Published : 04 Jul 2025, 09:34 PM
পদোন্নতি বোর্ডে এক শিক্ষকের উপস্থিতির প্রতিবাদে প্রশাসনিক ভবনে তালা দিয়ে বিক্ষোভ করেছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) একদল শিক্ষার্থী।
পরে ওই শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে পদোন্নতি বোর্ডের কার্যক্রম স্থগিত করার কথা জানিয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
শুক্রবার বিকাল ৩টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে সংস্কৃত বিভাগের দুই শিক্ষকের পদোন্নতি বিষয়ক বোর্ডের সভা ছিল।
এর আগে থেকে প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ জানাতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। পরে তারা উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহিয়া আখতারের কার্যালয়ে যান।
এক পর্যায়ে পদোন্নতি প্রত্যাশী সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কুশল বরণ চক্রবর্তীও উপাচার্যের কার্যালয়ে উপস্থিত হন। এ সময় উপাচার্যের উপস্থিতিতেই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ক্ষোভের মুখে পড়েন শিক্ষক কুশল বরণ।
পরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজন শিক্ষক কুশল বরণকে প্রশাসনিক ভবনের অন্য একটি কক্ষে নিয়ে যান। এরপর প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকে তালা দিয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলতে থাকে।
পরে সন্ধ্যায় ওই পদোন্নতি বোর্ড স্থগিত করার ঘোষণা দিলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ফিরে যান।
ওই ঘটনার সময় উপাচার্যের কার্যালয়ের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষক কুশল বরণকে ‘অবরুদ্ধ’ করে রাখা হয়েছে দাবি করে নগরীতে বিক্ষোভও করে একটি সংগঠন।
আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের দাবি, শিক্ষক কুশল বরণ চক্রবর্তী ‘স্বৈরাচারের দোসর’ এবং ‘মামলার আসামি’। এ ধরনের একজন শিক্ষক কীভাবে পদোন্নতি বোর্ডের সভায় হাজির হয়, সেই প্রশ্ন তাদের।
বিপরীতে শিক্ষক কুশল বরণ চক্রবর্তীর দাবি, তিনি ‘মবের শিকার’ হয়েছেন। ‘মিথ্যা তথ্য’ ছড়িয়ে তাকে উপাচার্যের সামনে হেনস্তা করা হয়েছে। তার দাবি, তিনি কোনো মামলার আসামি নন।
শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থায় নিয়ে ‘ফ্যাসিবাদের সঙ্গী’ শিক্ষক কুশল বরণ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে স্লোগান দিতে থাকেন আন্দোলনাকারীরা।
তাদের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন, ইসলামী ছাত্র শিবির, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনসহ আরো কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আন্দোলনকারীদের একজন শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কুশল বরণ চক্রবর্তী আওয়ামী স্বৈরাচারের দালাল। তিনি আইনজীবী আলিফ হত্যা মামলার আসামি। আজ শিক্ষকদের পদোন্নতি বোর্ডের সভা ছিল, সেখানে তিনি কীভাবে আসতে পারেন? কোনো স্বৈরাচারের ঠাঁই এই ক্যাম্পাসে হবে না।
“কুশল বরণ সাহস কীভাবে পায় সেখানে আসার? কারা তাকে নেপথ্যে থেকে শেল্টার দিচ্ছে? স্বৈরাচারের দালালদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে আমরা অবস্থান করছিলাম প্রশাসনিক ভবনের সামনে।”

সনাতন বিদ্যার্থী সংসদ নামে একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত শিক্ষক কুশল বরণ চক্রবর্তী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “পদোন্নতি বোর্ডে গিয়ে আমি জঘন্য একটা ঘটনার শিকার হয়েছি। তারা আমার সাথে মব সন্ত্রাস করেছে।
“আমি প্রশাসনিক ভবনের সামনে যখন সিএনজি থেকে নামি তখন কয়েকজন সেখানে স্লোগান দিচ্ছিল। সিএনজিতে বসা অবস্থায় আমি ভিসি ও প্রোভিসি স্যারকে ফোন দিই। উনারা ফোন না ধরায় আমি উপরে উঠি।”
