এখন ডিজেলে লোকসান ৬ টাকা, অকটেনে লাভ ২৫ টাকা: বিপিসি

ব্যাপক সমালোচনার মুখে আয়-ব্যয়ের খতিয়ান তুলে ধরলেন বিপিসি চেয়ারম্যান।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 10 August 2022, 07:07 PM
Updated : 10 August 2022, 07:11 PM

দেশের বাজারে জ্বালানির দাম ব্যাপক বাড়ানোর পর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন-বিপিসির তরফে জানানো হল, এখন ডিজেল বিক্রি করে তাদের প্রতি লিটারে ৬ টাকা লোকসান গুণতে হলেও অকটেনে প্রতি লিটারে লাভ হচ্ছে ২৫ টাকা।

তবে সরকারি দরে ডলার কিনলে এবং জুলাই মাসের মতো বিক্রি হলে শুধু ডিজেল-অকটেন থেকে প্রতি মাসে ২০৫ কোটি টাকা মুনাফার পূর্বাভাস দিয়েছেন বিপিসির চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর পর গত সাত বছরে বিপিসির বিপুল মুনাফা নিয়ে আলোচনার মধ্যে বুধবার ঢাকার কারওয়ান বাজার বিপিসির ঢাকা অফিসে সংবাদ সম্মেলনে এসে এই পূর্বাভাস দেন তিনি।

ইউক্রেইন যুদ্ধের বিশ্ববাজারে অস্থিরতার মধ্যে সম্প্রতি সরকার জ্বালানি তেলের দাম এক ধাপে ৪২-৫১ শতাংশ বাড়ানোর পর অনেকে বলছিলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর ব্যাপক মুনাফার কারণে এখন দাম এতটা না বাড়ালেও চলত।

গত শনিবার থেকে ডিজেল ও কেরোসিনের দাম ৪২.৫ শতাংশ বেড়ে হয়েছে প্রতি লিটার ১১৪ টাকা। পেট্রোলের দাম ৫১.১৬ শতাংশ বেড়ে প্রতি লিটারের দাম হয়েছে ১৩০ টাকা। আর অকটেনের দাম বেড়েছে ৫১.৬৮ শতাংশ, প্রতি লিটার কিনতে হচ্ছে ১৩৫ টাকায়।

Also Read: বিপিসির লাভের গুড় খাচ্ছে ইউক্রেইন যুদ্ধ

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হন আজাদ।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম যখন নিম্নমুখী তখন কেন দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল কেন- এ প্রশ্নে বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, “প্লাটসের (জ্বালানি সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান) হিসাবে, পহেলা অগাস্ট প্রতি ব্যারেল পরিশোধিত তেলের দাম ছিল ১৩২ ডলার ৭৩ সেন্ট। কমে সেটা ৮ অগাস্ট ১১৮ ডলার ৫০ সেন্ট। গড়ে ১২৬ ডলার ৫৯ সেন্ট। এর সঙ্গে প্রতি ব্যারেলে ১১ ডলার প্রিমিয়াম, ট্যাক্স-ভ্যাট, ডিলার কমিশন যোগ হবে।

“এই আটদিনের তথ্যে… ছয় তারিখে যখন মূল্য নির্ধারিত হয়, তখন গত জুলাই মাসের গড় হিসাবে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই আটদিনের গড় হিসাব ধরলে আমার প্রতি লিটার (ডিজেল) পড়ে ১২০ টাকা ১৬ পয়সা। এই হিসাবে আমাদের এখনও ৬ টাকা লোকসান আছে।”

পেট্রোল ও অকটেনে লাভ কত হচ্ছে- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই আট দিনের গড় যদি করি, ২৫ টাকার মতো লাভ থাকছে অকটেনে। যেহেতু পেট্রোল ৫ টাকা কম রাখছি। সেহেতু কিছুটা কম হলেও হতে পারে।”

দেশে অবশ্য জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেলের ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি। ২০২০-২১ অর্থবছরে বিভিন্ন ধরনের ৬৩ লাখ মেট্রিক টন তেল বিক্রি করেছে বিপিসি। এর মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশই ডিজেল। অকটেন ৫ শতাংশ এবং পেট্রোল ৬ শতাংশের মতো।

বিপিসির ভবিষ্যৎ মুনাফা নিয়ে আজাদ বলেন, “যদি ডিজেল ও অকটেন জুলাই মাসের পরিমাণই বিক্রি হয়, তাহলে ডলারের সরকারি হিসাব হলে আমার ২০৫ কোটি টাকা মুনাফা থাকবে মাসে। আর যদি ডলার এখনকার মার্কেট রেটে যায়, তাহলে আমার লোকসান হয়ে যায় ৩৯ কোটি টাকা।”

খোলা বাজারে ডলারের দাম বেশি হলেও বিপিসি তো ডলার সরকারের নির্ধারিত মূল্যেই কেনে- একথা বলা হলে বিপিসি চেয়ারম্যান বলেন, “না, ডলার তো আমি অলরেডি মার্কেট রেটে পেমেন্ট করছি।”

এরকম একটা নাজুক পরিস্থিতিতে ২০০ কোটি টাকা মুনাফার পূর্বাভাস কীভাবে দিচ্ছেন- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি তো আপনাদের বললাম, আমার ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন দরকার।”

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, শতভাগ পেট্রোল এবং ৪০ শতাংশ অকটেন দেশের গ্যাসের উপজাত কনডেনসেট থেকেই তৈরি করা হয়। কিন্তু বিপিসির চেয়ারম্যান বলছেন, অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানির জন্য পেট্রোলের খরচ বেড়ে যাচ্ছে।

