মহামারীতে চাকরি হারানো রাসেলরা যেভাবে ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন

মহামারীতে কর্মহীন মানুষদের হাতে-কলমে কারিগরি ও হাতের কাজের প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইউসেপ বাংলাদেশ, তাতে সহযোগিতা করছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক।

ফয়সাল আতিকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 11 Nov 2022, 05:32 AM
Updated : 11 Nov 2022, 05:32 AM

ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি ওয়ার্কশপে কাজ করছিলেন রাসেল মিয়া, কিন্তু কোভিড মহামারী শুরু হলে অন্যদের সঙ্গে তারও চাকরি চলে যায়; পরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কারিগরী প্রশিক্ষণ নিয়ে চাকরিতে ফিরেছেন তিনি।

রাসেল যেখানে কাজ করতেন, সিলেটের সেই মেঘলা মোটরসেই পুনরায় চাকরি পেয়েছেন। আগের চেয়ে বেতনও এবার বেশি। ফলে উচ্ছ্বাসের কমতি নেই তার চোখে-মুখে।

সম্প্রতি সিলেটে ‘আন্ডারপ্রিভিলেজড চিলড্রেনস এডুকেশনাল প্রোগ্রামস’ বা ইউসেপের একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে কথা হয় রাসেলের সঙ্গে।

তিনি জানান, কোভিডের কারণে পাঁচ হাজার টাকা বেতনের চাকরিটি তাকে ছাড়তে হয়েছিল। এক বছর পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে ওয়ার্কশপটি আবার কর্মচঞ্চল হয়। তবে তখনও তার কাজে ফেরার সুযোগ হয়নি। একসময় নয়জন কর্মী থাকলেও রাসেলসহ চারজনকে বাদ দিয়েই চলছিল ওয়ার্কশপটি।

“দুই বছরের বেশি সময় কর্মহীন থাকার পর একটি সুযোগ আসে। ইউসেপ বাংলাদেশে একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর মাসে আট হাজার টাকায় ফিরে পাই আগের  চাকরি।”

রাসেল বলেন, “এদিক সেদিক ঘুরে-ফিরে বেশ কষ্টে সময় কাটিয়েছি। অবশেষে গত জুনে ইউসেপে একটি প্রশিক্ষণ কোর্সের কথা শুনে সেখানে যুক্ত হই। এক মাসের উচ্চতর কারিগরি প্রশিক্ষণ শেষে আবার সেই মেঘলা মোটরসেই চাকরি পেয়ে যাই। এবার বেতন বেড়ে হয় প্রতি মাসে আট হাজার টাকা।”

গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের এক জরিপে দেখা যায়, মহামারীর শুরুর দিকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন এমন ৫৭ শতাংশ মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছিলেন। ৩২ শতাংশ মানুষের আয় কমে গিয়েছিল। আর প্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন এমন ১৩ শতাংশ মানুষ চাকরি হারিয়েছিলেন।

সম্প্রতি সিলেটে ইউসেপের প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দেখা যায়, সেখানে কর্মহীন মানুষদের হাতে-কলমে সেলাইয়ের কাজ, ইলেক্ট্রনিক্স ও ইলেক্ট্রিক্যাল প্রকৌশল, অটোমোবাইল সার্ভিসিং, ওয়েল্ডিংসহ বিভিন্ন ধরনের কারিগরী প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। কয়েকটি শিফটে ভাগ হয়ে ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারী ও পুরুষেরা সেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।

ইউসেপের সিলেট অঞ্চলের ভারপ্রাপ্ত আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ কাইয়ুম মোল্লা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, মহামারীর কারণে কর্মহীনদের জন্য একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছেন তারা। বেসরকারি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের আর্থিক সহযোগিতায় ইতোমধ্যে রাজশাহী-রংপুর অঞ্চলে প্রথম ধাপে ৩০০ জন, খুলনা অঞ্চলে ৫০০ জনকে প্রশিক্ষণ ও চাকরিতে যুক্ত করা হয়েছে। তৃতীয় পর্যায়ে এসব এলাকায় আরও ৮০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

চতুর্থ পর্যায়ে সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ এলাকায় মহামারী ও বন্যার কারণে কর্মহীন ৫০০ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়ে চাকরিতে যুক্ত করার কাজ চলছে। প্রশিক্ষণকালে ২০ কেজি করে মোট চার বার তাদের খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে কাইয়ুম জানালেন।

সিলেটের খাদিমনগর এলাকায় বিসিক শিল্পনগরীতে গিয়ে দেখা যায়, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক ও ইউসেপের যৌথ উদ্যোগে চালু হওয়া কর্মমুখী প্রশিক্ষণ নিয়ে বেশকিছু নারী-পুরুষ সানটেক এনার্জি লিমিটেড নামে একটি ব্যাটারি তৈরির কারখানায় কাজ করছেন। প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর এসব শ্রমিকদের বেতনও এক থেকে দুই হাজার টাকা বেড়েছে।

সানটেক এনার্জির কর্মী নাগির্স আক্তার, জলি বেগম, সাহাজুল ইসলাম, জুবেদ আহমদ, জাহাঙ্গীর আলম, মো. সুমন আহমদও চাকরি হারানোর পর রাসেলের মত ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।

জলি বেগম বলেন, “এক সময় আমরা এই কারখানায় মাসে ছয় হাজার টাকা বেতনে কাজ করতাম। মাঝে করোনার সময় আমাদেরকে চাকরি ছাড়তে হয়েছিল। গত জুনে খবর পেয়ে ইউসেপের একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে ভর্তি হই। সেই কোর্স শেষে করার পর আবারও চাকরির সুযোগ পেয়েছি। বেতনও দেড় হাজার টাকা বেড়েছে।”

ইউসেপের কর্মকর্তা কাইয়ুম মোল্লা বলেন, যেসব কারিগরি কাজের নিশ্চিত চাকরি রয়েছে, সেগুলোর ওপরই তারা প্রশিক্ষণ দেন।

“উদ্যোক্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমরা প্রশিক্ষণার্থীদের চাকরি নিশ্চিত করে থাকি। এবার কোভিডে কর্মহীনদের আবারও চাকরিতে যুক্ত করার এই প্রকল্পে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে এসেছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক।”

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের কান্ট্রি হেড বিটপী দাশ চৌধুরী বলেন, “ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসাবে অভাবী মানুষদের এককালীন আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিবর্তে এ ধরনের প্রকল্পে যুক্ত করতে আমরা বেশি আগ্রহী। এর ফলে মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে।

“এককালীন টাকা দিয়ে বিশেষ প্রয়োজনে মানুষ সেটা খরচ করে আবারও অন্যের দ্বারস্থ হতে পারে। তার চেয়ে বরং আমরা এমন কিছু টেকসই উদ্ভাবনে যুক্ত হতে চাই, যা ব্যক্তিকে সফল ও স্বচ্ছল হতে সহায়তা করবে। দীর্ঘদিন ধরে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক এই কৌশল অনুসরণ করে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতার কাজগুলো করে আসছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক