Published : 25 Apr 2026, 08:22 AM
সেই ছেলেবেলা থেকেই মুহাম্মাদ আব্বাসের জগত ক্রিকেটময়। বাবা আজহার আব্বাস ছিলেন পেস বোলার, খেলেছেন ৪৫টি প্রথম শ্রেণির ও ২২টি লিস্ট ‘এ’ ম্যাচ। পাকিস্তানে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ছেড়ে পরিবার নিয়ে পাড়ি জমান তিনি নিউ জিল্যান্ডে। সেখানেই ছেলেকে গড়ে তুলেছেন তিলে তিলে। তার ছেলে এখন নিউ জিল্যান্ডের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় তরুণ ক্রিকেটারদের একজন। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে ঝড় তুলে আন্তর্জাতিক অভিষেকও রাঙিয়েছেন গত বছর, তার ২৬ বলের ফিফটি ওয়ানডে অভিষেকে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড। তবে তার ভাবনাজুড়ে কেবলই টেস্ট ক্রিকেট।
গত বছর নিউ জিল্যান্ড ‘এ’ দলের হয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন আব্বাস, এবার এসেছেন জাতীয় দলের হয়ে। চট্টগ্রামে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ২২ বছর বয়সী এই অলরাউন্ডার শোনালেন তার বেড়ে ওঠার গল্প, বাবার অবদান, বাবার অপূর্ণ স্বপ্নকে পূর্ণতা দেওয়ার আশা বুকে পুষে ছুটে চলা এবং ভবিষ্যৎ ভাবনাসহ আরও অনেক কিছু।

ওয়ানডে সিরিজটা তো খুব ভালো গেল না। কতটুকু শিখতে পারলেন?
মুহাম্মাদ আব্বাস: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরতে পারলাম, এটিই ভালা ব্যাপার। বেশ অনেক দিন বাইরে ছিলাম (১ বছর)। বিশ্বের এই প্রান্তে খেলতে এলে সবসময়ই অনেক কিছু শেখার আছে। শ্রীলঙ্কা থেকে এখানে এসেছি (নিউ জিল্যান্ড ‘এ’ দলের হয়ে), উইকেট কিছুটা একইরকম মনে হয়েছে। কাজেই কন্ডিশন ও উইকেট সম্পর্কে কিছুটা ধারণা ছিল।
শ্রীলঙ্কায় সেঞ্চুরি করে এলেও এখানে অবশ্যই প্রত্যাশিত পারফরম্যান্স দেখাতে পারিনি। তবে অভিজ্ঞতা প্রচুর হয়েছে, অনেক শিখেছি এবং আশা করি, অভিজ্ঞতাগুলো আমাকে সমৃদ্ধ করবে ও ভবিষ্যতে কাজে লাগবে।

আপনার মতো তরুণ একজনের জন্য উইকেটও তো বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল!
আব্বাস: হ্যাঁ, তা কিছুটা ছিল। কিন্তু উইকেট যেটাই দেওয়া হয়েছে, সেখানেই খেলতে হবে। কোনো অজুহাত নেই। আমাদের কয়েকজন তো সত্যিই খুব ভালো খেলেছে এবং যারা ভালো খেলেছে, তাদের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার আছে।
আমার ঘাটতির জায়গা ক্রিকেটের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, যা করতে চেয়েছি, ঠিকভাবে মাঠে প্রয়োগের করতে পারিনি। তবে পুরো প্রক্রিয়া বা আগের বিষয়গুলোতে কোনো ভুল ছিল না।
শ্রীলঙ্কায় সেঞ্চুরি করে এলেন ‘এ’ দলের হয়ে, গত বছর ‘এ’ দলের হয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এই সফরগুলো কতটা সহায়ক হচ্ছে নিজেকে গড়ে তুলতে?
