Published : 11 Jul 2026, 10:15 PM
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে কাছে পেয়ে সরকারি চাকরিতে চিকিৎসকদের অবসর নেওয়ার বয়স বাড়ানোসহ নিজেদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া ও অভিযোগ তুলে ধরেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক এবং বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।
শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এবং তার সহধর্মিনী এ মেডিকেলের সাবেক শিক্ষার্থী জুবাইদা রহমান উপস্থিত ছিলেন।
কলেজের ডা. শামসুল আলম খান মিলন মিলনায়তনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসির বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের (ডিএমসিয়ান) ভাবনা শীর্ষক এক মুক্ত আলোচনার আয়োজন করা হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের সাবেক শিক্ষার্থী ময়মনসিংহ-৭ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন বলেন, ‘‘ইউকেতে (যুক্তরাজ্যে) চিকিৎসকদের বয়স হচ্ছে ৬৫/৬৭। আমরা ৫৯ এ চলে যাই, ৫৯ এখন কোনো বয়স না। আপনি জানেন যে আমাদের গড় আয়ু বেড়ে গেছে।
“আমার মনে হয়, বিশেষ করে চিকিৎসকদের বেলায় যদি এই জিনিসটা (বয়স) একটু চিন্তা করতে পারতেন খুব ভালো হত। কারণ তারা আরো ভালো সেবা দিতে পারতেন।”
লিটন বলেন, ‘‘আমরা জানি আপনার মাথায় কী আছে হেলথ সম্পর্কে। আমরা জানি যে কী আছে।”
তখন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘আপনি বললেন যে, আমার মাথায় হেলথ সম্পর্কে কী আছে? আমার মাথার মধ্যে হেলথ নাই। আমার মাথার মধ্যে উনি (জুবাইদা রহমান) আছেন।”
এ সময় পুরো মিলনায়তনে চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা করতালি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ দিবস উপলক্ষে কলেজ কর্তৃপক্ষ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। জুবাইদা ডিএমসির ৪৩তম ব্যাচের এমবিবিএস শিক্ষার্থী ছিলেন।
কে-৫৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. আহমেদ এহসানুর রহমানের সঞ্চালনায় ৭৯ ব্যাচের শিক্ষার্থী সাদিয়া তাসনীম ১৯০৪ সালে নির্মিত মেডিকেল কলেজ ভবন আধুনিকায়নের দাবি জানান। বলেন, “ভবনের বিভিন্ন অংশ ইতমধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে এবং রোগীর সংখ্যা হাসপাতালের ধারণ ক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি।”
হোস্টেলের নতুন প্রকল্প উদ্বোধন করায় সরকারপ্রধানকে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি বলেন, “আমাদের হাসপাতালের ভবনটি নির্মাণের যে প্রকল্প সেটারও দ্রুত উদ্বোধন এবং বাস্তবায়নের অনুরোধ জানাচ্ছি।”
একই সঙ্গে তিনি কলেজের ‘ক্লিনিক্যাল ক্লাসে’ শিক্ষার্থী বেশি হওয়ায় তাদের পাঠদানে অসুবিধার কথা তুলে ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আসন সংখ্যা বর্তমানের ২৩০ বা ২৪০ থেকে কমিয়ে ১৫০ বা এর চেয়েও কম করার অনুরোধ করেন।
তিনি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
৮০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জোহায়ের ইসলাম স্মরণ মেডিকেল কলেজের পাঠ্যক্রম পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তিনি বিদেশের পাঠ্যক্রমের উদাহরণ দিয়ে বেসিক, প্যারা ক্লিনিক্যাল ও ক্লিনিক্যাল সাবজেক্টের সমন্বয় ঘটানোর কথা বলেন।
তিনি সপ্তাহের ছয় দিন মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের ঠাসা শ্রেণি কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে সাপ্তাহিক ছুটি দুদিন করার প্রস্তাব দেন।
এসময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘ডাক্তার সাহেব আপনাদের এই রুটিনটার সাথে আমি পরিচিত।”

শিক্ষার্থীদের ছুটির বিষয়টি এখানে যারা শিক্ষক আছেন তারা বিবেচনা করবেন বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘‘সপ্তাহে সাত দিন আমিও কাজ করি।”
তিনি বলেন, ‘‘আপনাদের কাছ থেকে আমরাও একটা সমাধান চাই। আমি জানি আমরা সকলে এখানে মানুষ আমাদের দুঃখ, কষ্ট, ব্যথা, পরিবার-পরিজন সব কিছু আছে। তারপরও আপনি একজন চিকিৎসক এবং আমি একজন অসুস্থ মানুষ হিসেবে যখন আপনার কাছে আমি যাই তখন কিন্তু আপনি আমার পরম বন্ধু এবং সেখানে আপনার একটা বিশাল দায়িত্ব থাকে।
“আমরা বিভিন্ন কিছু দেখি যেগুলো দেখি যেটা অনেক সময় কষ্ট লাগে। তবে আপনাদের কাছে আমাদের যেটা প্রত্যাশা থাকবে, এই দেখার বিষয়গুলো দিন দিন যাতে কমে আসে আপনাদের কাছে এই প্রত্যাশা থাকবে। যে নেতিবাচক যে বিষয়গুলো আমরা দেখি বিভিন্নভাবে সেগুলো ইনশাল্লাহ দিন দিন কমে আসবে।”
৭৬ ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. রকিবুল হাসান চৌধুরী সায়মন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পোস্ট গেজুয়েট ট্রেইনির সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় ইন্টার্নরা কাজ শেখার সুযোগ সেভাবে না পাওয়ার কথা তুলে ধরে সবার সহযোগিতা চান।
এসময় কেন সুযোগ পান না প্রশ্ন করেন প্রধানমন্ত্রী।
তখন ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘‘আমাদের ওয়ার্ডগুলোতে পোস্ট গ্রাজুয়েট ট্রেইনির সংখ্যা অনেক বেশি।”
সমাধানটা কী? জানতে চান প্রধানমন্ত্রী।
ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘‘এটার সমাধান হচ্ছে ইন্টার্নদের প্রতি আরেকটু বেশি ফোকাস দিতে হবে এবং এদের কাজ করার সুযোগটা আরেকটু বাড়াতে হবে।”
কে করবে? জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। তখন সায়মন বলেন, ‘‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।”
তারেক রহমান বলেন, “সমাধানটা আপনাদের কাছেই আছে। আপনাদেরকেই বসে সমাধান বের করতে হবে, তাই না।”
ডিএমসির আবাসিক সার্জন মীর রাশেক আলম অভি প্রতিদিন অনেক বেশি রোগী দেখার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, সময় স্বল্পতার জন্য একজন রোগীকে বেশি সময় দিতে পারেন না। এতে রোগী যেমন প্রত্যাশিত মনোযোগ থেকে বঞ্চিত হন তেমনি চিকিৎসকও চিকিৎসা প্রদানে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন না।
তিনি রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে টিকেট কাটা ও লাইন ধরার ঝক্কির কথাও তুলে ধরেন।
এ সময়ে প্রধানমন্ত্রী জানতে চান, “আমার একটা প্রশ্ন আপনার কাছে যেটি বললেন, সরাসরি দুই দিনে প্রায় ৭০০ রোগী দেখতে হয়। তো গ্রাম থেকে ওইসব রোগীকে এতদূর আসতে হচ্ছে কেন?”
চিকিৎসক অভি বলেন, ‘‘এটার কারণ কোনো রেফারেল ব্যবস্থা নেই।”
কেন নেই- প্রশ্ন রেখে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘এটাতো আপনারই গড়ে তুলবেন। আপনি গত কয়েকদিনের নিউজ যদি ফলো করে থাকেন, এক দেড় মাসের নিউজ ফলো করে থাকেন আমরা কিন্তু সেভাবেই চেষ্টা করছি।
“আমরা উপজেলা হাসপাতাল যেটা ৫০ বেডে আছে এই হাসপাতালটাকে আমরা একশতে নেওয়ার চেষ্টা করছি। যেটা প্ল্যান করছি আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সকল উপজেলার ৫০ বেডের হাসপাতাল ১০০ বেডে রূপান্তরিত করব।
‘‘ভোটের জন্য আমরা যদি গ্রামে যেতে পারি তাহলে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য কেন আপনি উপজেলায় যাবেন না, তাই না।”
উন্মুক্ত আলোচনায় সাবেক শিক্ষার্থী সংসদ সদস্য মোছলেহ উদ্দিন ফরিদ, আইসিডিডিআরবির শরীফুল ইসলাম ববি ও ডা. দেবব্রত আইস মজুমদার তাদের ভাবনার কথা প্রধানমন্ত্রীকে বলেন।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল, প্রতিমন্ত্রী এমএন মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী এসএম জিয়া হায়দার, স্বাস্থ্য সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হোসেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক হারুন আল রশিদ, বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম, অধ্যাপক নাজমুল হাসান এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. মাজহারুল শাহীন, উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক মুসররাত সুলতানা উপস্থিত ছিলেন।