৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩

এলপিজি অপারেটরদের ‘মাফিয়া’ বলা নিয়ে বিইআরসির গণশুনানিতে বিতণ্ডা

এলপিজি সংকট ও চড়া দাম নিয়ে গণশুনানিতে আমদানিকারক, অপারেটর, পরিবেশক ও ডিলারদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।

এলপিজি অপারেটরদের ‘মাফিয়া’ বলা নিয়ে বিইআরসির গণশুনানিতে বিতণ্ডা

রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার এলপিজি নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 30 Oct 2026, 01:31 AM

Updated : 30 Oct 2026, 01:44 AM

দেশে এলপিজি সংকটের জন্য আমদানিকারক ও বোতলজাতকারী কোম্পানিগুলোকে দায়ী করে পরিবেশক ও ডিলাররা ঠিকমতো গ্যাস সিলিন্ডার সরবরাহের নিশ্চয়তা চেয়েছেন। তা না হলে সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম তাদের পক্ষে রক্ষা করা কঠিন হবে বলে সতর্ক করেছেন তারা।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম নির্ধারণ নিয়ে আয়োজিত গণশুনানিতে এসব কথা বলেন ব্যবসায়ীরা।

রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে এ গণশুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এতে এলপিজি গ্যাস আমদানিকারক, বোতলজাতকারী, ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলার ও অটোগ্যাস স্টেশনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সেখানে বিভিন্ন দাবি ও অভিযোগ নিয়ে একাধিকবার উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়।

অক্টোবর মাসে ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১৮৩৭ টাকা করা হয়। তবে দেশের প্রায় কোথাও এ দামে এলপিজি কিনতে পারছেন না ভোক্তারা। ১২ কেজির সিলিন্ডার ২৩০০ টাকার নিচে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও ২৬০০ টাকা দিতে হচ্ছে।

দাম বাড়ানোর আগে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে বাজারে এলপিজি সরবরাহ সংকট দেয়। ৪ অক্টোবর দাম বাড়ানোর হলেও এলপিজির বাজারে অস্থিরতা চলছেই।

এলপিজি অপারেটর কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিরা বলেন, গত ডিসেম্বর থেকে বৈশ্বিক বাজারে সংকট চলছে। আগে পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে এলপিজির বড় অংশ এলেও এখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি বাড়াতে হয়েছে। এতে জাহাজভাড়াসহ আমদানি ব্যয় বেড়েছে।

Image

রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার এলপিজি নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

কার্গো জাহাজের সংকটের কারণে চাহিদামতো এলপিজি আমদানি করা যাচ্ছে না বলেও দাবি তাদের। এতে অনেক পরিবেশক চাহিদামতো গ্যাস পাচ্ছেন না এবং বাজারে বিপুলসংখ্যক সিলিন্ডার অব্যবহৃত পড়ে আছে।

তবে দিনভর শুনানি শেষে আরও তথ্য সংগ্রহ করে এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণের কথা জানায় বিইআরসি।

‘মাফিয়া’ বলায় বিতণ্ডা

শুনানিতে ডিলার ও পরিবেশকরা অভিযোগ করেন, বড় আমদানিকারক কোম্পানিগুলো তাদের জিম্মি করে রেখেছে।

একপর্যায়ে ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সদস্য শাহ আলম সরকার আমদানিকারক কোম্পানিগুলোকে ‘মাফিয়া’ বলে সম্বোধন করেন।

তখন শুনানিতে সভাপতিত্বকারী বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ তাকে ওই শব্দ ব্যবহার না করতে বলেন। সেসময় হট্টগোল শুরু হয়ে যায়।

শাহ আলম বলেন, “আমরা জিম্মি হয়ে গেছি। অপারেটর মাফিয়ারা আমাদের জিম্মি করে রাখছে।”

Image

রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে বৃহস্পতিবার এলপিজি নিয়ে গণশুনানির আয়োজন করে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

চেয়ারম্যান তাকে থামিয়ে বলেন, “আপনি অফিসিয়ালি মাফিয়া শব্দটা ব্যবহার করতে পারেন না। আপনি যেমন স্টেকহোল্ডার, ওনারাও স্টেকহোল্ডার। আপনি যখন অভিযোগ করবেন, ফ্যাকচুয়াল অভিযোগ করবেন।”

এরপর কয়েকজন ডিলার ও পরিবেশক একযোগে কথা বলতে শুরু করলে হট্টগোল হয়। তারা বলেন, “মাফিয়াকে মাফিয়া বলব না তো কী বলব?”