আব্বাস: খুবই গুরুত্বপূর্ণ এগুলো। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাদের বিপক্ষে ভবিষ্যতে খেলব বা এখন খেলছি, তাদের অনেকের বিপক্ষে আগেই খেলার সুযোগ পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, নতুন নতুন কন্ডিশন, আবহাওয়ায় খেলা যায়। এখানে যেমন এই গরমে খেলার অভিজ্ঞতা হচ্ছে। প্রথমবার যখন এখানে খেলেছিলাম, আমার মনে হয়েছিল, কোনোভাবেই এই কন্ডিশনে খেলতে পারব না। কিন্তু তখন খেলেই বুঝতে পেরেছি যে, এই ধরনের পরিস্থিতির জন্য নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করতে হয়। ‘এ’ দলের সফরগুলো এসব কারণেই খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার অভিজ্ঞতায় ‘এ’ দল থেকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ব্যবধান কতটা বেশি?
আব্বাস: চাপের দিক থেকে ব্যবধান অনেক। টিভিতে খেলা দেখাচ্ছে, লোকের আগ্রহ, মনোযোগ, প্রত্যাশা, সবকিছু মিলিয়েই চাপ অনেক। তবে ক্রিকেটীয় দিক থেকে, পার্থক্যটা বেশির ভাগ সময়ই খুব বেশি নয়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরুটা আপনার দারুণ হয়েছে। অভিষেক ওয়ানডেতে দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড গড়েছেন। সেই সময় কি রেকর্ডের কথা জানতেন?
আব্বাস: শুরুতে জানতাম না। কোনো ধারণাই ছিল না। ম্যাচের পর জানতে পেরেছিলাম, মিডিয়া ম্যানেজার বলেছিল।
জানার পর কেমন লাগছিল?
আব্বাস: খুবই স্পেশাল ব্যাপার ছিল, ভাবতেও পারিনি এমন কিছু…। ওই মুহূর্তে আসলে ঠিকভাবে বুঝেও উঠতে পারছিলাম না। কিছুদিন যাওয়ার পর পেছন ফিরে তাকিয়ে আরও ভালোভাবে বুঝতে পেরেছি, কতটা স্পেশাল ব্যাপার ছিল। ইনিংসটি ছিল পাকিস্তানের বিপক্ষে, আমার জন্মভূমি, সেটিও আলাদা মাত্রা যোগ করেছিল।

আপনার বাবা কি বলেছিলেন তখন?
আব্বাস: খুব বেশি কিছু নয়। তবে অবশ্যই অনেক খুশি হয়েছিলেন তিনি। গোটা সপ্তাহটিই যেন সিনেমার মতো, দারুণ ব্যাপার ছিল…।
আপনার ক্যারিয়ারে বাবার প্রভাব তো অনেক? বেশ কিছু লেখা আছে সেটি নিয়ে…
আব্বাস: আমার সবটুকুই তার জন্য। তিনি না থাকলে আজ আমি এখানে থাকতে পারতাম না। এখনও কিছুই করিনি আমি, তব যতটুকুই করেছি, জাতীয় দলে খেলছি, আজকের এই অবস্থানে আসতে তিনিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
প্রথম যেদিন হাঁটতে শিখেছি, সেদিনই বাবা আমার হাতে ব্যাট ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই তার সঙ্গে টেনিস বলে খেলার স্মৃতি মনে পড়ে। বাড়িতে হোক বা মাঠে, কোথাও ঘুরতে গিয়ে, একটু ফাঁকা জায়গা পেলেই বাবা আমাকে নিয়ে ক্রিকেট খেলতে শুরু করতেন।
অনেক আগে থেকেই তিনি এটা কল্পনা করতেন। বিভিন্ন ধাপে ধাপে তিনি সবসময়ই বলেছেন, আমি পরের পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত। আমি নিজে আমার মধ্যে যা দেখিনি, তিনি তা দেখতে পেয়েছেন।
সমস্ত কৃতিত্বই তার। তিনি না থাকলে হয়তো ক্রিকেটারই হতাম না!
আরেকটু পেছনে যাওয়া যাক। আপনার জন্ম তো লাহোরে। নিউ জিল্যান্ডে গেলেন কখন?
