Published : 06 Jul 2025, 09:51 PM
দ্রুত ‘লাভজনক’ ইউক্যালিপ্টাস, আকাশমনির মতন বিদেশি গাছে যখন ছেয়ে গেছে চারপাশ, তখন দেশি গাছে ক্যাম্পাস সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ক্যাম্পাসের গাছপালা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা আরবরি কালচার বলছে, সম্প্রতি তারা বিভিন্ন প্রজাতির তিন সহস্রাধিক দেশি গাছ বিতরণ করেছে। যার মধ্যে রয়েছে- শাল, লটকন, বট, পাকুড়, ডুমুর, আম, জাম, শিমুল, পলাশ, হিজল, ছাতিম, কদম, শাল, তাল, তেঁতুল, অর্জুন, জারুল, জলপাই, নিম, আমলকি, কৃষ্ণচূড়া, শীলকড়ই, ঝাউ, হরিতকি, বহেড়া, গর্জন প্রভৃতি। বিভিন্ন হল ও আবাসিক এলাকায় রোপণের জন্য বিলি করা হয়েছে এসব গাছ।
গবেষণা কেন্দ্র আরবরি কালচারের পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলছেন, ক্যাম্পাসে বিদেশি গাছের ভিড়ে দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে দেশি গাছ। আর তাতে নষ্ট হচ্ছে বাস্তুতন্ত্র। অথচ একসময় ঢাকা শহরে শালবন ছিল, যেখানে ৯০ শতাংশ গাছই ছিল শাল।
“তার বাইরে অন্তত ১০০ প্রজাতির দেশীয় বৃক্ষ ছিল- যেগুলো কোনোটা ফুলের জন্য, কোনোটা ফলের জন্য, কোনোটা ওষুধের জন্য কিংবা কোনোটা বন্যপ্রাণীর জন্য। কোনোটা পরিবেশের জন্য উপযুক্ত। সেই গাছগুলো আমাদের এখানে আর নাই।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জীববৈচিত্র্যপূর্ণ ও পরিবেশবান্ধব করতে বিলুপ্তির পথে রয়েছে- এমন গাছও রোপণ করা হচ্ছে বলে জানান অধ্যাপক জসীম।
ক্যাম্পাসে চলমান এক শুমারির তথ্য দিয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখানে দু-এক প্রজাতির দেশি গাছ ছাড়া বাকি সব বিদেশি গাছে ভরা। এমনকি আমরা ঢাকা শহরেও দেখেছি রাস্তার ধারে সব বিদেশি গাছ।

“আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে রোপণ করতে ঢাকার নার্সারিগুলোতে গেলেও দেখি- সেখানেও দেশি গাছ খুব একটা নাই। তাই দেশি গাছগুলো বিভিন্ন জায়গা থেকে সংরক্ষণ করে এনে আমরা এখানে রোপণ করছি, যাতে মানুষ আমাদের দেখে উদ্বুদ্ধ হয়।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ সংসদের সভাপতি রাশেদুজ্জামান রাশেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা দেখেছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পাখি আসে না। কীটপতঙ্গের তেমন একটা আবাস নেই। তার কারণ হচ্ছে এসব বিদেশি গাছ। এগুলোতে পাখি আসেও না।
“কেননা তাদের খাবার নেই সেখানে। তাই সেখানে দেশি গাছ প্রতিস্থাপন করে সেই জীববৈচিত্র্যময় পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে যে উদ্যোগ, সেটাকে সাধুবাদ জানাই।”
রাশেদ জানান, আরবরি কালচারের দেওয়া গাছ ধারাবাহিকভাবে রোপণ করা হচ্ছে। রোববারই রোপণ করা হয়েছে ছয়শ গাছ।
‘আগ্রাসী’ গাছে কী ক্ষতি
পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি গাছের চারা রোপণ ও বিক্রি সম্প্রতি নিষিদ্ধ করেছে সরকার।