চেয়ারম্যান তখন বলেন, “অভিযোগ থাকলে আপনারা সেটা বলেন। এখানে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হবে।”

অপারেটরদের যুক্তি

এসময় শুনানিতে অংশ নিতে বক্তব্য দিতে আসেন মেঘনা ফ্রেশ এলপিজির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা।

অন্যান্য ব্যবসায়ীর আক্রমণে কিছুটা ক্ষুব্ধ রাজা বলেন, বাংলাদেশের এলপিজি বাজার বিশ্বের অন্যতম প্রতিযোগিতামূলক বাজার।

তার ভাষায়, দেশে এলপিজির ৫৭টি লাইসেন্স দেওয়া হলেও বর্তমানে ২৩টি কোম্পানি সক্রিয়ভাবে ব্যবসা করছে। এর মধ্যে গত মাসে সাতটি এবং তার আগের মাসে ১০টি কোম্পানি এলপিজি আমদানি করেছে।

তিনি বলেন, ডিসেম্বর থেকে বাজারে যে অস্থিরতা চলছে, তার আগে কোম্পানিগুলোর মধ্যে ‘প্রাইস ওয়্যার’ চলেছে। এতে অনেক কোম্পানি আমদানির সক্ষমতা হারিয়েছে।

তার বক্তব্যের মধ্যে ডিস্ট্রিবিউটররা পাল্টা প্রশ্ন তোলেন, কেন কোম্পানিগুলো এমন পরিস্থিতিতে পড়েছে।

ডিস্ট্রিবিউটর আবু তাহের বলেন, একসময় ২ হাজার টাকার সিলিন্ডার ৫০০ টাকায় দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি সিলিন্ডার বাজারে আসায় এখন সেগুলোর বড় অংশ অলস পড়ে আছে।

আরেক ডিলার বলেন, কম দামে সিলিন্ডার দেওয়ার প্রতিযোগিতায় কোম্পানিগুলোই পুঁজি হারিয়েছে।

আবু সাঈদ রাজা বলেন, “এই পাঁচশ টাকায় সিলিন্ডার দেওয়াতেই বাংলাদেশে খুব অল্প সময়ের মধ্যে এক কোটি ২০ লাখ এলপিজি গ্রাহক তৈরি হয়েছে।”

কার্গো জাহাজ না পাওয়ায় চাহিদামতো গ্যাস আমদানি করা যাচ্ছে না দাবি করে তিনি বলেন, এ কারণে ডিস্ট্রিবিউটরদেরও চাহিদামতো গ্যাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এসময় আবার হট্টগোল শুরু করেন পরিবেশক ও ডিলাররা।

নির্ধারিত দামে বিক্রি নিয়ে প্রশ্ন

শুনানিতে এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, বিইআরসি যে দামই নির্ধারণ করুক, এর আগে ভোক্তাদের তার চেয়ে কয়েকশ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে। এবার নির্ধারিত দামে বিক্রির নিশ্চয়তা কী?

জবাবে ফ্রেশ এলপিজির কর্মকর্তা আবু সাঈদ বলেন, ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটরদের কমিশনের দাবি মেনে নেওয়া হলে বিইআরসি ঘোষিত দামের চেয়ে বেশি দামে কেউ এলপিজি বিক্রি করলে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব) তাদের আইনের আওতায় আনবে।

তবে পরিবেশকদের পক্ষ থেকে একজন বলেন, আমদানিকারকরা চাহিদামতো সিলিন্ডার না দিলে নির্ধারিত দামে বিক্রি করা সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, “আমার সেটআপ আছে ১০ হাজার সিলিন্ডার বিক্রির, কিন্তু আমাকে দিচ্ছে ৫ হাজার। তাহলে আমি কীভাবে পোষাবো। সব কোম্পানি যেন গ্যাস দেয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।”