আব্বাস: আবার বয়স যখন এক বছরেরও কম। বাবা পাকিস্তানে খেলার পাশাপাশি ইংল্যান্ডেও ক্লাব ক্রিকেট খেলতে যেতেন। সেখানেই রিচার্ড পেট্রির (নিউ জিল্যান্ডের সাবেক অলরাউন্ডার) সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। পেট্রি বাবাকে বলেন নিউ জিল্যান্ডে চলে যেতে।
পাকিস্তানে ক্যারিয়ার নিয়ে অনিশ্চয়তায় বাবা নিউ জিল্যান্ডে পাড়ি জমান। প্রথমে ওয়েলিংটনের একটি ক্লাবে খেলতেন। পরে অকল্যান্ডে চলে যাই আমরা, সেখানে খেলতেন তিনি। কিছুদিন কোচ কাম ক্রিকেটার হিসেবেও খেলেছেন পরে। খেলা ছাড়ার পর পুরোপুরি ক্রিকেট কোচ হয়ে যান।
বাবাই ছেলেবেলা থেকে হাতে ধরে সবকিছু শিখিয়েছেন আমাকে। অকল্যান্ডে ইডেন রসকিল ক্লাবে যেতাম আমরা। ওটাই তখন স্থানীয় ক্লাব ছিল এবং সেখানে বাবার সঙ্গে অগণিত ঘন্টা কাটিয়েছি।
পরে কিংস কলেজে পড়ার সময় তো কোচ হিসেবে পেয়েছিলেন নিউ জিল্যান্ডের সাবেক অফ স্পিনার দিপাক প্যাটেলকে?
আব্বাস: হ্যাঁ, কিংস কলেজে প্রথম একাদশের কোচ ছিলেন তিনি। দুর্দান্ত এক কোচ এবং আমার ক্যারিয়ারে তার ভূমিকাও বিশাল।
তখন তো বোলিংয়েই বেশি ভালো ছিলেন?
আব্বাস: তা জানি না। তবে বাবার কারণে বোলিংয়ে আগ্রহ ছিল। স্কুলে, পরে ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেটে বোলিং ওপেন করতাম নিয়মিতই।
স্কুলে কিন্তু আমি ফুটবলও খেলতাম। তবে তখনও জানতাম, ভবিষ্যতে ক্রিকেটকেই বেছে নেব। নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেটের ট্যালেন্ট প্রোগ্রামে জায়গা পাওয়ার পর আর ফুটবল সেভাবে খেলিনি।
আপনার বাবা একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, স্কুলে ও বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে আপনি এত বেশি সেঞ্চুরি করেছেন, এমন কিছু নাকি আগে কেউ কখনও শোনেওনি!
আব্বাস: আমার প্রথম সেঞ্চুরি যতদূর মনে পড়ে, ১১ বছর বয়সে। ১৩-১৪ বছর বয়সের মধ্যেই অনেক সেঞ্চুরি করেছি। সঠিক সংখ্যা আসলে বলতে পারব না। অন্য কেউ করেছে কি না, সেসবও আমার পক্ষে বলা কঠিন।
তবে আমি বা বাবা, সেঞ্চুরিগুলোকে বড় করে দেখিনি। বৃহত্তর প্রেক্ষাপট এবং প্রক্রিয়াতেই ছিল আমাদের মূল মনোযোগ। কীভাবে প্রতিটি ম্যাচ থেকে শিখতে পারছি, ব্যর্থ হওয়ার ম্যাচগুলো থেকেও, সেসবই ছিল ভাবনায় এবং এখনও সেটিতেই বিশ্বাস করি আমি।
এই যে বাংলাদেশে এবার এখনও এত ভালো করতে পারিনি, আমি কিন্তু তবু এটিকে সফল সফর মনে করি। কারণ, অনেক কিছু শিখেছি। রান বা উইকেটের দিক থেকে ব্যর্থ হই বা সফল, শেখার জায়গায় সবসময় সফল হওয়াটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তবে হ্যাঁ, কিশোর বয়সের সেঞ্চুরিগুলো আমার বিশ্বাসকে পোক্ত করে তুলেছিল।
আপনার ১৪ বছর বয়সেই নিউ জিল্যান্ডের সংবাদ মাধ্যমে লেখা হয়েছিল ‘এই ছেলেটিই কি নেক্সট বিগ থিং?’ পরেও আপনাকে নিয়ে এরকম অনেক কিছু লেখা বা বলা হয়েছে। প্রত্যাশার চাপটা অনুভব করতেন?
