অক্টোবরে বাণিজ্য ঘাটতি পৌনে চার বিলিয়ন ডলার ছাড়াল

চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারে; গত সেপ্টেম্বরেও যা ছিল এক বিলিয়নের উপরে।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 7 Dec 2023, 07:56 PM
Updated : 7 Dec 2023, 07:56 PM

রপ্তানির চেয়ে আমদানি আবার বেড়ে যাওয়ায় গত অক্টোবর শেষে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। এক মাস আগেও সেপ্টেম্বরে যা ছিল এক দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার।

এ হিসাবে এক মাসের ব্যবধানে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে এক দশমিক ৯৮ বিলিয়ন ডলার। তবে আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ কমেছে আমদানি নিয়ন্ত্রণের কারণে। ২০২২ সালের অক্টোবর শেষে যা ছিল ৯ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক বাণিজ্য লেনদেনের হালানাগদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অক্টোবর শেষে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত দাঁড়িয়েছে ২৩ কোটি ৩০ লাখ ডলারে। এক মাসে আগে গত সেপ্টেম্বরেও যা ছিল এক বিলিয়নের উপরে।

চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে দেশে রপ্তানি আয় এসেছে ১৬ দশমিক ৪৬ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয় ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ। ২০২২ সালের জুলাই-অক্টোবর সময়ে রপ্তানি আয় এসেছিল ১৫ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার। ওই সময়ে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের গত চার মাসে গড়ে চার দশমিক ১১ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় এসেছে। আর ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে গত অক্টোবরে ৩ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় এসেছিল দেশে।

এমন প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিতে ‘স্বস্তির’ সূচক চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত কমে গিয়ে ফের ঘাটতিতে পড়ে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা আরও চাপে পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।

চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত থাকা মানে নিয়মিত লেনদেনে কোনো ঋণ করতে হয় না দেশকে। আর ঘাটতি থাকলে ঋণ নিয়ে তা পূরণ করতে হয়।

২০২২ সালের জুলাইয়ে চলতি হিসাবে বাংলাদেশের ঘাটতি ছিল ৪৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার। আমদানি নিয়ন্ত্রণের ইতিবাচক ফল পাওয়া যায় বছর খানেকেরও বেশি সময় পর। গত ২০২২ সালের জুলাই থেকে আমদানি নিয়ন্ত্রণ শুরু করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ওই সময়ে সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক, বৈদেশিক মুদ্রা বাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক অবস্থানে ফিরে না আসা পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ চলমান রাখবে।

এক টানা এক বছর পরে হিসাবটি উদ্বৃত্তে ফিরেছিল গত জুলাইতে। ফের এখন ঘাটতি পড়ার ঝুঁকি দেখা যাচ্ছে।

রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধির হার কমে যাওয়ায় প্রভাব বাণিজ্য ভারসাম্যে ঘাটতি বাড়িয়ে চলতি হিসাবে উদ্বৃত্ত কমিয়ে দিচ্ছে মনে করেন বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাব্কে লিড ইকনোমিস্ট জাহিদ হোসেন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘অক্টোবরে আমদানি আগের মাসগুলোর তুলনায় একটু বেড়ে সাড়ে পাঁচ বিলিয়ন হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে যা পাঁচ বিলিয়নের নিচে নামিয়ে এনেছিল। রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি কমে আসা ও আমদানি খরচ বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত কমে যাচ্ছে।’’

তিনি বলেন, চলতি হিসাবে যে স্বস্তি দেখা গিয়েছিল তা আর থাকল না ডলারের অপ্রতুলতায়। এতে রিজার্ভের উপর আরও চাপ বাড়বে। কারণ হচ্ছে, রেমিটেন্স প্রবাহ গত অক্টোবর পর্যন্ত নেতিবাচক ছিল।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে রেমিটেন্স এসেছিল ছয় দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ কম।

জাহিদ হোসেন বলেন, ‘‘বৈদেশিক মুদ্রা সংগ্রহের আরেকটি উৎস হচ্ছে বৈদেশিক ঋণ। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরেই স্বল্প মেয়াদী ও দীর্ঘ মেয়াদী দুটোই কমে যায়। উল্টো স্বল্প মেয়াদী ঋণ পরিশোধের হার বেড়েছে। এর মানে হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রা আসার চেয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে বেশি। যার চাপ পড়েছে বৈদেশিক ‍মুদ্রা খাতে।