এর আগে সকালে আবু সাঈদ দাবি করেন, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের আগে জাহাজভাড়াসহ এলপিজি আমদানির প্রিমিয়াম ছিল টনপ্রতি ৮০ থেকে ১২০ ডলার। এখন তা ২৫০ থেকে ৪০০ ডলারে উঠেছে।

সব ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে এমন দাম নির্ধারণের দাবি জানান তিনি, যাতে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বাজারে এলপিজি বিক্রি না হয়।

কমিশন বাড়ানোর দাবি

এলপিজির বাজারে অস্থিরতার মধ্যে বর্তমান দামে ব্যবসা করা কঠিন দাবি করে নতুন দামে কমিশন ও অন্যান্য ব্যয় সমন্বয়ের প্রস্তাব দিয়েছে এলপিজি কোম্পানিগুলো।

১২ কেজির সিলিন্ডারে বর্তমান কমিশন ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা এবং ডেল্টা ৩৬০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। মেঘনা গ্রুপ প্রস্তাব করেছে ৩০০ টাকা।

পরিবেশকরা কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন।

অটোগ্যাস স্টেশন মালিকরা কমিশন ৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছেন।

অটোগ্যাস সমিতির সভাপতি সিরাজুল মাওলা বলেন, দেশে দুই লাখের বেশি গাড়ি এলপিজিতে চলে। ২০২১ সালে কমিশন ৮ টাকা নির্ধারণ করা হলেও পাঁচ বছরে পরিচালন ব্যয় বেড়েছে।

দেশের ১১০০ অটোগ্যাস পাম্পের ৮০ শতাংশ লোকসানে চলছে দাবি করে তিনি কমিশন ১১ টাকা করার প্রস্তাব দেন।

এদিকে ডিলার ও পরিবেশকরা অভিযোগ করেন, সিলিন্ডার পরিবহনের সময় তাদের গাড়িকে প্রায়ই পুলিশের হয়রানির মুখে পড়তে হয়।

ডিলার আবু তাহের বলেন, ট্রাকে রেলিং না থাকলে কোম্পানিগুলো নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সিলিন্ডার দেয় না। আবার রেলিং থাকলে গাড়ির উচ্চতা বাড়ানোর অভিযোগে পুলিশ মামলা দেয়।

শুনানি শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের আশ্বাস দেন।

জেরা যা হলো: ‘দাম বাড়বে বলে গ্যাস আটকে রাখা হয়েছে’

গণশুনানিতে কয়েকজন প্রস্তাবকারী কোম্পানি ও ব্যবসায়ীদের জেরা করেন এবং তাদের প্রস্তাবের পাল্টা যুক্তি তুলে ধরেন।

সাংবাদিক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ব্যবসায়ীদের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছে রাশিয়া-ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের পুরো খরচ বাংলাদেশ বহন করছে। কিন্তু গত ডিসেম্বরেও ভোক্তাদের আড়াই হাজার টাকা করে সিলিন্ডার কিনতে হয়েছে।

“তখন কেন এত বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হল, সেই ব্যাখ্যা কারও কাছে নেই। দাম বাড়বে বলে কোম্পানিগুলো গ্যাস আটকে রেখেছে, কিন্তু বিইআরসি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি,” বলেন তিনি।

ঢাকায় এখন ২২০০ টাকার নিচে সিলিন্ডার পাওয়া যায় না দাবি করে তিনি ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাবকে অযৌক্তিক ও দুঃখজনক বলেন।

শুনানি শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান বলেন, সেপ্টেম্বর থেকে অপারেটরদের দৈনিক বিক্রির তথ্য নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে এলসি ট্র্যাক করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বিইআরসির নির্ধারিত দামে সবসময় এলপিজি পাওয়া যায় না—এমন অভিযোগ সাংবাদিকরা নিয়মিত করেন। তবে একই সময়ে নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দামেও গ্যাস বিক্রির তথ্য তারা পেয়েছেন।

পুরনো খবর:

এলপিজির কমিশন বাড়ানোর ‘বিরাট’ ফর্দ হাতে গণশুনানিতে ব্যবসায়ীরা