পরিবেশ মন্ত্রণালয় বলছে, এ গাছ দুটি মাটি থেকে অনেক বেশি পানি শোষণ করে, ফলে মাটির আর্দ্রতা কমে যায় এবং শুষ্ক বা মৌসুমী জলবায়ুর এলাকায় এটি মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়।
এই গাছের পাতায় থাকা বিষ গোড়ায় পড়ে মাটিকে বিষাক্ত করে তোলে, যার ফলে উর্বরতা নষ্ট হয়, চারপাশে অন্য কোনো গাছ সহজে জন্মাতে পারে না।
এই ‘আগ্রাসী’ প্রজাতির গাছের চারা রোপণের পরিবর্তে দেশি প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ওষুধি গাছের চারা রোপণের পরামর্শ দিয়েছে সরকার।
আর রেইনট্রি গাছের বিষয়ে অধ্যাপক জসীম উদ্দিন বলছেন, “এই গাছ যেখানে জন্মাবে, সেখানকার মাটিও নষ্ট হয়। কারণ রেইনট্রির পাতায় এমন একটা বিষ থাকে, যা ওই স্থানের মাটিতে অন্য কোনো গাছ জন্মাতে দেয় না।
“আর পুকুরে হলে এ গাছের পাতা পুকুরের মাছ সব মেরে ফেলে। অথচ এ গাছগুলোই আমাদের চারপাশ দখল করে আছে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে অন্তত ১০০টি রেইনট্রি আছে, যার মধ্যে মল চত্বর এলাকায় আছে দুটি বৃহদকার গাছ। এসব গাছের নিচে কোনো দেশি গাছ বা গুল্ম জন্মাতে পারছে না বলে জানিয়েছেন আরবরি কালচারের পরিচালক।
অধ্যাপক জসীম বলেন, “এ গাছগুলো পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। এ গাছগুলোতে কোনো পশুপাখি বসে না। যার ফলে এসব গাছ না দেয় ফল, না দেয় ফুল; বরং বাস্তুতন্ত্র নষ্ট করে। এভাবে চলতে থাকলে দেশি প্রজাতির গাছ একসময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। শুধু তাই না, এ অঞ্চলে মানুষের বসবাসও বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।”
বাস্তুতন্ত্রকে বাঁচাতে তাই দেশি গাছ লাগানোর পরামর্শ দিচ্ছেন উদ্ভিদবিজ্ঞানের শিক্ষক জসীম উদ্দিন।
“এসব দেশীয় গাছ যদি আমরা বেশি বেশি রোপণ করি, তাহলে ধীরে ধীরে বিদেশি গাছের যে ছড়াছড়ি তা কমে আসবে। আমাদের বাস্তুতন্ত্রও স্বাভাবিক অবস্থানে চলে আসলে বিদেশি গাছের দিকে মানুষ আর ধাবিত হবে না।”

ক্ষতিকর গাছ বাড়ার কারণ কী
তাড়াতাড়ি ছায়া ও কাঠ পাওয়ার আশায় দ্রুত বর্ধনশীল বিদেশি গাছে মানুষ ঝুঁকছে বলে মনে করেন অধ্যাপক জসীম উদ্দিন।
তার ভাষ্য, “আমাদের আসবাবপত্র, লাকড়ির জন্য বিদেশি গাছের একটা চাহিদা আছে; সেটা মেটাতেই মানুষ বিদেশি গাছগুলো রোপণ করা শুরু করে। কিন্তু এতে যে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে তা মানুষ জানলে তা করত না।
“তবে এটার ক্ষেত্রে আমি মনে করি, বিদেশি গাছও থাকা উচিত; তবে ঢাকার বাইরে। কারণ ঢাকায় তো আর কেউ আসবাবপত্র বা লাকড়ির জন্য বৃক্ষ রোপণ করে না। তাই ঢাকাকে অন্তত বিদেশি গাছ থেকে বাঁচাতে দেশীয় বৃক্ষ রোপণ করা উচিত।”
স্থানীয় জলবায়ু ও মাটির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে দেশি গাছের যে স্বাভাবিক সামর্থ্য রয়েছে তা বিদেশি গাছে দেখা যায় না বলে জানান অধ্যাপক জসীম।
