Published : 18 Sep 2025, 11:56 PM
রাজধানীর সরকারি সাত কলেজ নিয়ে প্রস্তাবিত ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এসব কলেজের শিক্ষকরা আলাদা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। তাদের এই অবস্থানকে বিশ্ববিদ্যালয়টির বিপক্ষে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকরা কলেজগুলোকে একীভূত না করে আলাদা ক্যাম্পাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে সাত কলেজকে অধিভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন। শিক্ষকদের এই দাবিকে ষড়যন্ত্র মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকা কলেজের শহীদ মিনার চত্বরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাত কলেজের শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান বলেন, “ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শুরু থেকেই নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে। এখন আবার নতুন করে এ কার্যক্রমের বিপক্ষে একটি পক্ষ ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের উসকে দিচ্ছে।
“ঐতিহ্য রক্ষার নামে তারা শেষ মুহূর্তে এসেও সরকারের কাজে বাধা সৃষ্টি করতে কতিপয় শিক্ষার্থীকে ব্যবহার করছেন।”
তিনি বলেন, “ষড়যন্ত্রকারীরা প্রথমে সরকারি তিতুমীর কলেজকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় করার প্রলোভন দেখিয়ে কলেজটির শিক্ষার্থীদের দিয়ে মাঠ গরম রাখার চেষ্টা করেছেন। কলেজটির শিক্ষার্থীরা যখন সরকারের প্রস্তাবিত কাঠামোর গুণগত মান উপলব্ধি করেছেন, তখন তারা কথিত আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং প্রস্তাবিত কাঠামোকে স্বাগত জানিয়েছেন।”
কিছু শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম নিয়ে সংশয়ে থেকেছেন, এখন তারা সংগঠিত হয়ে আন্দোলনে নেমেছেন মন্তব্য করে সাত কলেজের শিক্ষার্থী প্রতিনিধি বলেন, “তারা বুধবার কলেজে কলেজে শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা বাদ দিয়ে শিক্ষার্থীদের বাসে চড়ে ইউজিসিতে গিয়ে কর্মসূচি করেছেন।
“কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী কিছু শিক্ষক এতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলে আমরা শুনেছি।”
ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের না পেয়ে বিক্ষোভ করেছেন তুলে ধরে ঢাকা কলেজের এই শিক্ষার্থী বলেন, মঙ্গলবারও শিক্ষকরা একইভাবে ক্লাস-পরীক্ষা বাদ দিয়ে মাউশিতে (মাধ্যমিকও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর) গিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রমের বিরুদ্ধে তদবিরে ব্যস্ত ছিলেন।
“যেখানে আমাদের সম্মানিত শিক্ষকদের ক্লাস-পরীক্ষা-ল্যাব-গবেষণায় ব্যস্ত থাকার কথা, সেখানে তারা নিজেদের স্বার্থ হাসিলে পাঠদান বাদ রেখে আন্দোলনে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এটা আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক একটা ব্যাপার।”

শিক্ষা ক্যাডারের ব্যানারে শিক্ষকদের দাবি সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের স্বাধীন-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নকে ‘বাধাগ্রস্ত করবে’ দাবি করে আব্দুর রহমান বলেন, “সাত কলেজ নিয়ে পুরনো খেলা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।
“আমরা স্পষ্ট বলছি, ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘আমরা আগে অফিসার, পরে শিক্ষক’ বলা কোনো শিক্ষকের জায়গা হবে না। স্বপ্নের উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে এখানে গবেষণানির্ভর, যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষক নিয়োগের সুনির্দিষ্ট কাঠামো অনুসরণ করে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।”
দ্রুত ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের অধ্যাদেশ জারির দাবি তুলে এ শিক্ষার্থী প্রতিনিধি বলেন, “আমরা মনে করি, যত দ্রুত প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ জারি হবে, যত দ্রুত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন গঠন হবে, যত দ্রুত এই বিশ্ববিদ্যালয় কার্যক্রম শুরু করতে পারবে, তত দ্রুত ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র বিনাশ হবে। অধ্যাদেশ হয়ে গেলে আর কোনো ষড়যন্ত্রই কাজে আসবে না। সরকারের এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের মুখে যেকোনো ষড়যন্ত্র শিক্ষার্থীরা রুখে দেবে।”
দ্রুত অধ্যাদেশ জারি না হলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার হুমকি দেন আব্দুর রহমান।
ঢাকার সরকারি সাতটি কলেজ একসময় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। ২০১৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি কলেজগুলোকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। তবে অধিভুক্ত করার পর থেকে যথাসময়ে পরীক্ষা নেওয়া, ফল প্রকাশসহ বিভিন্ন দাবিতে সময় সময় আন্দোলন করে আসছিলেন শিক্ষার্থীরা। আট বছরে ক্ষুদ্র সমস্যাগুলো পুঞ্জীভূত হয়ে বড় রূপ নেয়। পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে গেল জানুয়ারিতে কলেজগুলোকে অধিভুক্তি থেকে সরানো হয়। এরপর দাবিদাওয়া আর আন্দোলনের মুখে কলেজগুলো নিয়ে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
