Published : 27 Jan 2026, 07:57 PM
বিগত সরকারের সময় ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর পুতুলের মত আচরণ করার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ বেঁধে দেওয়ার সময় তারা ভুল ভূমিকা রেখেছে।
সেই প্রেক্ষাপটের বিবেচনায় তিনি দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইসহ সব বাণিজ্য সংগঠনকে পেশাদার হওয়ার আহ্বান জানান।
মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীতে একটি হোটেলে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তব্য রাখছিলেন তিনি।
গভর্নর বলেন, ‘‘ঋণের সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল, তখন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো ছিল চুপ ছিল, এমনকি হাততালি দিয়েছিল।
‘‘তারা এটা দাবি করেছিল, চাপ দিয়েছিল। অর্থপাচারের সময়ও তারা চুপ ছিল। এভাবে তারা পুরো ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে। তারা অর্থপাচারের বিষয়ে সরকারকে থামাতে বলেনি, প্রতিবাদ করেনি। কোনো কথা বলেনি। এমন আচরণ করলে গণতন্ত্র কখনো শক্তিশালী হয় না।’’
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকের সুদহার ‘নয়-ছয়’ করার সংস্কৃতি আর ফিরবে না বলেও মনে করেন তিনি।
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণে ‘ইমপ্লিক্যাশনস অব এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ফর ব্যাংকিং ইন্ডাস্ট্রি: বাংলাদেশ পারসপেক্টিভ’ শীর্ষক এ গোলটেবিল আলোচনায় গভর্নর বলেন, ‘‘দেশের অর্থনীতির উন্নয়ন ও এলডিসি থেকে উত্তরণ একই সঙ্গে হতে হবে।
‘‘অর্থনীতির উন্নয়নের জন্যই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ হওয়ার প্রয়োজন। ছোট সুবিধার জন্য আমরা বড় সুবিধা হাতছাড়া করতে পারি না।’’
২০২০ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ব্যবসায়ীদের সঙ্গে রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে বৈঠক করে ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারণ করার সিদ্ধান্ত নেন। পরে বাংলাদেশ ব্যাংক তা মেনে চলতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়।
ওই বৈঠকে তৎকালীন গভর্নর ফজলে কবিরের অংশ নেওয়া নিয়েও তখন সমালোচনা হয়েছিল।
উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চাপে ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে ব্যাংক ঋণের সুদহারের সীমা বাড়াতে শুরু করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
২০২৪ সালের অগাস্টে সরকার পরিবর্তনের পর গভর্নরের দায়িত্ব নিয়ে আহসান মনসুর ঋণের সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা তুলে দেন।
পাশাপাশি সবশেষ মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। এর পর থেকে ব্যাংক ঋণের সুদহার বেড়ে বর্তমানে ১৫-১৬ শতাংশের ঘরে গিয়ে ঠেকেছে। সুদহার এতটা বেড়ে যাওয়ায় তা নিয়ে আপত্তি জানিয়ে সমালোচনা করছেন ব্যবসায়ীরা। তারা ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়া ও বিনিয়োগ কমে যাওয়ার কথা বলছেন।
গভর্নর বলেন, ‘‘আমরা পুতুল সংগঠন নয়, একটা পেশাদার ব্যবসায়ী সংগঠন চাই। আমরা সত্য কথা শুনতে চাই তাদের কাছ থেকে। এভাবে গণতন্ত্র কাজ করবে। অন্যথায় কাজ করবে না।’’
অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের তরফে ঋণের বর্তমান সুদহারকে বেশি হিসেবে তুলে ধরা হয়।

তা মেনে নিয়ে গভর্নর বলেন, ‘‘সুদহার বাংলাদেশে বেশি, এটা আমিও স্বীকার করি। এটা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কিন্তু বেশি না। ২০২০ সালের আগে তো আরো বেশি ছিল। তবে এটা মানতে হবে ২০ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়ে গেছে। এর ফলে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এটার তো কমপেনসেট করতে হবে।
‘‘আমানতের প্রবৃদ্ধি কমে ৬ শতাংশে নেমেছিল, তা বেড়ে ১১ শতাংশে উঠেছে। এর প্রভাব পড়েছে সুদের হারে। সুশাসন, তদারকি ও গ্রাহক আস্থা বাড়লে সুদহার কমে আসবে। এ জন্য খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। তখন মূল্যস্ফীতিও কমে আসবে, সুদহার কমবে।’’
বাংলাদেশকে সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান বা আফগানিস্তানের মতো দেশগুলোর সঙ্গে তুলনা করা উচিত নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘‘এলডিসি থেকে উত্তরণ একটি মৌলিক বিষয়। এটা আজ বা কাল ঘটবেই। কারণ, জিডিপিসহ উন্নয়নের প্রতিটি সূচকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে।’’
ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমানতকারীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে ফিরিয়ে আনতে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই বর্তমান প্রশাসনের লক্ষ্য।’’
আইসিসি বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) অধ্যাপক শাহ মো. আহসান হাবিব।
বক্তব্য দেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকের (বিএবি) চেয়ারম্যান আবদুল হাই সরকার, ট্রান্সকম গ্রুপের প্রধান নির্বাহী সিমিন রহমান, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান, প্রাইম ব্যাংকের ব্যবস্থপনা পরিচালক হাসান ও. রশিদ, পিকার্ড বাংলাদেশের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক অমৃতা মাকিন ইসলাম ও প্লামি ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল হক।