Published : 11 May 2026, 12:10 AM
যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীনকে টপকে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে উঠে এলেও খুশি হতে পারছেন না পোশাক রপ্তানিকারকরা।
ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্পূরক শুল্কের ধাক্কায় চীনের রপ্তানিতে ধসের কারণে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, বাংলাদেশের রপ্তানিও কমেছে। চীনের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে বেশি কমার কারণে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে উঠেছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, রপ্তানি বেড়ে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসতে পারলে সত্যিকারের খুশি হওয়ার কারণ ছিল। পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে তা বুঝতে আরো মাস দুয়েক অপেক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক থেকে। আর একক দেশ হিসেবে বাংলাদেশি পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র। পোশাক রপ্তানি করে মোট যে আয় হয়, তার ২০ শতাংশের মত এই দেশটি থেকে আসে।
ট্রাম্পের শুল্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমেছে। সেই সুযোগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে দ্বিতীয় শীর্ষ স্থান দখল করেছে বাংলাদেশ। মার্চ শেষে সেই অবস্থান কিছুটা সুসংহত হয়েছে। অন্যদিকে শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভিয়েতনাম।
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শীর্ষ পাঁচ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশের মধ্যে শুধু ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছে। চীন, বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া ও ভারতের কমেছে।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের আওতাধীন অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেলের (অটেক্সা) হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জানুয়ারি-মার্চ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন দেশ থেকে ১ হাজার ৭৭৩ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছেন। আমদানির এই পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৬০ শতাংশ কম।
এই তিন মাসে বাংলাদেশ ২০৪ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করেছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ কম। ২০২৫ সাল এই বাজারে ৮২০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ।
অন্যদিকে চীনের রপ্তানি প্রায় ৫৩ শতাংশ কমে গেছে। বছরের প্রথম তিন মাসে দেশটি ১৭০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। গত বছর একই সময়ে দেশটির রপ্তানি ছিল দ্বিগুণেরও বেশি, ৩৬১ কোটি ডলার।

এদিকে শীর্ষস্থানে থাকা ভিয়েতনাম চলতি বছরের জানুয়ারি–মার্চ সময়ে ৩৯৮ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। এই রপ্তানি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি।
বর্তমানে বাজার হিস্যার ২২ শতাংশ ভিয়েতনামের দখলে রয়েছে। আর বাংলাদেশের কাছে আছে সাড়ে ১১ শতাংশ।
অটেক্সার তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ১২২ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ইন্দোনেশিয়া। গত বছরের একই সময়ে তাদের রপ্তানি ছিল ১২৩ কোটি ডলার। সেই হিসাবে তাদের রপ্তানি কমেছে দশমিক ১৩ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের রপ্তানি বাংলাদেশের চেয়ে বেশি কমেছে। তিন মাসে ১১০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে ভারত। গত বছরের একই সময়ে তাদের রপ্তানি ছিল ১৫১ কোটি ডলার। অর্থাৎ, রপ্তানি কমেছে ২৭ শতাংশ।
গত বছরের ২ এপ্রিল বিশ্বের ১৫৭টি দেশের পণ্যে বিভিন্ন হারে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এরপর বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র।
শুরুতে বাংলাদেশি পণ্যে ৩৭ শতাংশ শুল্ক থাকলেও ৮ জুলাই সেটি কমিয়ে ৩৫ শতাংশ করা হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে পণ্য আমদানির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায় বাংলাদেশ। তাতে বাড়তি শুল্ক কমে ২০ শতাংশে দাঁড়ায়, যা গত ৭ আগস্ট কার্যকর হয়।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি করে ৯ ফেব্রুয়ারি। সে চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ওপর দেশটির সম্পূরক শুল্কের হার কমে হয় ১৯ শতাংশ।
তবে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহে ট্রাম্পের আরোপ করা শুল্ক অবৈধ ঘোষণা করে। তারপর ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সব দেশের পণ্যে নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করার ঘোষণা দেন ডনাল্ড ট্রাম্প। এই শুল্ক ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে কার্যকর হয়।
গত ৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালত দুটি বেসরকারি আমদানিকারক কোম্পানি এবং ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের ক্ষেত্রে ওই শুল্ক স্থগিত করে।
এই শুল্ক যুদ্ধের মধ্যে শুরুতে বেকায়দায় থাকলেও পরে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছায় বাংলাদেশ। তার কারণ, বাংলাদেশের মত ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে আরোপিত সম্পূরক শুল্ক ছিল ২০ শতাংশ। তার বিপরীতে ভারতের পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপানো জয়। চীনের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি।
ফলে বাংলাদেশে তৈরি পোশাক, জুতাসহ বিভিন্ন পণ্যের ক্রয়াদেশ বাড়তে থাকে। তবে পরে সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি, কারণ শুল্কের কারণে পণ্যের দাম বেড়ে গেছে।
আর ইরান যুদ্ধের পর জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। সে কারণে ক্রয়াদেশ আরো কমে গেছে বলে রপ্তানিকারকদের ভাষ্য।
২০২৫ সালে ১১.৭১% বেড়েছিল
অটেক্সার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি করে ৮২০ কোটি ২৫ লাখ ডলার আয় করেছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের বছরের চেয়ে ১১ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি।
২০২৪ সালে রপ্তানির অংক ছিল ৭৩৪ কোটি ২৮ লাখ ডলার; বেড়েছিল দশমিক ৭৩ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি থেকে সবচেয়ে বেশি আয় হয় ২০২২ সালে, ৯৭২ কোটি ৮২ লাখ ডলার, যা ছিল আগের বছরের (২০২১সাল) চেয়ে ৩৬ দশমিক ২৬ শতাংশ বেশি।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পোশাক রপ্তানি ৩৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ কমলেও বাংলাদেশের চেয়ে বেশি রপ্তানি করে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। গত বছর যুক্তরাষ্ট্রে ১ হাজার ৬৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছিল চীন।
২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ভিয়েতনামের রপ্তানি বেড়েছিল ১১ দশমিক ৭৯ শতাংশ; রপ্তানি আয়ের অংক ছিল ১ হাজার ৬৭৫ কোটি ডলার। ভারতের রপ্তানি বেড়েছিল ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ; অংক ছিল ৪৯৪ কোটি ডলার।

সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছিল কম্বোডিয়ার, প্রায় ২৭ শতাংশ; রপ্তানি হয়েছিল ৪৮২ কোটি ডলারের পোশাক। ইন্দোনেশিয়ার রপ্তানির অংক ছিল ৪৬৬ কোটি ডলার; বেড়েছিল ৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
যে কারণে খুশি নন রপ্তানিকারকরা
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের পাশাপাশি বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কেন কমছে জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গত কয়েক মাস ধরেই আমাদের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা চলছে। অতীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি।”
তিনি বলেন, “গত এপ্রিল মাসে যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে, তা মূলত আগের মাসে রপ্তানি কম হওয়ার কারণে হয়েছে। মার্চ মাসে রপ্তানি কমার প্রধান কারণ ছিল ঈদুল ফিতর উপলক্ষে আমাদের কারখানাগুলোতে প্রায় ১০ দিনের দীর্ঘ ছুটি। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে এবং রপ্তানি কম হয়েছে, যার প্রভাব এপ্রিল মাসে এসে যুক্ত হয়েছে অর্থাৎ মার্চ মাসে শিপমেন্ট না হওয়া পণ্য এপ্রিলে শিপমেন্ট হয়েছে।
“তবে আমাদের জানা মতে, কোনো কারখানাতেই অতিরিক্ত অর্ডার আসেনি কিংবা হঠাৎ করে নতুন ক্রেতার চাপও বাড়েনি। সে কারণে চলতি মে মাস শেষে আবারও রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব দেখা যেতে পারে। কারণ, এই মাসের শেষ সপ্তাহে আবার একটি বড় ছুটি থাকবে, যার ফলে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।”
হাতেম বলেন, “রপ্তানির প্রকৃত অবস্থা বুঝতে হলে আমাদের জুলাই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কারণ মে মাসের ঈদের প্রভাবের কারণে জুন মাসেও রপ্তানি সাময়িকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।”
জানুয়ারি-মার্চ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক আমদানি সাড়ে ১১ শতাংশ কমার তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, “সেই ধাক্কা আমাদের উপরও লেগেছে। রপ্তানি বাড়ার মধ্য দিয়ে আমরা যদি চীনকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থান দখল করতাম, তাহলে সেটা খুবই ভালো খবর হত।”
হাতেম বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতি অনেকটাই কমে এসেছিল। কিন্তু এর মধ্যেই পারস্য উপসারগীয় অঞ্চলে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। যুদ্ধ থামবে থামবে বলা হলেও থামছে না। সব মিলিয়ে আমাদের ক্রয়াদেশ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না।
“এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সব মিলিয়ে আমাদের সামনে কী আছে জানি না।”
একই সুরে কথা বললেন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও বিসিআইয়ের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একটার পর একটা ধাক্কা লেগেই আছে; সেই যে মহামারী থেকে শুরু হয়েছিল। তারপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। ট্রাম্পের শুল্ক, দেশে আন্দোলন-সংগ্রাম, গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারের পতন; সংকটের পর সংকট। নতুন সরকার আসার পর ভেবেছিলাম সবকিছু এখন ভালোর দিকে যাবে। কিন্তু এই সরকার দায়িত্ব নিতে না নিতেই শুরু হয়ে গেলো আরেকটি যুদ্ধ।”
পারভেজ বলেন, “আমাদের প্রধান বাজার আমেরিকা ও ইউরোপ। ওই দুই জায়গাতেই রপ্তানি ধাক্কা খেয়েছে। ট্রাম্পের শুল্কের কারণে আমেরিকার বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সে কারণে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এখন তারা তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য কম কিনছে। তার একটা প্রভাব পড়েছে আমাদের রপ্তানিতে।
“অন্যদিকে বাড়তি শুল্ক আরোপ করায় আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভারত আমেরিকার বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে ইউরোপের বাজারে আগের চেয়ে বেশি বেশি পণ্য রপ্তানি করছে। অনেকে ক্ষেত্রে কম দামেও পোশাক রপ্তানি করছে তারা। সে কারণে ইউরোপের বাজারেও আমাদের রপ্তানি কমছে।”