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে কুশল বরণ চক্রবর্তী বলেন, “সেখানে গিয়ে দেখি তারা আগে থেকেই ভিসি স্যারের রুমে আছে। তখন তারা আমাকে ঘিরে ধরে। আমি বলেছি, আসুন একসাথে কথা বলি। যত প্রশ্ন আছে আমি জবাব দিতে চাই।
“কিন্তু তারা মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে থাকে। আমার নামে কোন মামলা নেই। তারা ছাত্র কিনা আমি চিনি না। তবে তাদের আচরণ ছাত্রের মত মনে হয় না। আমি তাদের শান্ত হতে বলেছি। কিন্তু তারা আমার সাথে মব করে। আমাকে বের হতে দেয়নি।”
সন্ধ্যার দিকে ‘নিজ দায়িত্বে’ প্রশাসনিক ভবন থেকে এবং পরে ৭টার দিকে ক্যাম্পাস থেকে বের হন জানিয়ে কুশল বরণ চক্রবর্তী বলেন, “শুনেছি পদোন্নতি বোর্ড নাকি স্থগিত করা হয়েছে। এখানে সব সম্ভব। ৫০ জন মিলে উচ্চবাচ্য করল আর পদোন্নতি বোর্ড স্থগিত হয়ে গেল।
“ভিসি স্যার একজন সিনিয়র শিক্ষক। আমিও শিক্ষক। কিন্তু অনেকবার ফোন করেও আমি ভিসি স্যারকে পরে আর পাইনি। প্রোভিসি স্যারের সাথে কথা বলে আমি প্রশাসনিক ভবন থেকে বের হয়ে এসেছি।”
আলিফ হত্যা বা এ সংক্রান্ত কোনো মামলার আসামি নন জানিয়ে কুশল বরণ চক্রবর্তী বলেন, “ওই ঘটনার সময় আমি চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ছিলাম। এবং সেই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুটিও নিয়েছিলাম চিকিৎসার জন্য। আমি চট্টগ্রামে ছিলামই না। আমার নামে কোন মামলা নেই।”

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী আবু নাসিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “শুক্রবার বন্ধের দিনে পদোন্নতি বোর্ডের সভা সাধারণত হয় না। কিন্তু আজ সেই সভা কেন বসানো হলো আমরা জানি না। খবর পেয়ে আমরা ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল দলের শিক্ষার্থীরাই প্রশাসনিক ভবনে যাই।
“তখন আমরা প্রশাসনের কাছে জানতে চাইছিলাম, কেন শুক্রবার বোর্ড বসালেন এবং কুশল বরণের মত একজনকে বোর্ডে ডাকলেন। তারা বিভিন্ন অজুহাত দেবার চেষ্টা করেন। এসময় কুশল বরণ হাজির হন ভিসি স্যারের রুমে।”
আবু নাসিম বলেন, “তখন আমরা ক্ষুব্ধ হই। কক্ষে ভিসি-প্রোভিসি থাকাকালে তিনি কীভাবে ভিসির রুমে ঢোকেন? এরপর আমাদের শিক্ষার্থীদেরই একপক্ষ উনাকে সেইভ করে অন্য রুমে নিয়ে যায়। তিনি সেখানেই ছিলেন।
“এরপর আমরা নিচে নেমে যাই। আরো দেড় ঘণ্টা পর আমরা ফটকে তালা দিই। পরে ভিসি স্যার প্রতিনিধি পাঠিয়ে আমাদের সাথে আলোচনা করেন। প্রশাসন আশ্বাস দেয় যে এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।”
গত বছরের ৪ অগাস্ট বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সে সময়ের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে একটি মৌন মিছিল হয়েছিল জানিয়ে আবু নাসিম বলেন, “যারা ওই মিছিলে অংশ নেয় এবং যারা স্বৈরাচারের দোসর তাদের সবার বিরুদ্ধে ৩৬ জুলাইয়ের মধ্যে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে, এটা ছিল আজ আমাদের অন্যতম দাবি। প্রশাসন সে বিষয়ে আশ্বাস দেওয়ায় আমরা আজ আন্দোলন শেষ করেছি।”
বিকালে আন্দোলনকারীদের অবস্থান কর্মসূচিতে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম আহ্বায়ক খান তালাত মাহমুদ রাফিকেও দেখা গেছে।
জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কুশল বরণ চক্রবর্তীর নামে কিছু ঘটনা উঠে আসে এবং ছাত্রদের দাবির মুখে আজকের পদোন্নতি বোর্ড স্থগিত করা হয়েছে।”
ঘটনার বিষয়ে জানতে উপাচার্য মুহাম্মদ ইয়াহিয়া আখতার এবং উপ-উপাচার্য (অ্যাকাডেমিক) মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের মোবাইলে বেশ কয়েকবার ফোন করা হলেও তারা ধরেননি।#