Published : 24 Feb 2026, 01:46 PM
ডাক বিভাগের মোবাইলে আর্থিক সেবার কোম্পানি (এমএফএস) নগদ–এ বিদেশি বিনিয়োগ আনার প্রস্তাব নিয়ে গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন জামায়াতে ইসলামীর এমপি মীর আহমাদ বিনকাসেম আরমান।
তবে নগদের মালিকানা নিয়ে বিএনপির নতুন সরকারের অবস্থান কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট না হওয়ায় আপাতত তাকে অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ আমলে যুদ্ধাপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার আরমান ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৪ আসন থেকে এমপি হয়েছেন। নগদে কোনো একটি বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে বাংলাদেশে স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন তার ল ফার্ম।
এ বিষয়ে আলোচনার জন্য মঙ্গলবার দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকে যান ব্যারিস্টার আরমান। গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করে পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।
মীর আহমাদ বিনকাসেম আরমান বলেন, “গভর্নর জানিয়েছেন যে, বর্তমান নতুন সরকার আসার পর নগদের ব্যাপারে তাদের চূড়ান্ত নীতি কী হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
“যদি সরকার সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা অন্তর্বর্তী সরকারের মত এটি (নগদ) বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের হাতে ছেড়ে দেবে, তবেই বিনিয়োগের পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু হবে।”
সংসদ সদস্য হিসেবে নয়, একজন পেশাদার আইনজীবী হিসেবে বিদেশি কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন জানিয়ে আরমান বলেন, “আমি আগেও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ডেল, মাইক্রোসফট, অ্যাপল ও উবার এর মত কোম্পানির সঙ্গে কাজ করেছি। এখন তাদের (সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী) জন্য কাজ করছি। তাদেরও আইনি সহায়তা দেব।”
তবে কোন দেশের বিনিয়োগকারীরা নগদে বিনিয়োগ করতে আগ্রাহী বা কাদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করছেন-সেসব স্পষ্ট করেননি তিনি।
প্রযুক্তি খাতে ওই কোম্পানির বিনিয়োগ রয়েছে জানিয়ে আরমান বলেন, “বিনিয়োগকারীরা মূলত বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং খাতে আগ্রহী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই তারা বিনিয়োগের ক্ষেত্র খুঁজছিলেন। আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করার সময়ে আগ্রহের বিষয়টি জানিয়েছিলাম।”
নগদে বিনিয়োগ লাভজনক হবে কি না–তা বুঝতে একটি অডিট করার আগ্রহ প্রকাশ করে গভর্নরকে চিঠি দিয়েছিলেন আরমান।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর এ ধরনের কোম্পানির স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা ‘স্বার্থের সংঘাত’ কি না–এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “অন্তবর্তী সরকারের সময় থেকেই নগদে বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনা চলছে সরকারের সঙ্গে। আমি একজন উদ্যোক্তা পরিবারের সদস্য হওয়ায় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আমাকে বেছে নিয়েছেন।
“সংসদ সদস্য হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করা কোনো স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করবে না। রাজনীতি করছি জনগণের সেবার জন্য, এখানে কোনো আয় নেই। দেশের জন্য কাজ করি। আর পরিবার চালানোর জন্য পেশা হিসেবে আইন চর্চা করি। যা ঐতিহাসিকভাবেই সংসদ সদস্যরা করে আসছেন। এখানে স্বার্থের কোনো দ্বন্দ্ব নেই।”
গভর্নরের সঙ্গে আরমানের বৈঠকের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সাংবাদিকদের বলেন, “নগদে ডিজাস্টার হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক তাতে প্রশাসকসহ একটি টিম বসিয়েছে জনগণের স্বার্থে। প্রশাসক বসানোর পরে গত এক বছরে আর্থিক সূচকগুলোতে অনেক উন্নতি হয়েছে।
“যেহেতু প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে অনেক গ্রাহক জড়িয়ে গেছে। তাদের বেইজ তো অনেক বড় হয়েছে। এখন নগদকে যদি একটি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা না হয়, তাহলে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে মনোপলি হয়ে যাবে। একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যাবে।”
গত বছরে ব্যক্তিখাতে নগদ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) একটি দরপত্র আহ্বান করে। তাতে সাড়া দিয়ে দেশি-বিদেশি চারটি কোম্পানি নগদে বিনিয়োগের প্রস্তাব জমা দেয় বাংলাদেশ ব্যাংকে, যা এখন পর্যালোচনায় রয়েছে।
একসঙ্গে সব প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে জানিয়ে আরিফ হোসেন বলেন, “নগদকে পুরোদমে সচল করতে বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন; সেটা দেশি-বিদেশি যে কেউ নিতে পারে।
“এখন যেহেতু নির্বাচিত সরকার এসেছে, নগদের মালিকানা ডাক বিভাগের। আর বিডাও সরকারি প্রতিষ্ঠান, তাই সরকারের অবস্থান জানার জন্য আমরা আরো একটু অপেক্ষা করব। সেই সিদ্ধান্ত পাওয়ার পরই পরবর্তী পদক্ষেপে যাবে বাংলাদেশ ব্যাংক।’’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “নগদের মালিকানা সরকারি প্রতিষ্ঠানের। সরকার সিদ্ধান্ত নেবে তারা আগেরটি বহাল রাখবে, নাকি নতুন কোনো প্রক্রিয়ায় যাবে। বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু এখানে সাচিবিক দায়িত্বটি পালন করবে। সরকারের সিদ্ধান্ত সরকার জানালে সেই অনুযায়ী কাজ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।’’
নিরীক্ষা প্রসঙ্গে আরিফ হোসেন বলেন, ‘‘অনিয়ম যা হয়েছে তা আইনি বিষয়। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর প্রতিষ্ঠানের মালিকানা বা ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবে সরকার। যাই করা হোক, গ্রাহকের স্বার্থ ঠিক রেখে পুরো আইন মেনে করা হবে।’’
গত বছরের ২৫ অগাস্ট অন্তবর্তী সরকারের সময়ে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছিলেন, নগদকে ডাক অধিদপ্তরের হাত থেকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
তখন বিনিয়োগকারী খুঁজতে এক সপ্তাহের মধ্যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার সিদ্ধান্তও জানিয়েছিলেন তিনি। বলেছিলেন, “নগদের মালিকানা আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে তুলে দেওয়া হবে। এজন্য নতুন বিনিয়োকারী খোঁজা হচ্ছে। কারণ নগদ চালানোর মতো সক্ষমতা পোস্ট অফিসের নেই।”
মোবাইলে আর্থিক সেবার কোম্পানি হিসেবে ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ যাত্রা করে নগদ। পরে এই এমএফএস কোম্পানিকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া হয়।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ কোম্পানিকে নিয়ম ভেঙে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ২১ অগাস্ট নগদের আগের পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক বসায় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে উচ্চ আদালত পরে তা অবৈধ ঘোষণা করে। তখন নগদের দায়িত্ব নেয় ডাক অধিদপ্তর।
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে নগদের বিরুদ্ধে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক, যেখানে কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুকসহ ২৪ জনকে আসামি করা হয়।
মামলায় বলা হয়, ২০২৪ সালের ২১ থেকে ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক নগদের কার্যক্রম পরিদর্শন করে। তাতে বিভিন্ন ব্যাংকের ‘ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট’ হিসাবে ইস্যু করা ই-মানির বিপরীতে রিয়েল মানির ১০১ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি পাওয়া গেছে।
'নগদ’ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি ঘাটতিসহ আরও কিছু গুরুতর আর্থিক অনিয়মের তথ্য প্রশাসক দলের নজরে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক মামলাটি দায়ের করে।
গভর্নর এর আগে অভিযোগ করে বলেছিলেন, “এ প্রতিষ্ঠানের আগের মালিকানায় যারা ছিলেন, তারা নানা রকমের অনিয়ম করেছে। এজন্য অনেক জায়গায় কারেকশন করতে হয়েছে।”
কোনো প্রযুক্তি কোম্পানিকে নগদের প্রধান শেয়ারহোল্ডার হিসেবে আনার পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, “এখন এমন একটি প্রতিষ্ঠান দরকার, যেমন বিকাশের মত, যারা ধাপে ধাপে, শেয়ার ধরে ধরে নগদে বিনিয়োগ করতে পারবেন। আশা করছি, নগদকে যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।”
এরপর গত ৮ ফেব্রুয়ারি গভর্নরকে চিঠি দেন ব্যারিস্টার আরমান। সেখানে নগদে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ রয়েছে জানিয়ে বলা হয়, বিস্তারিত জানতে নগদের উপর পরিচালিত ফরেনসিক অডিটের প্রতিবেদন দিতে হবে।
গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে উদ্ধৃত করে সোমবার বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নগদে বিনিয়োগে আগ্রহী কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য বিদেশি বিনিয়োগকারী’ থাকলেই কেবল মীর আহমাদ বিনকাসেম আরমানের ল ফার্মের সঙ্গে আলোচনা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আরমানের বিনিয়োগ প্রস্তাব সংক্রান্ত চিঠি ‘আনুষ্ঠানিকভাবে পাননি’ জানিয়ে গভর্নর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই চিঠির যে কপি ভাইরাল হয়েছে, সেখানে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ কোনো বিনিয়োগকারীর নাম নেই।
"কারা বিনিয়োগকারী এবং সংশ্লিষ্ট খাতে তাদের কী অভিজ্ঞতা রয়েছে—আইনি প্রতিষ্ঠানটিকে তা স্পষ্ট করতে হবে।”
গভর্নর এও বলেন, যদি বাংলাদেশি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে চান, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীর নাম গ্রহণযোগ্য হবে না।
পুরনো খবর
নগদে বিদেশি বিনিয়োগের আলোচনা করতে বাংলাদেশ ব্যাংকে ব্যারিস্টার