সরকারের বাড়ানো দামেও মিলছে না এলপিজি, সংকট কোথায়?
বাজারে অস্থিতিশীলতার জন্য বিভিন্ন কোম্পানির সিলিন্ডারের দামে পার্থক্য থাকাকেও দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা।
সরকার দাম বাড়িয়ে সমন্বয় করার আগে রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস-এলজিপি সিলিন্ডারের সংকট চলছিল। কিন্তু নতুন দর নির্ধারণের পরও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
সংকটের সময় ভোক্তাকে যে বাড়তি দামে এলপিজি কিনতে হয়েছে, এখনো সেই দামেই কিনতে হচ্ছে।
বুধবার মিরপুরের পাইকপাড়ার একজন বাসিন্দা বলেন, স্থানীয় একজন খুচরা বিক্রেতার কাছে সিলিন্ডার কিনতে গেলে তার কাছে ২ হাজার ৪০০ টাকা চাওয়া হয়।
সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে এত বেশি কেন, জানতে চাইলে ওই বিক্রেতা তাকে বলেন, তাদের কেনাই পড়ে ২ হাজার ৩০০ টাকা।
সরবরাহ সংকটের মধ্যে দাম বাড়ালেও সেই দামে কেন মিলছে না এলপি গ্যাস? তাহলে সংকট কোথায়, এমন প্রশ্ন সামনে আসছে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) দাবি করেছে, দেশে এলপিজির আমদানি পর্যাপ্ত। যে অপারেটর, পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছে লোয়াব।
লোয়াবের ভাষ্য, দেশে এলপিজির আমদানি ও সরবরাহ পরিস্থিতি ‘সন্তোষজনক’। সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে, যা অগাস্টের ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টনের কাছাকাছি।
এ সরবরাহ দেশের চাহিদার তুলনায় ‘যথেষ্ট’ বলে মনে করছে লোয়াব। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির সুযোগ নেই বলেও সংগঠনটি দাবি করেছে।
প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি ও সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগের মধ্যে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর অভিযান শুরু করে।
এরপর গেল রোববার বিইআরসি রান্নার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক লাফে ২৫২ টাকা বাড়িয়ে অক্টোবরের জন্য নতুন দর ঘোষণা করে। ১৫৮৫ টাকার সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয় ১৮৩৭ টাকা।
সংকটের মধ্যে মূল্যবৃদ্ধি
গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। ফলে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়। এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে হতে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি হয়ে যায়।
এ সময়ে এলপিজি সিলিন্ডারের দর বাড়তে শুরু করে। ফলে আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস সংকটের সমাধান হলেও সিলিন্ডারের ভোক্তাদের বাড়তি দামে কিনতে হয়। সরবরাহ সংকটও দেখা দেয়।
এর মধ্যে ২০ সেপ্টেম্বর সরকার জ্বালানি তেলের দাম এক লাফে লিটার প্রতি ২০ টাকা বাড়ায়।
অন্যদিকে, এলপিজির দর বৃদ্ধির দাবি নিয়ে এ খাতের ব্যবসায়ীরা সরকারের সঙ্গে বৈঠক করেন।
তারপরই এলপিজির দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসে। কিন্তু ভোক্তা পর্যায়ে দাম আরও বেশি।
রাজধানীর স্বামীবাগ এলাকার খুচরা বিক্রেতা মেসার্স বাপ্পি এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী নূর হোসেন বাপ্পি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সিলিন্ডার বেশি দামে কেনা। কোম্পানির ডিলারকে আগে টাকা দিয়ে রাখি। তারপরও সিলিন্ডার দেয় না।”
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, ছয়টি কোম্পানির মধ্যে দুটির সিলিন্ডার বেশিরভাগ দোকানেই নেই।
পরিবেশকরা বলছেন, কয়েক সপ্তাহ ধরেই ওই কোম্পানি দুটি সিলিন্ডার দিচ্ছে না। কোনো অর্ডারও নিচ্ছে না।