গত অগাস্টে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রস্তাবিত ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি কলেজকে চারটি স্কুলে ভাগ করা হবে; সব ক্লাস সশরীরে হবে না, পঠন-পাঠনের ধারাও হবে দেশের সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আলাদা। সাত কলেজকে চারটি স্কুলে ভাগ করে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষা ব্যবস্থা হবে ‘ইন্টার ডিসিপ্লিনারি’ ও ‘হাইব্রিড ধরনের’। সেখানে ৪০ শতাংশ ক্লাস অনলাইনে ও ৬০ শতাংশ ক্লাস অফলাইনে হবে৷ তবে সব পরীক্ষা হবে সশরীরে।
যা বলছেন শিক্ষকরা
এর আগে বুধবার সরকারি কলেজের শিক্ষা ক্যাডারভুক্ত শিক্ষকদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন-ইউজিসির দপ্তরের সামনে মানববন্ধন করে কলেজগুলোর জন্য প্রস্তাবিত কাঠামোয় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় না করার দাবি জানান।

বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন ‘বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডার সমিতি’ সে দিন এক বিবৃতিতে বলেছে, “সাতটি সরকারি কলেজ রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অংশ এবং গৌরবময় ঐতিহ্যের ধারক। এগুলোকে হঠাৎ করে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা বা প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তন করা জাতীয় স্বার্থ ও ঐতিহ্যের পরিপন্থি।”
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকার সাতটি কলেজকে বের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করার সময় যথাযথ সমীক্ষা ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি দাবি করে বিবৃতিতে বলা হয়, “এটি ছিল ব্যক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত, যার ফলে প্রশাসনিক ও একাডেমিক ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয় এবং দেড় লক্ষাধিক শিক্ষার্থীর জীবনে অনিশ্চয়তা নেমে আসে, যা ভবিষ্যতেও পুনরাবৃত্তি হতে পারে।
“বাংলাদেশের কলেজপর্যায়ে শত বছরেরও বেশি সময় ধরে উচ্চশিক্ষার গৌরবময় ঐতিহ্য রয়েছে। ঢাকা কলেজ ১৮৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা চালু করে। এই ধারায় কলেজভিত্তিক উচ্চশিক্ষা জাতির জন্য বিশেষ অবদান রেখেছে।”
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মডেল অনুসারে সারা দেশে কলেজভিত্তিক স্নাতক শিক্ষা সম্প্রসারিত হয়েছে এবং তা দেশের উচ্চশিক্ষা বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে দাবি করে শিক্ষা ক্যাডার সমিতি বলছে, “নামসর্বস্ব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থী সংকটে ভুগছে। সাত কলেজে শিক্ষার সুযোগ সীমিত করলে শিক্ষার্থীকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হবে, যা নীতিগতভাবে শিক্ষার্থীবান্ধব নয়।
“শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যরা রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা পেলে কলেজভিত্তিক উচ্চশিক্ষা পরিচালনা করতে সক্ষম। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও চিকিৎসকদের মতো তারাও বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় পারদর্শী হতে পারে। সাত কলেজে শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত করলে জেলা শহরের ঐতিহ্যবাহী কলেজগুলো সমরূপ দাবি উত্থাপন করতে পারে, যা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টি করবে।”
সাত কলেজ নিয়ে শিক্ষা ক্যাডার সমিতির সুপারিশ তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ঐতিহ্যবাহী সাতটি কলেজের বিদ্যমান প্রশাসনিক ও আর্থিক কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন গ্রহণযোগ্য নয়। এই কলেজগুলো কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হবে তা অবশ্যই যথাযথ আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।”
শিক্ষা ক্যাডারের প্রস্তাব হল-প্রস্তাবিত কাঠামোয় কলেজের বিদ্যমান সক্ষমতা, অবকাঠামো ও ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে, এ কলেজগুলোকে কলেজিয়েট বা অধিভুক্তিমূলক কাঠামোয় রূপান্তর করা যেতে পারে। অথবা ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে পৃথক ক্যাম্পাসে স্থাপন করে ঢাকার সাতটি সরকারি কলেজকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা যেতে পারে।
তারা বলছে, ইউজিসি কর্তৃক যথাযথ সমীক্ষা পরিচালনা করে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অধ্যয়নরত সব শিক্ষার্থীর জন্য অভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। শিক্ষক সংখ্যা বৃদ্ধি, গবেষণা বাজেট বরাদ্দ, আধুনিক ল্যাব, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, আবাসন ও বৃত্তি সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে মানসম্মত উচ্চশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। রাজধানী, মহানগর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মধ্যে কোনো বৈষম্য রাখা যাবে না।
আরও পড়ুন: