Published : 18 Jan 2026, 03:37 PM
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কনসার্টে সিগারেট স্টল বসিয়ে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে তা বিনামূল্যে বিতরণ করে সমালোচনা ও তোপের মুখে পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (ডাকসু)।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে শীতার্তদের জন্য তহবিল সংগ্রহে তিন ব্যান্ড ও গায়ক হাবিব ওয়াহিদকে নিয়ে শনিবার ‘কুয়াশার গান’ শিরোনামের কনসার্টের আয়োজন করেছিল ডাকসু। এই কনসার্টের সহ-আয়োজক ছিল ‘স্পিরিট অব জুলাই’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম।
ওই কনসার্টস্থলের মুখে বসানো হয় সিগারেট স্টল ‘ম্যাক্সিম’। সেখানে নিজেদের প্রচারণা হিসেবে শিক্ষার্থীদের কাছে সিগারেট বিলানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষার্থীরা। সমালোচনায় অনেকে সরব হয়েছে সোশাল মিডিয়ায়।
এ ঘটনায় কনসার্টের আয়োজকদের একজন ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদিককে দুষছেন শিক্ষার্থীরা। পরে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন তিনি।
সেখানে তিনি বলেছেন, কনসার্টের স্পনসর প্রতিষ্ঠান ‘এক্স ফোর্স’ অনুষ্ঠানস্থলে ‘স্মোকিং জোন’ করবেন এই তথ্য তার কাছে থাকলে, সেখানে যে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সিগারেট বিতরণ করা হবে সে বিষয়ে তার জানা ছিল না।
এখন এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কী না জানতে সহকারী প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমি ঘটনাটি ফেইসবুকে দেখছি। এখনো পুরোপুরি জানি না। আর, আমাদের অফিসিয়াল এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আমি মনে করি, এটা খুবই অন্যায় কাজ হয়েছে।”

এদিকে আয়োজকদের ‘প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে’ বলে মন্তব্য করেছেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মদ শাহীন। তবে কোনো ঘটনায় একজন, দুজনের দায় সম্পূর্ণভাবে ডাকসুর উপরে চাপিয়ে দিতেও নারাজ তিনি।
শাহীন ফেইসবুকে লিখেছেন, “ধুমপান এবং মাদককে না বলি। আজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেন্ট্রাল ফিল্ডে আয়োজিত ‘কুয়াশার গান’ কনসার্টে সিগারেট প্রমোশন এবং সিগারেট কোম্পানির স্পন্সরশিপ নেওয়া, পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনে সিগারেট প্রমোট করার দায়ে আয়োজকদের প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।”
তিনি বলেন, “উক্ত আয়োজনে ডাকসুর নির্দিষ্ট একজন সম্পাদক জড়িত থাকায় খুব স্বাভাবিকভাবেই সবাই ডাকসুকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন এবং ডাকসুতে শিবির ডমিন্যান্ট থাকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরকে। কিন্তু কথা হইলো- ডাকসুতে স্টেক আছে ২৮ জনের। সবাই ডাকসুর লোগো ব্যবহারের দাবিদার। নির্দিষ্ট একজন বা দুইজনের ভুল কাজের দায় পুরো ডাকসুকে চাপিয়ে দেওয়া উচিত না, আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরকে টেনে আনার তো কোন প্রাসঙ্গিকতাই নাই।
“বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঐ নির্দিষ্ট সম্পাদক বা ব্যক্তিকে জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসলে, কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে”।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের সদস্য সচিব সাকিব বিশ্বাস বলেন, ডাকসু আয়োজিত এই কনসার্টে ‘লজ্জাজনক’ বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, “কনসার্টে আবুল খায়ের টোবাকো কোম্পানি অত্যাধুনিক দোকান বসিয়ে ফ্রিতে ঢাবি শিক্ষার্থীদের মাদক সেবন করাচ্ছে। ডাকসু কি ঢাবি শিক্ষার্থীদের মাদক সেবনে মোটিভেট করে।
“একদিকে মাদকের বিরুদ্ধে তথাকথিত অভিযান এবং অন্যদিকে মাদক সেবনে মোটিভেট করা — এ কেমন দ্বিচারিতা। শিবির করলে কি সবকিছুই বৈধতা পায়। আশ্চর্য!”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সম্ভবত এই প্রথম কোন প্রোগ্রাম বা কনসার্টে সিগারেটের স্পন্সর নিয়ে সিগারেট ফ্রিতে বিতরণ করা হয়েছে’ জানিয়ে পোস্ট দিয়েছেন জাপানিজ স্ট্যাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফ উল্লাহ।
তিনি বলেন, “এ ডাকসুর এরাই আবার দু'দিন পর পর মাদক বিরোধী অভিযান করে আর হলে হলে সিগারেট নিষিদ্ধ করে।
“সারাদিন মাদক নিয়ে ঢুকা যাবে না বলে ডাকসুর মোনাফেকেরা সিগারেট ফ্রি তে দিয়ে মাদক কে প্রকাশ্যে প্রমোট করেছে। শিবির সমর্থিত ইসলামী দলটির প্যানেল এভাবেই হালালভাবে সবকিছু করছে। এখানে কোন গুনাহের চিহ্ন নেই। আলহামদুলিল্লাহ, ইসলামিক।“
মোসাদ্দিক পোস্টে যা বলেছেন
এদিকে ফেইসবুকে পোস্ট দিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন আয়োজকদের ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দিক ইবনে আলী মোহাম্মদ।
পোস্টের শুরুতে মোসাদ্দিক লিখেছেন, “প্রথমেই সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা ও সিগারেট বিতরণ কেন্দ্রিক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জন্য দূঃখ প্রকাশ করছি।“
দীর্ঘ পোস্টে তিনি বলেন, এ কনসার্ট আয়োজনে ডাকসুর পক্ষ থেকে শুধু তিনিই যুক্ত ছিলেন, তবে স্পনসরের সঙ্গে যোগাযোগ, চুক্তি বা শর্ত নির্ধারণসংক্রান্ত কোনো আলোচনায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না।
কনসার্টের স্পনসর প্রতিষ্ঠান ‘এক্স ফোর্স’ নিয়ে মোসাদ্দিক লিখেছেন, “প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছিল যে সংগীতানুষ্ঠানের মাঠে তারা একটি ‘স্মোকিং’ জোন করবে, যাতে ধূমপানের কারণে কনসার্টে আসা অন্যদের কোনো সমস্যা না হয়।”
তিনি বলেন, “আমি এটা শুনে অনেক বেশি ইতিবাচক হই। আমি কনসার্টের পুরোটা সময় ধরে গেস্ট ও স্টেজ ম্যানেজমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত থাকায় মাঠে কী হচ্ছিল, সে ব্যাপারে অবগত ছিলাম না। কনসার্টের শেষদিকে আমি ফেসবুকে দেখতে পাই যে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে, তখন আর কিছু করার সুযোগ ছিল না। আমি অবগত ছিলাম না যে তারা স্মোকিং জোনের ভিতর ফ্রিতে সিগারেট দেবে শিক্ষার্থীদের।
“এই মিসম্যানেজমেন্টের জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে আমি আরও সতর্ক, দায়িত্বশীল ও সমন্বিত ভূমিকা পালন করার চেষ্টা করবো। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা, সম্মান ও প্রত্যাশা পূরণই আমার প্রধান ও একমাত্র লক্ষ্য।“
এ ঘটনায় ডাকসুর পক্ষ থেকে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা জানতে ভিপি আবু সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদকে একাধিকার ফোন করেও পাওয়া যায়নি।
আইনে যা আছে
ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১৩) ধারা ৫(খ) অনুযায়ী, তামাকজাত দ্রব্য কিনতে প্রলুব্ধ করতে বিনা মূল্যে বিতরণ কিংবা স্বল্প মূল্যে বিক্রি নিষিদ্ধ। ধারা ৫(গ) অনুযায়ী, তামাকজাত দ্রব্যের বিজ্ঞাপন প্রচার বা এর ব্যবহার উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোনো দান, পুরস্কার, বৃত্তি প্রদান বা কোনো অনুষ্ঠানের ব্যয়ভার বহনও অপরাধ। এই ধারার বিধান লঙ্ঘনে অনূর্ধ্ব তিন মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
এই আইনের ৬(খ) ধারা অনুসারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক, খেলাধুলার স্থান ও শিশুপার্কের সীমানার ১০০ মিটারের মধ্যে তামাক ও তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি করলে শাস্তি হবে পাঁচ হাজার টাকা অর্থদণ্ড।
স্লোগান বিতর্ক
সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটা ভিডিওতে দেখা গেছে, অনুষ্ঠানে মোসাদ্দিক যখন ‘তুমি কে আমি কে’ স্লোগান দেন, তার জবাবে মঞ্চের নিচ থেকে আওয়াজ উঠে, ‘মোসাদ্দিক, মোসাদ্দিক’।
মোসাদ্দিক বলেন ‘কোটা না সংস্কার;, জবাবে আওয়াজ ওঠে ‘কোটা কোটা’।
মোসাদ্দিক বলেন, ‘আপস না সংগ্রাম’, সবাই বলে ওঠে, ‘আপস, আপস’।
আবার, তিনি যখন ‘গোলামী না আজাদী’ বলে স্লোগান দেন, তখন সবাই ‘গোলামী গোলামী’ বলে স্লোগান ধরেন।
এছাড়া, মুসাদ্দিক ফের ‘গোলামী না সংস্কার’ স্লোগান ধরলে শিক্ষার্থীরা 'যুক্তরাজ্যের চাকরি, যুক্তরাজ্যের চাকরি' বলে ওঠে। তিনি 'তুমি কে, আমি কে' স্লোগান ধরলে তারও উত্তর আসে 'ইউরেনিয়াম, ইউরেনিয়াম'।