আব্বাস: নাহ, তেমন না। কারণ, ওসব নিয়ে ভাবি না। জানি যে, মিডিয়া অনেক সময় অনেক কিছু বলবে। হ্যাঁ, তখন বেশ খুশি হয়েছিলাম, বিব্রতও। তবে আমাকে খুব বেশি ভাবায়নি ওসব। সবসময় মাথায় ছিল, ভালো ক্রিকেটার হতে হবে, এই তো।
আপনি নিজে কখন বুঝতে পারলেন যে, ক্রিকেটে আপনার সত্যিকারের সম্ভাবনা আছে এবং একদিন জাতীয় দলে খেলতে পারেন?
আব্বাস: সেটা তো মনে নেই! কোনো সুনির্দিষ্ট সময়ের কথা বলা কঠিন। আমার ক্যারিয়ারে অনেক কিছুই অনেক দ্রুত হয়ে গেছে। কেউ যদি দুই বছর আগে আমাকে বলত, দুই বছর পর আমি বাংলাদেশে খেলব জাতীয় দলের হয়ে, হেসেই উড়িয়ে দিতাম। এখন আমি এখানে।
বাবা বলে থাকেন, আমার ১৩ বছর বয়স থেকেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এই খেলায় অনেক দূর যেতে পারি আমি।
আমার নিজের বিশ্বাসটা পোক্ত হয়েছিল সম্ভবত নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেটের ট্যালেন্ট প্রোগ্রামে জায়গা পাওয়ার পর। ১৬ বছর বয়সে তাদের ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামে গিয়েছি এবং সেখানে যেভাবে তারা যত্ন নিয়েছে এবং দেখভাল করেছে, সবরকম সহায়তা দিয়েছে, তা অসাধারণ।
খেলায় উন্নতি করার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা সেখানে ছিল। শুধু ক্রিকেটীয় দক্ষতাই নয়, বরং পড়াশোনা এবং সামগ্রিক পরিবেশ ও আবহ ঠিক আছে কি না, সেটাও নিশ্চিত করত। একজন কিশোর বা তরুণকে গড়ে তোলার নিরাপদ পরিবেশ তারা গড়ে তুলতে চাইত। পেশাদার হিসেবে গড়ে তোলার চমৎকার সিস্টেম সেখানে ছিল।
পরে ১৮ বছর বয়সে ক্রিকেট ওয়েলিংটনে চুক্তির প্রস্তাব পাওয়াটাও আমার এগিয়ে যাওয়ার পথে সহায়ক ছিল। বাবাও তখন আমার সঙ্গে আবার ওয়েলিংটনে এসে থিতু হন। সেখানেও কোচের চাকরি পেয়ে যান তিনি।
অনূর্ধ্ব-১৯ দলেও অনেক রান করেছি। বিশ্বকাপটা খেলা হয়নি, কোভিডের বিধিনিষেধের মধ্যে নিউ জিল্যান্ড অংশ নেয়নি। পরে ‘এ’ দলের হয়ে ভালো কিছু ইনিংস খেলার পর জাতীয় দলে সুযোগ এসেছে।
গত ১৫-২০ বছরে নিউ জিল্যান্ডের হয়ে এমন অনেক ক্রিকেটার খেলেছেন, যাদের শেকড় উপমহাদেশে। জিতান প্যাটেল, জিত রাভাল, তারুণ নেথুলা, এজাজ প্যাটেল, ইশ সোধি, রাচিন রাভিন্দ্রা, এখন আদিত্য আশোক ও আপনি উঠে আসছেন। বেড়ে ওঠার সময়টায় নিউ জিল্যান্ডের ক্রিকেট সমাজ আপনাকে কিভাবে গ্রহণ করেছে?
আব্বাস: নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেট সম্পর্কে একটি কথা সবসময়ই বলতে ভালোবাসি আমি, তা হলো এটি খুবই নিরপেক্ষ ও ন্যায্য। কে কোথা থেকে এসেছে বা কার পরিচয় কী, এসব এখানে কোনো বিষয় নয়। ক্রিকেটে ভালো হলে, প্রতিভা থাকলে, তারা সমানভাবেই মূল্যায়ন করে। এই ব্যাপারটা আমার অসম্ভব ভালো লাগে।
এই ধরনের সিস্টেম থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং আমার ক্যারিয়ার আজ যে পর্যায়ে এসেছে, সেটির পেছনে এই সিস্টেম একটি বড় কারণ। নিউ জিল্যান্ড ক্রিকেট এবং তাদের সমর্থন ছাড়া এটা সম্ভব হতো না। আমি নিশ্চিতভাবে মনে করি, তারা যে সিস্টেম তৈরি করেছে এবং যে কোনো জায়গার মানুষের প্রতি যে ন্যায্যতা দেখায়, তা অসাধারণ।
আমি জানি আপনি কোন ভাবনা থেকে প্রশ্নটি করেছেন। কিন্তু নাহ, ওখানে কোনো বৈষম্য নেই।
ক্যারিয়ার নিয়ে ভবিষ্যৎ ভাবনা কি? কোনো সংস্করণের প্রতি বাড়তি অনুরাগ আছে?
আব্বাস: সব সংস্করণেই খেলতে চাই। তবে সত্যি বলতে, লাল বলের ক্রিকেটই আমার সবচেয়ে প্রিয়। এটি ক্রিকেটের সবচেয়ে বিশুদ্ধ রূপ, নিঃসন্দেহে এটিই আমার সবচেয়ে পছন্দের সংস্করণ। যদিও এখন সাদা বলের ক্রিকেট খেলতে গিয়ে এটির গতিময়তা এবং দ্রুত চিন্তার করার চ্যালেঞ্জটা বেশ উপভোগ করছি। তিন সংস্করণ নিয়েই রোমাঞ্চিত, তবে টেস্টই বেশি প্রিয়।
অনেকেই এরকম বলে থাকেন, কিন্তু পরে দেখা যায়, সাদা বলের ক্রিকেটকেই বেশি আপন করে নেন। বিশ্বজুড়েই উঠতি ক্রিকেটারদের একটি বড় অংশের স্বপ্নই থাকে এখন আইপিএল ও ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলো খেলা…
আব্বাস: আমি আমার মনের কথাই বলেছি। প্রত্যেকেরই নিজস্ব পছন্দ বেছে নেওয়ার অধিকার আছে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে লাল বলের ক্রিকেটই সবচেয়ে খাঁটি।
বিশ্বের নানা প্রান্তে (ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটে) খেলতে অবশ্যই খুব ভালো লাগবে। কিন্তু আমার মনে হয়, ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে ওসব ভাবাটাই একটু তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। হয়তো ভবিষ্যতে বা সঠিক সময়ে সঠিক সুযোগ এলে গ্রহণ করতে চাইব। আমার প্রধান লক্ষ্য, নিউ জিল্যান্ডের একজন টেস্ট ক্রিকেটার হওয়া।
আমার বাবার কাছেও সবসময়ই ক্রিকেট মানে টেস্ট ক্রিকেটই ছিল এবং আমাকে সবসময় সেটিই বলতেন। তিনি এখনও বলেন, ‘এটিকে টেস্ট ক্রিকেট বল হয়, কারণ এটি মানসিকভাবে এবং শারীরিকভাবে চূড়ান্ত পরীক্ষা নেয়।’ তিনি টেস্ট ক্রিকেটের পাঁড় সমর্থক। আমার লক্ষ্য পরিষ্কার, টেস্ট ক্রিকেটার হতে চাই এবং বাবার ও নিজের স্বপ্ন পূরণ করার জন্য সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করব।
তাহলে বলা যায়, বাবার স্বপ্ন বুকে ধারণ করেই আপনি এগিয়ে যাচ্ছেন?
