Published : 22 Nov 2025, 08:21 PM
টেস্ট ক্রিকেটের প্রায় দেড়শ বছরের ইতিহাসে ‘রিটায়ার্ড আউট’ আছে স্রেফ দুটি। ২০০১ সালে বাংলাদেশের বিপক্ষেই কলম্বোতে ২০১ রান করে ক্রিজ ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন মারভান আতপাত্তু, ১৫০ রান করে মাহেলা জায়াওয়ার্দেনে। প্রচলিত আছে, রান করতে করতে বিরক্ত হয়েই তিনি স্বেচ্ছায় ব্যাটিং ছেড়ে দিয়েছিলেন। টেস্ট ক্রিকেটের শুরুর বছরগুলোয় বাংলাদেশের সঙ্গে রানের পাহাড় গড়েছে প্রায় সব প্রতিপক্ষ। ব্যাটসম্যানরা সেঞ্চুরি করেছে, বড় ইনিংস খেলেছে হেসেখেলে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা কেন ততটা পারল না আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে?
একেবারে কেউ পারেনি, তা নয়। দুই টেস্টের তিন ইনিংসে সেঞ্চুরি হয়েছে চারটি। তবে তাদের মধ্যে দেড়শ ছাড়ানো ইনিংস কেবল একটিই। সিলেটে ১৭১ রানের ইনিংস খেলেছিলেন মাহমুদুল হাসান জয়। এছাড়া অন্য তিন সেঞ্চুরিতে ১৩০ রানও ছুঁতে পারেননি কেউ।
সিলেটে ৮০ ছুঁয়ে আউট হয়েছেন সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক, লিটন দাস ফেরেন ৬০ রানে। মিরপুরে প্রথম ইনিংসে থিতু হয়ে ফিফটির আগে আউট হন সাদমান ও জয়, মুমিনুল ফেরেন ৬৩ রানে, ৪৭ রানে মিরাজ। দ্বিতীয় ইনিংসে ৬০ রানে আউট হন জয়, ৭৮ রানে সাদমান। মুমিনুল শতরানের সম্ভাবনা জাগিয়েও আউট হন ৮৭ রানে।
অথচ বাংলাদেশ যখন ছিল আয়ারল্যান্ডের পর্যায়ে, প্রতিপক্ষ রান তুলেছে নির্দয়ভাবে। ব্যাটসম্যানরা খেলেছেন বড় বড় ইনিংস। বাংলাদেশ সেই সাজা দিতে পারছে না প্রতিপক্ষ বোলারদের।
ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল অবশ্য এখানে ঢাল হতে চাইলেন ব্যাটসম্যানদের। তিনি নিজে যখন খেলেছেন, দিনের পর দিন দেখেছেন প্রতিপক্ষকে রানের স্রোত বইয়ে দিতে। বিশ্লেষক হিসেবেও নানা সময়ে তিনি বলেছেন ব্যাটসম্যানদের বড় ইনিংস খেলার ঘাটতির কথা। এখন তিনিই টিম ম্যানেজমেন্টের অংশ। ব্যাটসম্যানদের দায় না দিয়ে তিনি বোঝাতে চাইলেন আড়ালের কারণ।
“যে তিনটা ইনিংস আমি দেখেছি, আমার কাছে মনে হয় যে… আমাদের একটা বড় সমস্যা, খেলাটা হয় তিন মাস, চার মাস পরপর। ওই জায়গাটাতে আসলে ক্রিকেটারদের মানিয়ে নেওয়াটাও একটু মুশকিল হয়ে যায়। গত তিন বছর ধরে আমরা প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ডিউক বল ব্যবহার করি। ওই জায়গায় আপনি দেখেছেন যে একটা মুমিনুল ৩৯০ রান করেছে কোনো সেঞ্চুরি ছাড়া। ডিউক বলে প্রতিটি বলই চ্যালেঞ্জিং হয়।”
“ঘরোয়া ক্রিকেটে যদি আপনি বড় বড় ইনিংস খেলেন, যখন প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ২০০-৩০০ রান করবেন, তখন আশা করতে পারেন যে একটা টেস্ট ম্যাচে এসে ২০০-৩০০ করবেন। জয় যেমন ১৭০ করেছে, এটা তার ক্যারিয়ার বেস্ট ইনিংস। আগে ক্যারিয়ার সেরা ছিল ১৩৯। এই জিনিসগুলো আসলে রাতারাতি এসেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বড় ইনিংস খেলার আশা করাটা ঠিক হবে না। এগুলো ঘরোয়া ক্রিকেট থেকে আসতে হবে। তখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে করতে পারবেন।”

আশরাফুল মূলত বোঝাতে চাইছিলেন ঘরোয়া ক্রিকেটে বড় ইনিংস খেলার অভ্যাসের কথা। তবে টেস্ট দলের ক্রিকেটারদের বেশির ভাগই তো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিয়মিত খেলেন না।
ঘরোয়া ক্রিকেটের যুক্তিটা অবশ্য এমনিতেও খুব বেশি খাটে না। টেস্ট ক্রিকেটেও তো অভিজ্ঞতা কম নেই তাদের। মুশফিকের এটি শততম টেস্ট, মুমিনুলের ৭৫তম। মিরাজ এই টেস্টের আগে খেলেছেন ৫৫ টেস্ট, লিটন ৫১টি। অধিনায়ক শান্ত খেলছেন তার ৩৯তম টেস্ট। এমনকি সাদমান (২৬তম) ও জয়ের (২০তম) অভিজ্ঞতাও তো কম নয়।
ব্যাটসম্যানদের সেই অভিজ্ঞতার দিকটি মনে করিয়ে দেওয়া হলো আশরাফুলকে। সাবেক অধিনায়ক বললেন, ব্যাটসম্যানদের দিকে আঙুল না তুলে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত।
“তারা কিন্তু উইকেট থ্রো করছে না। আপনি যদি দেখেন, যে এই দুইটা টেস্ট ম্যাচে তিনটা ইনিংসে আমাদের উইকেট কিন্তু আমরা সব ভালো বলে আউট হয়েছি। ভালো বলে যখন আউট হয়, ওই সময় আসলে অভিযোগ না করে ইতিবাচক কথা বলাই ভালো।”
“আমাদের থেকে কিন্তু তাদেরই মন বেশি খারাপ। তারা যদি ১০০-২০০ করত, তাদেরই নাম বেশি হতো। ঠিক না? অবশ্যই আমি আশা করি যে আমরা ইতিবাচক চিন্তা করব এবং বড় বড় ইনিংস খেলবে সামনে।”
আশরাফুল যদিও দাবি করেছেন, ভালো বলে আউট হয়েছে ব্যাটসম্যানরা, আদতে ‘আনপ্লেয়েবল’ ডেলিভারিতে আউট হননি তারা কেউই। ‘সফট ডিসমিসাল’ ছিল বেশ কিছু, এমনকি মুমিনুল ৮৭ রানে শনিবার আউট হয়েছেন একদমই আলগা এক শটে।
আশরাফুল শোনালেন আশার কথাও। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বর্তমান চক্রে ব্যাটসম্যানদের বড় লক্ষ্য আছে বলেও জানালেন তিনি।
“আমি বিশ্বাস করি যে আমাদের ক্রিকেটাররা যেভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং খেলছে, সামনের যত টেস্ট ম্যাচ দেখবেন, বড় বড় ইনিংস দেখতে পারবেন আমাদের ক্রিকেটারদের থেকে।”
“আপনি যেটা বললেন যে ওরা, ৫০ করে বা ৭০ করে আউট হচ্ছে, এটা নিয়ে তারা চিন্তা করছেন, কীভাবে এই জায়গা থেকে বড় রান করা যায়। তারাও চিন্তা করছেন এবং আশা করব যে … ২০২৭ পর্যন্ত প্রায় ১৮টা টেস্ট ম্যাচ আছে, ওই ম্যাচগুলোতে তাদের একটা লক্ষ্য ঠিক করা আছে, ওইভাবেই আসলে তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং খেলছে।”