দেশে এলপিজির গ্রাহক আছেন প্রায় ১ কোটি। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশই গৃহস্থালীর রান্নার কাজে এ গ্যাস ব্যবহার করেন।
দাম নিয়ে যা বলছেন ব্যবসায়ীরা
পরিবেশকদের সংগঠন এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেডের কোষাধক্ষ আবু তাহের কোরাইশী বলছেন, দাম বাড়ানোর পরের দিন সোমবার (৫ অক্টোবর) কোম্পানি যে সিলিন্ডার সরবরাহ করার কথা ছিল, তার অর্থ আগেই জমা দিয়েছেন তারা। কিন্তু এখন কোম্পানিগুলো শুধু সে দিনের জন্যই নয়, চলতি মাসের প্রথম দিন থেকেই সরবরাহ করা সিলিন্ডারের জন্যও নতুন দর চেয়েছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, সব কোম্পানির সিলিন্ডার কিন্তু বাজারে নেই। যে কোম্পানির সরবরাহ আছে তাদের খালি হওয়া সিলিন্ডার গ্রাহকদের কাছ থেকে নিয়ে সে কোম্পানির সিলিন্ডার দেওয়া যায়। কিন্তু অন্য কোম্পানির সিলিন্ডার দেওয়া যায় না। অন্য কোম্পানির নিতে গেলে সিলিন্ডারসহ গ্যাস নতুন করে কিনতে হবে।
সরকারি দরের চেয়ে বেশি অর্থ পরিবেশকদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে না বলে দাবি করেছেন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “আমরা তো সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে করি। ডিলারদের তো ব্যাংক রিসিটের মাধ্যমে সিলিন্ডার দেওয়া হচ্ছে। এখন কারা বেশি নিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিক সরকার। আমরা যদি বেশি নিই তাহলে আমাদের শাস্তি দিলে মেনে নেব।”
তাহলে বাজারে সিলিন্ডার সরবরাহ কেন বাড়ছে না? জবাবে আমিরুল হক বলেন, “স্বাভাবিক সরবরাহ করছে কোম্পানিগুলো। আগের মতোই ডিলারকে সিলিন্ডার দেওয়া হচ্ছে।”
বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়ে তিনি বলেন, পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের ওপর কোম্পানির কোনো হাত নেই।
লোয়াবের সভাতি বলেন, “কেউ চাইলেই তো ওষুধ নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি বিক্রি করতে পারে না। তাহলে সিলিন্ডার কেন বেশি দামে বিক্রি হবে। যারা বেশি দামে বিক্রি করছে তাদের ধরতে সরকারের সঙ্গে আছি আমরা।”
তবে লোয়াবের ভাইস-চেয়ারম্যান ও এনার্জি প্যাক পাওয়ার জেনারেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন রশিদ মনে করেন, চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার সংকটের কারণ এলপিজি আমাদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমে যাওয়া।
দেশে এলপিজি আমদানি করে এখন মাত্র ছয়টি কোম্পানি, আগে আরও বেশি ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, “এলপিজি আমাদানিকারকের সংখ্যা বাড়াতে হবে। বেশি আমদানি হলে প্রতিযোগিতার বাজারে দাম তখন আরও সাশ্রয়ী হবে।”
বাড়তি দাম চান ব্যবসায়ীরা
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি বাড়তি দামে এলপিজি বিক্রির বিষয়ে বিইআরসিকে একটি চিঠি দিয়েছে।
মঙ্গলবার দেওয়া ওই চিঠিতে বলা হয়, বিইআরসি দাম সমন্বয়ের দিন সন্ধ্যা থেকে এলপিজি কোম্পানিগুলো নতুন মূল্যতালিকা দিয়েছে, তাতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা দাম বেঁধে দিয়েছে তারা।
পরিবেশকরা বলছেন, এর মধ্যে বেড়েছে জ্বালানি তেলের দাম। আনুষঙ্গিক খরচও বেড়েছে। ফলে সরকার নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
সিলিন্ডারপ্রতি খরচের হিসাব দিয়ে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি বলেছে, কোম্পানি থেকে পরিবেশকের গুদাম পর্যন্ত নিতে ভাড়া লাগে ৫০ টাকা। গাড়িতে ওঠানো-নামানো এবং খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছাতে ভাড়া মিলিয়ে আরও ৩৫ টাকা লাগে। কর্মচারীর খরচ, গুদাম ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, লাইসেন্স ফি ও অন্য খরচ ২৫ টাকা ধরেছেন তারা।
পরিবেশকদের মুনাফা ৪০ টাকা ধরে মোট ১৫০ টাকার হিসাব দিয়ে সমিতি বলেছে, বিইআরসি তাদের গেল পাঁচ বছর ধরে ৫০ টাকা কমিশন দিয়ে আসছে। বর্তমান সময়ে তুলনায় ঘাটতি থাকছে ১০০ টাকা।
এছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির দামে পার্থক্য থাকায় বাজারে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে।
এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি তাদের এ চিঠি জ্বালানি ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সব জেলার ডিসিকে দিয়েছে।
এলপিজির চলমান সংকট ও তাদের দাবি নিয়ে বৃহস্পতিবার সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতারা তাদের জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
ব্যবসায়ীদের সমিতির কোষাধ্যক্ষ কোরাইশী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তাদের কমিশন বাড়ানোর দাবিতে সোমবার সংগঠনের পক্ষ থেকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সে দিন সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।
সিমেন্টের দোকানেও সিলিন্ডার বিক্রি?
সরকারের বেঁধে দেওয়া দামে সিলিন্ডার না পাওয়ার মধ্যে বাজারে এলপি গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ও নির্ধারিত দামে বিক্রি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি না হলে সরকার ব্যবস্থা নেবে।
এর আগেই এলপি গ্যাসের দাম সমন্বয়ের দিন রোববার থেকে বাজারে অভিযান জোরদার করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। সেপ্টেম্বরেই তাদের এ অভিযান শুরু হয়েছিল।
কিন্তু অভিযানের মধ্যেই রাজধানীতে মোবাইল ফোন রিচার্জ করার দোকান, সিমেন্ট ও হার্ডওয়্যারের দোকানের পাশাপাশি মুদি দোকানিরাও ৫-৬টা করে সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রিতে নেমেছেন।
বুধবার রামপুরা কাঁচাবাজারে মোবাইল রিচার্জের দোকান কাজল টেলিকমে দেখা গেছে বিভিন্ন কোম্পানির ছয়টি সিলিন্ডার।
দোকানটির স্বত্বাধিকারী আবু বকর সিদ্দিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যে কোম্পানিরই নেন, এক দাম ২ হাজার ৩০০ টাকা। এর কমে দিতে পারব না। বোতল (সিলিন্ডার) নাই, ডিলারও দিতাছে না। এগুলো আগের কেনা।”
মোবাইল রিচার্জের দোকানে সিলিন্ডার গ্যাস কেন বিক্রি করছেন, এ প্রশ্নের জবাব দেননি তিনি।
এ দোকান থেকে কিছুটা দূরেই এলপি গ্যাসের খুচরা বিক্রেতা শিহাব এন্টারপ্রাইজ। এর স্বত্বাধিকারী হাসানুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের ব্যবসা সিলিন্ডারের। এখন দ্যাহেন লোড ব্যবসায়ীও বিক্রি করতাছে। কয়ডা বোতল (সিলিন্ডার) আইনা রাখছে।”
কিন্তু সরকারি দামের চেয়ে সিলিন্ডারের দাম বেশি কেন, জানতে চাইলে তিনি বলেন, “গাড়ি ভাড়া বেশি। আর আমরা বেশি টাকা দিয়ে আনি।”
কাকে বেশি টাকা দেন? জবাব দেননি হাসানুজ্জামান।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক সড়কে একটি সিমেন্টের দোকানেও গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি করতে দেখা যায়।
দোকানের কর্মচারী শাহাদাত হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন তো সংকট। মালিকেরও সিলিন্ডার লাগে। দোকানে জায়গা পড়ে আছে, তাই ‘সাইড ব্যবসা’ চালু করছেন তিনি।”
সহজেই দাহ্য হওয়ায় গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রিতে সরকারি কয়েকটি দপ্তর থেকে লাইসেন্স নেওয়া বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর।
