Published : 05 Nov 2025, 12:33 AM
রাষ্ট্রায়ত্ত এয়ারলাইন বিমানের জন্য উড়োজাহাজ কেনার যে আলাপ চলছে, সেখানে ইউরোপীয় কোম্পানি এয়ারবাসকে রাখার চাপ বাড়ছে সরকারের ওপর।
মঙ্গলবার ফ্রান্স দূতাবাসে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা একযোগে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন, উড়োজাহাজ কেনার আলোচনায় যেন এয়ারবাসকে ‘যৌক্তিকভাবে’ বিবেচনা করা হয়।
তারা ইউরোপে কয়েক বিলিয়ন ইউরোর বাংলাদেশি পণ্যের বাজার, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ, যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার এবং দীর্ঘ অংশীদারত্বের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন বারবার।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার তার বক্তব্যের শেষে বলেছেন, “বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে বিপুল প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেই আলোচনার টেবিলে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অবশ্যই তার জায়গা করে দিতে হবে।”
ইউরোপের ব্যবসায়িক সংস্থাগুলো যেন বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করতে পারে, সেই ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ইইউ রাষ্ট্রদূত।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প চলতি বছর চেয়ারে বসেই যে বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন, তার প্রভাব পড়ে বাংলাদেশেও। ডনাল্ড ট্রাম্পের ৩৫ শতাংশ শুল্কের খড়গ থেকে বাঁচতে গত জুলাই মাসে অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিন কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করে।
তবে ফ্রান্সের কোম্পানি এয়ারবাস থেকে বিমানের জন্য ১০টি বড় উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এয়ারবাস কেনার ওই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাংলাদেশ। তবে ২০১৪ সালের অগাস্টে সরকার বদলের পর সে উদ্যোগে তেমন কোনো গতি দেখা যায়নি।
বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ট্রাম্পের চাপের মুখে গত জুলাই মাসে বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান আগের সিদ্ধান্ত বদলের কথা জানান। বিমানের জন্য ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার অর্ডার করার কথাও তিনি জানান।

এরপর ইউরোপও নড়েচড়ে বসে। এয়ারবাস বিক্রির জন্য তারাও চাপ দিতে থাকে সরকারের ওপর।
গত জুন মাসেই অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস যুক্তরাজ্য সফরে গেলে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এয়ারবাসের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ভাউটার ভ্যান ভার্স। এর পর থেকে কোম্পানির প্রতিনিধিরা সরকারের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ রেখে চলেছেন।
তবে এয়ারলাইন্স ব্যবসায় উড়োজাহাজের প্রয়োজন হলে সেই চাহিদা সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তরফ থেকে আসার নিয়ম রয়েছে। এখানে যার জন্য উড়োজাহাজ কেনা হচ্ছে, সেই বিমানকেই রাখা হচ্ছে অন্ধকারে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে মঙ্গলবার ‘ইউরোপিয়ান অ্যাম্বাসেডর্স ডায়ালগ অন বাংলাদেশ এভিয়েশন গ্রোথ’ শীর্ষক আলোচনায় যুক্ত হন চার রাষ্ট্রদূত। পাশাপাশি সেখানে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতের প্রবৃদ্ধি ও এয়ারবাস নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন এয়ারবাস কর্মকর্তারা।
ডায়লগে ব্রিটিশ হাই কমিশনার সারাহ কুক বলেন, “আগামী বছর এলডিসি থেকে উত্তরণের কথা রয়েছে বাংলাদেশের। এই যাত্রায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও গণতন্ত্রের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে সমর্থন করে যাচ্ছে যুক্তরাজ্য। বাংলাদেশের এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের পেছনে যুক্তরাজ্যের অনেক বড় অবদান রয়েছে।
“বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগের বড় উৎস যুক্তরাজ্য। পাশপাশি বাংলাদেশি রপ্তানিপণ্যের বড় বাজারও যুক্তরাজ্য। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বাণিজ্য প্রকল্পের (ডিসিটিএস) আওতায় বাংলাদেশ ২০২৯ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। এছাড়া বাংলাদেশি ব্যবসাগুলোর জন্য এই দীর্ঘমেয়াদী নিশ্চয়তার সুবিধা পেতে থাকবে পোশাকখাতসহ ৯৮ শতাংশ রপ্তানি পণ্য।”
সারাহ কুক বলেন, “বাংলাদেশের কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কার, ব্যবসায়িক পরিবেশের উন্নতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর কাজেও সহযোগিতা করছে যুক্তরাজ্য। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ ব্যাংক, রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে যুক্তরাজ্যের অংশীদারত্ব রয়েছে।… এখন আমরা বিমান চলাচলসহ নতুন সুযোগগুলোও উন্মোচন করতে চাই। কারণ আমাদের লক্ষ্য হল পারস্পরিক সমৃদ্ধির জন্য দ্বি-মুখী বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা।”
ব্রিটিশ হাইকমিশনার বলেন, এয়ারবাসের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক এভিয়েশন হাবে পরিণত করার লক্ষ্য পূরণে যুক্তরাজ্য ‘সহায়তা করতে চায়’।
পাশাপাশি তিনি ২০২৩ সালের মে মাসে বাংলাদেশ ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারত্ব বিষয়ক যৌথ ঘোষণার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন।
বর্তমানে বিমান বহরের ২১টি এয়ারক্রাফটের মধ্যে ১৬টি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি বোয়িংয়ের তৈরি। এর মধ্যে ছয়টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার, চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর আর ছয়টি ন্যারোবডির বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ রয়েছে।
এর বাইরে বিমানের বহরে স্বল্পদূরত্বের রুটে চলাচল উপেযোগী পাঁচটি ড্যাশ-৮০০ উড়োজাহাজ রয়েছে, যেগুলো কানাডার তৈরি।
বহরে এয়ারবাস থাকলে মিশ্র বহরের (মিক্সড ফ্লিট) রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালনের (মেনটেইন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন) ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়–এমন কথা প্রচলিত রয়েছে এভিয়েশন খাতে।
সারাহ কুক মিক্সড ফ্লিটের বিষয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, “আমরা এর মধ্যেই বৈচিত্রের গুরুত্বের বিষয়ে জেনেছি। আমরা জানি যে ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, জাপান-এর মত গতিশীল বাজারগুলোতে মিশ্র বহরের কৌশল সত্যিই পরিচালনগত ও বাণিজ্যিক মূল্য যোগ করতে পারে এবং তা বাড়াতে পারে।”
এই অংশীদারত্বকে সুসংহত করার চলমান আলোচনাগুলো ‘অবাধ এবং ন্যায্য’ উপায়ে পরিচালিত হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন সারাহ কুক।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার বলেন, “আমি জানাতে চাই যে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে আগের চেয়ে ভালো একটি সমন্বিত অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি চূড়ান্ত করার খুব কাছাকাছি।”
তিনি বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন হল বাংলাদেশের জন্য এখন পর্যন্ত বৃহত্তম রপ্তানি বাজার, যে বাজার যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক বড়। ২০২৪ সালে ইইউ এবং বাংলাদেশের মধ্যে পণ্য বাণিজ্য ২২ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে, যেখানে ইইউ-এর জন্য ১৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন ইউরোর বাণিজ্য ঘাটতি ছিল। এই বাণিজ্য ঘাটতি বাংলাদেশের অন্য যে কোনো অংশীদারের সঙ্গে যে বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে তার তুলনায় অনেক বেশি।”
মিলার বলেন, “আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের জন্য একটি মসৃণ এলডিসি উত্তরণ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ইইউ-এর জিএসপি প্লাস ব্যবস্থার অধীনে শুল্ক সুবিধার জন্য আবেদন করার সুযোগ পাবে বাংলাদেশ ।
“একইসাথে, উন্নত অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি এবং জিএসপি প্লাস বাংলাদেশের সঙ্গে ইইউর অংশীদারত্বের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের একটি সুযোগ দেয়। এটাকে স্বীকৃতি দিতে এবং স্বচ্ছতা ও সমঝোতার মাধ্যমে আমাদের ভবিষ্যতের কার্যক্রমকে সুদৃঢ় করতে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে ইইউ।”
তিনি বলেন, “সংক্ষেপে, আমরা বাংলাদেশের কাছে অনুরোধ করছি, আমাদের ব্যবসায়িক সংস্থাগুলো যেন বাণিজ্যিক যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা করার অনুমতি পায়। আমরা একটি লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রত্যাশা করি, যার অর্থ হল, আমরা চাই ইইউর ব্যবসাগুলো যেন বাংলাদেশ অন্য কোনো বাণিজ্য অংশীদারের তুলনায় কম আনুকূল্য না পায়, সেটা নিশ্চিত করা।
“বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে বিপুল প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেই আলোচনার টেবিলে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অবশ্যই তার জায়গা দিতে হবে।”
ফরাসি রাষ্ট্রদূত জ্যাঁ-মার্ক সেরে-শার্লে বলেন, “ফ্রান্স এবং ইউরোপের এভিয়েশন খাতের একদম কেন্দ্রে অবস্থান করছে এয়ারবাস। প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং উদ্ভাবনের সংমিশ্রণ এয়ারবাসকে কেবল ইউরোপীয় শিল্পের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক নয় বরং বিশ্বজুড়ে এয়ারলাইন্সগুলোর একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার করে তুলেছে।
“এই কারণে আমরা বিশ্বাস করি, এয়ারবাস বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হবে, যা আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করছে। ক্রমবর্ধমান কানেক্টিভিটির প্রয়োজনীয়তা এবং একটি কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান থাকার কারণে, আঞ্চলিক বিমান চলাচল কেন্দ্রে পরিণত হওয়ার সমস্ত উপাদানই বাংলাদেশের রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে এয়ারবাস বিমান বাংলাদেশের কাছে এই রূপান্তরকে সহায়তা করার জন্য একটি ব্যাপক এবং প্রতিযোগিতামূলক সমাধান উপস্থাপন করেছে।”
ইউরোপীয় ঋণদাতারাও এ বিষয়ে আগ্রহী জানিয়ে তিনি বলেন, “আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, এয়ারবাসের এই প্রস্তাবটিকে বহুজাতিক এই কোম্পানির অংশীদার চারটি ইউরোপীয় দেশই দৃঢ়ভাবে সমর্থন করছে। আমাদের সংশ্লিষ্ট এক্সপোর্ট ক্রেডিট এজেন্সিগুলি ইতোমধ্যে এই চুক্তিতে সহায়তার জন্য তাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছে।”
জার্মানির রাষ্ট্রদূত র্যুডিগার লোটৎস এয়ারবাসের প্রযুক্তিগত নানা দিক তুলে ধরে বলেন, পরিবেশগত দিক থেকেও এয়ারবাস ‘সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন’।
বাংলাদেশের ‘এভিয়েশন হাব’ হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এয়ারবাসের উড়োজাহাজ ‘সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত’ হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূতদের বক্তব্যের পর এয়ারবাসের পক্ষ থেকে উপস্থাপনা তুলে ধরেন বাংলাদেশে কোম্পানির প্রধান প্রতিনিধি রাফায়েল গোমেজ নেয়া এবং ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার বিপণন প্রধান মোনাল শেস। তারা সাংবাদিকদের কিছু প্রশ্নেরও জবাব দেন।
এক প্রশ্নের জবাবে রাফায়েল গোমেজ বলেন, এ পর্যন্ত সারা বিশ্বের ৪৫০ এর বেশি কাস্টমারের কাছ থেকে ২৫ হাজার ১২৯টি উড়োজাহাজের অর্ডার পেয়েছে এয়ারবাস। এরমধ্যে ১৬ হাজার ৪৭০টি তারা সরবরাহ করতে পেরেছে।
এখনো ৮ হাজার ৬৫৯টি উড়োজাহাজ সরবরাহের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশ যদি এখনই অর্ডার করে তবুও উড়োজাহাজ পেতে কয়েক বছর সময় লেগে যাবে।
পুরনো খবর
বোয়িং কেনার আলোচনার মধ্যে বিমানের নতুন ব্যামো
২৫টি বোয়িং কেনা হচ্ছে, জানেই না বিমান!
এয়ারবাসের ১০টি উড়োজাহাজ কিনবে বাংলাদেশ
বিমানের ব্যামো এয়ারবাসে সারবে?
এয়ারবাসই কিনছে বিমান, জানিয়ে গেলেন বিদায়ী এমডি