মতো, এটা আপনাকে এমন অনেক শিক্ষা দেয় যা জীবনে প্রয়োগ করতে পারেন।