Published : 21 Jun 2026, 10:41 PM
দেশের ব্যাংক খাতে যেসব সমস্যা রয়েছে, সেগুলো সময়ের ব্যবধানে ‘তীক্ষ্ণ’ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোসলেহ উদ্দীন আহমেদ।
তার ভাষায়, ব্যাংক খাতে এত উত্থান-পতন দুই-তিন দশক আগেও ছিল না। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ‘বিনিয়োগ শিক্ষা’ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো নজরদারির কথা বলেছেন তিনি।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিয়মিত আয়োজন ‘চিনওয়্যাগ উইথ দ্য চিফস’-এ এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন মোসলেহ উদ্দীন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেইসবুক পেইজে অনুষ্ঠানটি সম্প্রচার করা হয়েছে, যেখানে দেশের ব্যাংক খাতের নানা সমস্যা ও সম্ভাবনা নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন তিনি।
দেশের ব্যাংক খাতে যেসব সমস্যা রয়েছে, সময়ের ব্যবধানে সেগুলোয়ে পরিবর্তন আসা পরিক্রমা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমরা যখন ব্যাংক খাতে আসি, তখন এই উত্থান-পতন দেখিনি। দেশের ব্যাংক খাত বিকাশমান ছিল, স্থিতিশীল ছিল।
“তখন যদি বুঝতে পারতাম যে আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হবে, কোনো কিছু হলেই ব্যাংকারদের ধর-মারো-কাটো, তাহলে আমি অন্তত এ পেশায় আসতাম না।”
দেশের ব্যাংকিং খাতের ‘চ্যালেঞ্জ’ প্রতিনিয়ত ‘তীক্ষ্ণ’ হচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “খেলাপি ঋণের কালচারটা শুরু হলো নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। ওই সময় ব্যাংকের সংখ্যা বেড়ে গেল। ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মতো ব্যাংকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হলো। ছোট একটা দেশে ৬২টি বাণিজ্যিক ব্যাংক!”
দেশের ব্যাংকিং খাতের বর্তমান সমস্যাসমূহের কারণ হিসেবে সেবা ও ব্যবসায়িক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে নতুনত্ব না থাকার কথা বলেন মোসলেহ উদ্দীন।
তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের একের এক প্রজন্ম “কিন্ত একে অন্যের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে একই সেবা বা পণ্য দিয়ে; একই লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে।
“ফলে আমার ধারণা হলো, একটা ‘ম্যাচিউরিটি’ আর একটা ‘ইমম্যাচিউরিটির’ ভারসাম্যহীনতার কারণে আজ এসব তৈরি হয়েছে।”
সবশেষ ৫টি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত করে গঠন করা হয় নতুন একটি ব্যাংক। এসবসহ আরো কয়েকটি ব্যাংকের গ্রাহকরা চাহিদা অনুযায়ী আমানত ফিরে পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমন পরিস্থিতি তৈরির কারণ হিসেবে বাছবিচার ছাড়া ব্যাংক অনুমোদন দেওয়ার কথা বলেন মোসলেহ উদ্দীন।

তিনি বলেন, “দোকান খোলার মতো আমি ব্যাংক খুলছি এবং সেটা কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই। কে মালিক, কোথা থেকে ব্যাংক এলো, তার কোনো খেয়াল নাই।
“আমানতকারীরা মনে করছেন, যেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংক লাইসেন্স দিয়েছে, সুতরাং আমার আমানত সুরক্ষিত থাকবে। তারা কখনো চিন্তাই করে নাই যে, ব্যাংক তার অর্থ ফেরতে দিতে অস্বীকার করবে। এ কারণেই কিন্তু আসলে আমাদের বড় বিপর্যয় ঘটে গেছে।”
বর্তমান সংকট থেকে মুক্তি পেতে ‘বিনিয়োগ শিক্ষা’ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার আরো গভীর পর্যবেক্ষণের কথা বলেন শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
ব্যাংক খাতের বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, “কিছু রুলসের ঘাটতি ছিল। অনেকে বলেন, গভর্ন্যান্সের ঘাটতি ছিল, থিওরিটিক্যালি। কিন্তু রুলস, গভর্ন্যান্স, কিংবা আইন— সবই ভেঙে ফেলা হয়েছে।
“একটা ব্যাংক ধীর ধীরে নষ্ট হয়; একটা সময় পরে গিয়ে তা ধরা পড়ে।”
ব্যাংক খাতে আমানতের হার কমে গেছে। বিশেষ করে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোতে মোট আমানত ৭ শতাংশ পয়েন্ট কমে ২৫ শতাংশে নেমেছে।
এমন পরিস্থিতিতে শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক নিয়ে জানতে চাইলে মোসলেহ উদ্দীন বলেন, ‘‘আমাদের ব্যাংক কারো নামে চলে না। মানে অমুকের ব্যাংক, অমুকের কথায় চলে, এসব আরকি। ব্যাংকের বোর্ড চলে সবার সিদ্ধান্তে।
“পাঁচ টাকার ঋণের বিষয়েও একক সিদ্ধান্ত না থাকায় শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক এখন শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের মধ্যে ভালো অবস্থানে রয়েছে।’’
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের ব্যাংকে কোনো তারল্য সংকট নেই। বিনিয়োগ-আমানত অনুপাত এখনো সীমার মধ্যে রয়েছে।’’
ব্যাংকিং খাতে মানুষের আস্থা ফিরবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘খারাপ ব্যাংক যেমন আছে, ভালো ব্যাংকও আছে। গ্রাহককে বেছে নিতে হবে, কোন ব্যাংকে আমানত রাখবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকও চেষ্টা করছে সার্বিক ব্যাংক খাতে আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে।’’

শাহজালাল ব্যাংকের বিনিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, কৃষি ও এসএমইসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ রয়েছে।
“অনেক খাতে বিনিয়োগ করার কারণে এবং ভালো গ্রাহককে নিয়ম মেনে ঋণ দেওয়ায় খেলাপির হার ৪ দশমিক ৪ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। শাহজালাল ব্যাংকের মূলমন্ত্র এখানেই।”
তিনি বলেন, ‘‘আমাদের রিকভারি এবং মনিটরিং ডিপার্টমেন্টকে অনেক জোরদার করা হয়েছে, তাদের কার্যক্রম অনেক বেশি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’’
ব্যাংকিং খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) অন্যান্য প্রযুক্তির বিকাশ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘ব্যাংক খাত ডিজিটাল হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিন্তু অনেক পথ এগিয়েছে।
“বর্তমানে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মূল বিষয়টা হচ্ছে ‘ক্যাশলেস’ লেনদেন।”
দেশে ব্যাংক একীভূত করার বিষয়েও নিজের মূল্যায়ন তুলে ধরেন মোসলেহ উদ্দীন। তার মতে, শুধু দুর্বল ব্যাংকগুলোকে এক করে দিলেই তা ফলপ্রসূ হয় না।
“আমি দুর্বল, আরেকটা দুর্বল ব্যাংকের সঙ্গে মার্জ হলে আমি তো নিজেই বিপদে পড়ে যাব। মার্জ এভাবে হয় না। মার্জ চাপিয়ে দিয়ে হয় না। মার্জ হতে হবে শক্তিশালী একটা ব্যাংকের সঙ্গে দুর্বল একটা ব্যাংকের; এটাই পদ্ধতি।”