Published : 28 Sep 2025, 12:08 AM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন পরিচালনার অধিকাংশ দায়িত্বে থেকেও নির্বাচন নিয়ে বিএনপিপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দলের অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিবৃতি দেওয়াকে ‘দ্বিচারিতা’ বলছেন জামায়াতপন্থি শিক্ষকরা।
শনিবার বিকালে ডাকসু ভবনের সামনে সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন কেন্দ্রিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে জামায়াতপন্থি শিক্ষদের সংগঠন ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক’।
লিখিত বক্তব্যে ইউটিএলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. আতাউর রহমান বিশ্বাস বলেন, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পক্ষে শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল ডাকসু নির্বাচন নিয়ে ‘হতাশাজনক’ বিবৃতি দিয়েছে।
জুলাই পরবর্তী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোতে সংগতকারণে সাদা দল নেতৃত্ব দিচ্ছে দাবি করে তিনি বলেন, “বিভিন্ন অনুষদের ডিন, ১৮টি হলের মধ্যে ১৬টির প্রভোস্টরা সরাসরি সাদা দলের সাথে সম্পৃক্ত।
এছাড়া ডাকসু নির্বাচনের জন্য গঠিত নির্বাচন কমিশনের ১০ জন সদস্যের মধ্যে আটজনই সাদা দল ও দুইজন গোলাপী দলকে প্রতিনিধিত্ব করেন।”
ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদল ও অপর কয়েকটি সংগঠন ভোট ‘কারচুপির’ যেসব অভিযোগ তুলেছে তা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ‘সুষ্পষ্ট’ ব্যাখ্যা চেয়ে শুক্রবার বিবৃতি দিয়েছে শিক্ষকদের সংগঠন সাদা দল।

সংগঠনটি বলেছে, সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ডাকসু নির্বাচনে ব্যাপক ‘অনিয়ম ও কারচুপির’ যে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপিত হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে খতিয়ে দেখার দাবি রাখে।
“ওই প্রতিবেদনে যে ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও সুনামকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে।
“এছাড়া ডাকসু নির্বাচনে গুরুতর অনিয়মের এই অভিযোগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গৌরবময় ঐতিহ্য এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।”
ডাকসু ও হল সংসদের ভোট হয় গত ৯ সেপ্টেম্বর, তাতে ৭০ শতাংশের বেশি ভোট পড়ার তথ্য দেয় নির্বাচন কমিশন।
ভোটের লড়াইয়ে ছাত্রশিবিরের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্রার্থীরা। তবে কোনো পদেই তারা জয়ের মুখ দেখেননি। সম্পাদকীয় যে তিনটি পদ শিবিরের হাতছাড়া হয়, সেগুলোতে বিজয়ী হন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
ভোটের ১৩ দিনের মাথায় গেল রোববার ‘কারচুপির’ অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলনে আসেন ছাত্রদল থেকে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা। তারা ডাকসু নির্বাচনের ১১টি অনিয়ম-অভিযোগ তুলে ধরেন। সেখানে তারা ভোটের সিসিটিভি ভিডিও প্রকাশের দাবি তোলেন।
তবে বুধবার এক বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশন বলেছে, ‘অস্পষ্ট ও সারবত্তাহীন’ আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ তালিকা দেওয়ার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ সবিনয়ে অপারগতা প্রকাশ করছে।
নির্বাচনে নানা অনিয়ম কারচুপির অভিযোগে জানাতে সবশেষ ২৩ সেপ্টেম্বর উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খানের সঙ্গে সাক্ষাত করে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ ও ছাত্রদল মনোনীত প্যানেল। সেখানেও তারা অভিযোগ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের দাবি নিয়ে গড়িমসি করছে।
ছাত্রদল ছাড়াও প্রতিরোধ পর্ষদ প্যানেল ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনে ১২টি ‘অনিয়ম ও অসংগতির’ অভিযোগ তুলেছে।
এ অবস্থায় সংবাদ সম্মেলনে আসেন জামায়াতপন্থি শিক্ষকরা।
অধ্যাপক আতাউর বলেন, “নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া রিটার্নিং অফিসার, পোলিং অফিসারদের অধিকাংশই সাদা দলের সক্রিয় সদস্য হিসেবে পরিচিত। নির্বাচন পরিচালনার অধিকাংশ দায়িত্ব যখন সাদা দলের শিক্ষকদের হাতে ছিল; তখন নিজেদের বিবৃতিতে দাবি করা নির্বাচনে ‘জালিয়াতি ও অনিয়ম’ প্রসঙ্গটি দ্বিচারিতা ও দ্বিমুখী আচরণের পর্যায়ে পড়েছে।
“এতে করে বিবৃতি দানকারী শিক্ষকগণের নৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।”
তিনি বলেন, “ডাকসু নির্বাচনে ভোট শুরুর আগে পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে খালি ব্যালট বক্স সিলগালা করা হয়। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কোথাও জালিয়াতি, কারচুপি, ব্যালট ছিনতাই বা সিসিটিভি ব্ল্যাকআউটের ঘটনা ঘটেনি।
“ভোটগণনাও সিসিটিভিতে লাইভ দেখানো হয় এবং সকলের উপস্থিতিতে ফলাফল ঘোষণা করা হয়। তবু সাদা দলের অনিয়মের অভিযোগ শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ দেশবাসীকে মর্মাহত করেছে।”
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, গণতন্ত্রে জয়-পরাজয় স্বাভাবিক। এই উপলব্ধি শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ বাড়ায়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কারও ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয় তুলে ধরা জামায়াতপন্থিরা শিক্ষকরা বলছেন, এটি জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত মুক্তচিন্তার কেন্দ্র। আধিপত্যবাদী মানসিকতা শিক্ষার্থীর স্বাধীন মতপ্রকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই ভোটারের রায় অগ্রাহ্য করে যেকোনো মূল্যে বিজয়ের চেষ্টা বিভাজন ও সংঘাত সৃষ্টি করে, যা শিক্ষার পরিবেশ ক্ষুণ্ন করে। এটি গণতান্ত্রিক অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি সুপরিকল্পিত প্রয়াস ব্যতীত আর কিছুই নয়।
বিবৃতি প্রত্যাহারের জন্য সাদা দলের প্রতি আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ইউটিএলের তরফে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশনকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উত্থাপিত অযৌক্তিক প্রশ্নের সুরাহারা দাবি তোলা হয়েছে।
সংগঠনটির দাবি, শিক্ষার্থীদের তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের পর কোনো ধরনের হয়রানি কিংবা তাদের ম্যান্ডেট কেড়ে নেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড বন্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
ডাকসু নির্বাচন ‘অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে’ সম্পন্ন হওয়ায় ইতোমধ্যে দেশ বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে দাবি করে জামায়াতপন্থি শিক্ষকরা বলছেন, এমন নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যেসকল তৎপরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে সেগুলোর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আইনানুগ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ইউটিএলের সদস্য সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন, অধ্যাপক মুনীরা জাহান উপস্থিত ছিলেন।