আব্বাস: বলতে পারেন। তিনি আমাকে অনেকবারই বলেছেন যে, তার স্বপ্ন ছিল টেস্ট খেলা, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলা। কিন্তু পাকিস্তানের মতো দেশে, বিশাল জনসংখ্যার মধ্যে অনেক প্রতিযোগিতা, অনেক অনিশ্চয়তা ও কঠিন বাস্তবতা। তিনি তাই বলতেন, আমার মাধ্যমেই নিজের অপূর্ণতা দূর করার চেষ্টা করবেন। আমার আন্তর্জাতিক অভিষেকের দিনটি তাই আমাদের দুজনের জন্যই পূর্ণতার একটি মুহূর্ত ছিল, চক্র পূরণের মতো। তবে এখনও টেস্ট খেলা বাকি, অনেক কিছুই বাকি।
বাড়িতে কি ক্রিকেটের আলোচনা অনেক হয় আপনাদের?
আব্বাস: সেটা তো হয়ই। তিনি কোচ, তার সঙ্গে ট্রেনিং করি অনেক। ক্রিকেটের কথা তো বলতেই হয়। তবে এটাও তিনি বুঝতে পারেন যে, আমার চারপাশে সবসময় ক্রিকেটই থাকে। আমরা যেমন ক্রিকেট নিয়ে অনেক কথা বলি, তেমনি অনেক সময় এটা থেকে দূরে থাকারও চেষ্টা করি, কারণ কেউ চায় না, সারাক্ষণই এটা চলতে থাকুক। স্পেসটুকু দরকার আছে এবং তিনি সেটা খুব ভালোভাবেই বোঝেন।
জন্মভূমিতে যাওয়া যায়?
আব্বাস: বেশ কয়েকবার পাকিস্তানে গেছি। সেখানে আমার অনেক আত্মীয়স্বজন আছে, মাঝেমধ্যে দেখা করতে যাই। গত কয়েক বছরে অবশ্য যাওয়া হয়নি, তবে অদূর ভবিষ্যতেই যাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছি।
বেড়ে ওঠার দিনগুলিতে আপনার আদর্শ কে ছিলেন?
আব্বাস: ওয়াসিম আকরাম। যদিও আমার জন্মের আগেই তিনি খেলা ছেড়েছেন। তবে আমার বাবা তার দারুণ ভক্ত ছিলেন এবং তার বোলিংয়ে অনেক গল্প করতেন আমাকে, ভিডিও দেখাতেন। আমি যেহেতু বাঁহাতি পেসার, বাবা চাইতেন আমি যেন ওয়াসিম আকরামের মতোই বল করি। তার তুলনায় আমি কিছুই না, কিন্তু তার মতো বোলিং করতে চাইতাম।
পরে আমার ভালো লাগত ট্রেন্ট বোল্টকে। ব্যাটিংয়ে অবশ্যই কেন উইলিয়ামসন।
এখন কোনো অলরাউন্ডারকে ভালো লাগে? কারও মতো হতে চান?
আব্বাস: বেন স্টোকসে ভালো লাগে, হার্দিক পান্ডিয়াকেও। তবে কারও মতো হওয়ার কথা বললে তো, সব অলরাউন্ডারই হতে চাইবে জ্যাক ক্যালিসের মতো।
জেনুইন অলরাউন্ডার হয়ে ওঠাই আমার লক্ষ্য। আশা করি, নিজের স্কিল আরও বাড়াতে পারব। অনেক অনেক দূর যেতে হবে এখনও।
এক বছরের মধ্যে দুবার বাংলাদেশে এলেন, অভিজ্ঞতা কেমন?
আব্বাস: ক্রিকেটীয় দিক থেকে তো বলেছিই, উইকেট ও কন্ডিশন চ্যালেঞ্জিং। প্রচণ্ড গরম। এখানে খেলা কঠিন। তবে শেখার জন্য এসব দারুণ।
মাঠের বাইরের কথা বললে, বাংলাদেশের মানুষ অসাধারণ। খুবই ভালো। এটা আমার সত্যিই খুব ভালো লেগেছে। খুব ভালো আতিথেয়তা পেয়েছি। বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমার মনে শুধু ভালোবাসাই আছে।