তিনি বলেন, দেশি গাছ যেমন- বট, অশ্বত্থ, জাম, কাঁঠাল কিংবা নিম গাছ কেবল ছায়া বা ফল দেয় না, একইসঙ্গে তা মাটির ক্ষয়রোধ করে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধরে রাখতে সাহায্য করে এবং পাখি-পতঙ্গসহ নানা বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে। দীর্ঘদিন ধরে এসব গাছ স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সহাবস্থান করে এসেছে।
“এ গাছগুলো যথাযথ পরিচর্যা করা হলে আরও বিদেশি গাছের চেয়ে আরও বেশি ফলন ও টেকসইপূর্ণ হবে। তবে তার জন্য পরিচর্যার বিকল্প নাই। কিন্তু পরিচর্যা না করলে দেশি গাছ টিকানো প্রায় অসম্ভব।”

ভরসা দেশি গাছেই
ইউক্যালিপটাসের মতন বিদেশি গাছ অল্প সময়ে বড় হলেও বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে এমন গাছ থেকে মুখ ফেরানো দরকার বলে মনে করেন অধ্যাপক জসীম উদ্দিন।
তিনি বলেন, “বিদেশি গাছে কোনো পশুপাখি যায় না। দ্বিতীয়ত, এসব গাছ ফলও দেয় না। তাই একদিকে মানুষ বা অন্য প্রাণীদের কোনো কাজে আসে না; বরং ইকোসিস্টেম নষ্ট করে।” অধ্যাপক জসীম বলেন, আমেরিকায় দেশীয় গাছের বাইরে অন্য কোনো গাছ দেখলে তারা উপড়ে ফেলে। কারণ তারা জানে- সেটার প্রভাব খারাপ।
“কিন্তু আমরা এসব গাছগুলো রোপণ করে আরও দেশকে ধ্বংস করছি। আমি ২০১০ সাল থেকে দেশি গাছের জন্য বিগত সরকারকে জানিয়েছি, কিন্তু তারা আমলে নেয়নি। কিন্তু এখন যেহেতু সুযোগ পেয়েছি দেশের জন্য কাজ করার, তাই দেশীয় প্রজাতির গাছ রক্ষায় জুলাই আন্দোলনের পর আমরা বিভিন্ন কর্মসূচি শুরু করেছি। ইতোমধ্যেই আমরা তিন হাজার গাছ লাগিয়েছি। পাশাপাশি আরও বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় গাছ সংরক্ষণের চেষ্টা করছি।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী বলেন, “বিদেশি কিছু আগ্রাসী প্রজাতির গাছের গোড়ায় দেশি গাছ প্রতিস্থাপনের উদ্যোগটা অবশ্যই ভালো ও প্রশংসনীয়। কারণ গাছ না কেটে সেখানকার মাটি বিবেচনা করে যেসব দেশি গাছ লাগানো হচ্ছে তা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পরিবেশকে আরও সুন্দর ও জীববৈচিত্র্যপূর্ণ করে তুলবে।
“বিদেশি গাছে পাখি আসেও না; বাসাও বানায় না। ফলে জীববৈচিত্র্য থাকে না। সেখানে পরিবেশবান্ধব ও আমাদের দেশীয় গাছ লাগানো অবশ্যই তো ভালো উদ্যোগ। তবে সেটা পরিচর্যা করলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাবে।”
পরিচর্যার বিষয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “গাছ পরিচর্যার ক্ষেত্রে কিছু কৌশল রয়েছে। সেটা হচ্ছে, মাটির সাথে খাপ খায়- এমন গাছ রোপণ করা; গাছগুলোকে যথাযথ ট্রিমিং করা।
“কোনো গাছ মাটির সাথে খাপ-খাওয়াতে না পারলে সেটা তুলে নিয়ে আরেকটা খাপ খায়- এরকম গাছ লাগালে গাছগুলো দ্রুত বর্ধন হবে। তবে সেটা দীর্ঘমেয়াদি করতে পারলে আশা করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একদম পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠবে।”