“আপনারাই ব্রিফিং করেছেন, পেট্রোল-অকটেন আমাদের নিজস্ব পণ্য, তারপরও দাম বাড়াতে হলো কেন”- এ প্রশ্ন করেন এক সাংবাদিক।

উত্তরে বিপিসির চেয়ারম্যান বলেন, “পেট্রোল জিনিসটাও কিন্তু ক্রুড অয়েল থেকে তৈরি হয়। পেট্রোল সেটা প্রাইভেট সাপ্লাই তারা দেয়, আর আমাদের ইস্টার্ণ রিফাইনারিতে তৈরি হয়। এটার পেছনে যে খরচ, সেটা ক্রুড অয়েল। ক্রুড অয়েল আমদানির সঙ্গে ট্যাক্স, ভ্যাট সব দিয়ে আমাকে আমদানি করতে হয়। এটা প্রায় কাছাকাছি খরচ পড়ে।”

তিনি বলেন, “পেট্রোল-অকটেন কাছাকাছি মূল্যে বিক্রি করতে হয়। কারণ দামের বেশি হেরফের হলে একটাকে অন্যটা বলে চালিয়ে দেয়। এটা অতীতে হয়েছে। ক্রুড অয়েল কিন্তু স্থানীয়ভাবে হয় না। যেখানেই করেন ক্রুড অয়েল তো আনতে হয়।”

বিপিসির এত দিনের মুনাফার অর্থ নিয়েও কথা বলেন আজাদ।

তিনি বলেন, “অনেকেই যেটা বলছেন যে, বিপিসির এফডিআরের টাকা এত বেশি যে সে টাকা দিয়েই হয়ত আরও কয়মাস চলতে পারতো। আপনি কি লক্ষ্য করেছেন যে আমরা এফডিআরের টাকা কোথায় শিফট করেছি? অনেকে বিপিসিকে ধনী প্রতিষ্ঠান বলতে চেয়েছেন। আমার আর্থিক অবস্থা বলছে, আমি কতটুকু ধনী। সেটার উত্তর মনে হয় আপনারা পেয়েছেন।”

বিপিসির পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানে সংস্থার আয়-ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরা হয়।

আজাদ হিসাব দেন, ২০১৪-১৫ অর্থবছর থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরে বিপিসি যে ৪২ হাজার ৯৯২ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, এরমধ্যে উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয়, সরকারকে লভ্যাংশ ও উদ্বৃত্ত তহবিল হিসেবে দেওয়া, এনবিআরের বকেয়া পরিশোধ, মূলধনী বিনিয়োগসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার ১৮৮ কোটি টাকা। অবশিষ্ট থাকে ২২ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রভিশনাল হিসাব অনুযায়ী, বিপিসির লোকসান প্রায় ৫ হাজার ৯১০ কোটি টাকা।

তিনি বলেন, ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছর হতে ২০১৩-২০১৪ অর্থবছর এই ১৪ বছরে বিপিসির লোকসান হয় ৫৩ হাজার ৫ কোটি টাকা। এরমধ্যে সরকার বিভিন্ন সময়ে বিপিসিকে দেয় ৪৪ হাজার ৮৭৭ কোটি টাকা। বাকি ৮ হাজার ১২৭ কোটি টাকা বিপিসির মুনাফার সঙ্গে সমম্বয় করা হয়।

Also Read: মুনাফার হিসাব: অর্থ বিভাগ ও বিপিসির মধ্যে ৪ হাজার কোটি টাকার ফারাক

বিপিসি চেয়ারম্যান জানান, জ্বালানি তেলের মূল্য পরিশোধ করার জন্য বিপিসিকে দুই মাসের জ্বালানি তেলের মূল্যের সমপরিমাণ অর্থ (২৫% বৃদ্ধিসহ) চলতি মূলধন হিসেবে রাখতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য বৃদ্ধি পেলে বিপিসির মূলধনও বাড়াতে হয়। ২০২০-২১ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল তুলনামূলক ‘সহনশীল’ থাকায় ওই সময় বিপিসির ১২ হাজার কোটি টাকা চলতি মূলধন রাখা হত।

পরে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় বিপিসির চলতি মূলধনের উপর চাপ পড়ে জানিয়ে আজাদ বলেন, তেলের মূল্য সমন্বয়ের আগে তেল বিক্রি ও অন্যান্য খাতে বিপিসির মাসিক গড় জমা ছিল সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে চলতি বছরের জুনে ৭ হাজার ১৭১ কোটি, জুলাইয়ে ১০৩১২ কোটি টাকা পেমেন্টে করা হয়েছে এবং অগাস্টে ৯ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকা পেমেন্ট প্রাক্কলন করা হয়েছে।

এজন্য বিপিসির ২০ হাজার কোটি টাকার চলতি মূলধন প্রয়োজন বলে জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান। এদিকে ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই সময়ে বিপিসির অনেক এফডিআর নগদায়ন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

বর্তমানে চলতি মুলধন, রিজার্ভ তহবিল, উন্নয়ন তহবিল, অবচয় তহবিলসহ বিভিন্ন খাতে বিপিসির কাছে মোট ১৯ হাজার ৮৮২ কোটি টাকার তহবিল আছে। এরমধ্যে ৭ হাজার ৭৪ কোটি টাকা রয়েছে চলতি মূলধন, যা আজাদের ভাষ্যে ‘যথেষ্ট নয়’।

তিনি বলেন, সেই কারণে ইস্টার্ণ রিফাইনারি-২ তে রাখা ৭ হাজার ৩৬১ কোটির মধ্যে ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা নগদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং বিপিসি ৩৪ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১টি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক