Published : 01 Aug 2025, 01:42 AM
দুর্বল ব্যাংকগুলো একীভূত করতে সরকার বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করলেও তা ঝুঁকিতে পড়ার বদলে মুনাফাসহ ফেরত পাবে বলে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
বৃহস্পতিবার নিজের ‘আমলের’ দ্বিতীয় মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন তিনি।
রাজধানীর মতিঝিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা মাথায় রেখে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের জন্য আগের মতই আঁটসাঁট মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন। এতে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রেখে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আরো কমিয়ে আনা হয়।
জুলাই-ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের এ মুদ্রানীতিতে রেপো হার ১০ শতাংশই থাকছে। মূল্যস্ফীতি যতদিন ৭ শতাংশের নিচে না নামবে, ততদিন নীতি সুদহার কমবে না বলে গভর্নর জানান।
নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২০ শতাংশ। আগের মুদ্রানীতিতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কথা বলেন গভর্নর। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের মৌলিক দুটি দায়িত্ব রয়েছে। মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা ও ব্যাংকিং খাতে স্থিতিশীলতা নিয়ে আসা।
মূল্যস্ফীতি কমলেই নীতি সুদহার কমিয়ে আনা হবে বলে তুলে ধরেন তিনি।
আগের সরকারের সময়ে অনিয়মের কারণে দুর্দশায় পড়া ব্যাংকগুলোতে পট পরিবর্তনের পর বিভিন্ন সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তারল্য সহায়তা ও নানা রকম সুযোগ দিয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু ব্যাংক ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
সেগুলো নিয়ে আশাবাদী হওয়ার কথা তুলে ধরে আহসান মনসুর বলেন, যেসব ব্যাংক ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি সেগুলো একীভূত করা হবে।
ক্তরাষ্ট্রের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, “যেসব ব্যাংক একীভূত করা হবে সেগুলোর আমানতকারীরা সম্পূর্ণ নিরাপদ। তারা সব টাকা ফেরত পাবে। বর্তমানে এসব ব্যাংকের যা চিত্র, ভবিষ্যতে তা আরো ভালো হবে কারণ এখানে বড় রকমের অর্থ বিনিয়োগ করা হবে একীভূতকরণ করার সঙ্গে সঙ্গে। তাতে এসব ব্যাংকের গভর্নেন্স ও ক্যাপিটাল সমৃদ্ধ হবে।
“এসব দুর্বল ব্যাংকগুলোতে সরকার যা বিনিয়োগ করবে তা লাভসহ টাকা ফেরত পাবে। বৈশ্বিক অর্থনেতিক সংকটের সময় মার্কিন সরকার ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রচুর অর্থের যোগান দিয়েছিল। পরবর্তীতে সরকার লাভ করে বেসরকারি খাতের কাছে ব্যাংক বিক্রি করেছিল।”
আমানতকারী ও জনগণের স্বার্থকে বিবেচনাই করেই এসব ব্যাংকে বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করছে বলে তুলে ধরেন তিনি।
তিনি বলেন, “ইসলামী ব্যাংকে অস্থিরতার জন্য আমরা দায়ী নই। ভেতরে এখানে অনেক মহল রয়েছে। ভেতরে অনেকে রয়েছে যারা অস্থিতিশীলতা করার চেষ্টা করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব স্থিতিশীলতা ধরে রাখার। অনিয়ম হলে আমরা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করি।

“ইসলামী ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ঘুড়ে দাঁড়াতে পেরেছে বলে মনে করি। আমরা ব্যাংকগুলোকে এক বছরের মত সুযোগ দিয়েছি। এসব ব্যাংকের সামনে সম্ভবনাময় হিসেব দেখছি।”
পদ্মা ব্যাংককে ‘অচল ব্যাংক’ হিসেবে তুলে ধরে তিনি বলেন, এটাকে সচল করতে হবে। এটাকে হয়তবা মার্জ (একীভূত) করে দেওয়া লাগবে। ১৫ থেকে ২০টি ব্যাংকে হস্তক্ষেপ করছি। আমরা প্রথমে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করছি। এটা যদি সফলভাবে করতে পারি তাহলে ধাপে ধাপে বাকি ৫টি কিংবা ১০টি ব্যাংকে করব।”
গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডলারের দর নিয়ে সচেতন থাকার কথা তুলে ধরে আহসান মনসুর বলেন, কৃত্তিমভাবে বাজারে তারল্য বাড়ানো যাবে না। বরং ডলার সরবরাহ বাড়াতে পারলে বাজারে টাকার প্রবাহ বাড়বে।
“দরকার হলে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে সময় সময় ডলার কেনা হবে। ইতোমধ্যে আমরা অর্ধ বিলিয়ন ডলার বাজার থেকে কিনেছি। সামনে সময়মত আবার ডলার কেনা হবে।এতে বাজারে ৬০ হাজার কোটি টাকার তারল্য সরবরাহ বেড়েছে।”
টানা ৮ মাস স্থিতিশীল অবস্থায় থাকার পর ডলারের দর বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “অনেকের মধ্যে ভয় ছিল যে ডলার দর বেড়ে যাবে। তবে সেটা হয় নাই। বাজারের চাহিদা ও যোগানের ওপর ভিত্তি করেই দর নির্ধারণ করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাতে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করছে না। এক্সচেঞ্জ রেটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্দেশ্য পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে।
”সুদের হারকে কমিয়ে আনতে হবে। আগে ঘোষণা দিয়ে ৯ শতাংশ করে দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল সবচেয়ে খারাপ নীতি। তাই কৃত্রিমভাবে কিছু করা ঠিক হবে না, যা করার টেকসইভাবে করতে হবে।”
ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহার ১২ শতাংশে চলে যাওয়ার পর তা এখন ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। আগামীতে সুদ আরও কম আসবে মন্তব্য করে গভর্নর বলেন, এটি সরকারের জন্য ইতিবাচক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মীদের জন্য পোশাক সংক্রান্ত নীতিমালার বিষয়ে গভর্নর বলেন, “এটা বিব্রতকর। এটা ঘটেছে আমার অবর্তমানে। আমি জানার সাথে সাথে রিভার্স করা হয়। এটা তখন পর্যন্ত পলিসি হিসেবে স্বীকৃত ছিল না। ড্রাফট স্টেজে ছিল। আমার ধাপ পর্যন্ত তখন আসেও নাই। অভ্যন্তরীণ কাগজপত্র তখন ফাঁস হয়েছিল। তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।”
দেশে বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একটা সংকটের সময় বিনিয়োগকারীদের মানসিকতা বিনিয়োগের দিকে থাকে না। বিনিয়োগ বাড়ানোর কাজ বাংলাদেশ ব্যাংকের নয়। এ দায়িত্ব সরকারের। বাংলাদেশ ব্যাংক এক্ষেত্রে সাহায্যকারীর ভূমিকা রাখবে।