‘‘স্বল্প মেয়াদী ঋণের মেয়াদ বাড়ানো গেলে কিছুটা চাপ কমানো যেত। কিন্তু তা না হওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, সার্বিকভাবে বাংলাদেশের ঋণ মান কমে যাওয়ায় বিদেশি ঋণ দাতারাও কিছুটা সতর্ক হচ্ছে ঋণ দিতে। এতে ঋণ প্রবাহ কমেছে।’’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই-অক্টোবর সময়ে ৮৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার স্বল্প মেয়াদী ঋণ পরিশোধ করেছে বাংলাদেশের ঋণ গ্রহীতারা। এক বছরের জন্য নেওয়া এ স্বল্প মেয়াদী ঋণ সাধারণত বেসরকারি উদ্যোক্তারাই নিয়ে থাকেন আমদানি দায় মেটাতে।

গত ২০২২ সালের জুলাই-অক্টোবর সময়ে স্বল্প মেয়াদী ঋণ নেওয়া হয়েছিল এক বিলিয়ন ডলার। এবার নেয়ার চেয়ে উল্টো পরিশোধ করেছেন উদ্যোক্তারা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই-অক্টোবর সময়ে দীর্ঘ মেয়াদীয় ‍ঋণ-যা সরকারি পর্যায়ে নেয়া হয় বেশি; তা এসেছে ছয় কোটি ২০ লাখ ডলার। আগের ২০২২ সালের এ সময়ে যা ছিল সাত কোটি ৪০ লাখ ডলার।

রপ্তানি আয়, রেমিটেন্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি, নিয়ন্ত্রণমূলক আমদানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়া ও সরকারি পর্যায়ে বৈদেশিক ঋণ কম ছাড় হওয়ায় চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত কমিয়ে আর্থিক হিসাবের ঘাটতি বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন জাহিদ হোসেন।

তা রিজার্ভের চাপ বাড়িয়ে ডলারকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে বলেও মনে করছেন তিনি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর শেষে বিপিএম৬ অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্রস রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে গ্রস রিজার্ভ ছিল ২৭ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার।

গত সেপ্টেম্বরে চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত এক বিলিয়নের উপরে থাকাকে স্বস্তি হিসেবে মনে করে বাফেদা-এবিবি টাকার মান এক সপ্তাহের ব্যবধানে গত নভেম্বরের শেষ দশকে দুই দফায় ৭৫ পয়সা বাড়িয়েছিল।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের রিজার্ভ সপ্তাহের ব্যবধানে কিছুটা কমে হয় বিপিএম৬ পদ্ধিতির গ্রস হিসাবে ১৯ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার, আর বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্রস হিসাবে তা ২৪ দশমিক ৬৬ বিলিয়ন ডলার।

চলতি ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-আইএমএফ এর ঋণের দ্বিতীয় কিস্তি ছাড়ের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে আগামী সপ্তাহে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) ৪০ কোটি ডলার ঋণ আসতে পারে। এ দুই ঋণ ছাড় হলে তা রিজার্ভ বাড়াতে ভূমিকা রাখবে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এদিকে ঘাটতি বেড়েছে আর্থিক হিসাবেও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর শেষে আর্থিক হিসাব (ফাইন্যান্সিয়াল) এ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে তিন দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগেও ২০২২ সালের অক্টোবর শেষে যেখানে উদ্বৃত্ত ছিল এক দশমিক ২৭ বিলিয়ন ডলার।

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে সার্বিক ভারসাম্য (ওভারঅল ব্যালেন্স) ঘাটতি এক মাসের ব্যবধানে কিছুটা বেড়ে গিয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর শেষে তা তিন দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগে ২০২২ সালের অক্টোবরে যেখানে বর্তমানের চেয়ে কিছুটা বেশি চার দশমিক ৭ বিলিয়ন ঘাটতি ছিল।

অন্যদিকে গত জুলাই-অক্টোবর সময়ে আমদানি হয় ২০ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। আগের ২০২২ সালের আমদানির তুলনায় যা ২০ দশমিক ৫৪ শতাংশ কম। ২০২২ সালের জুলাই-অক্টোবরে আমদানি ব্যয় ছিল ২৫ দশমিক ৫১ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ।