Published : 15 Aug 2025, 01:49 AM
বিমানের জন্য যখন একযোগে ২৫টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার কথা চলছে, তখন রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনটির বহরে থাকা বোয়িংগুলো একের পর এক যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়ছে।
২৮ দিনে বিমানের বোয়িং আটবার ও একটি ড্যাশ উড়োজাহাজ যান্ত্রিক ত্রুটির কবলে পড়েছে। এসব অঘটনের কারণে ওড়ার কিছুক্ষণ পরে উড়োজাহাজগুলোকে আবারও যাত্রার বিমানবন্দরে ফিরে আসতে হয়েছে। মেরামতের জন্য নির্ধারিত সময়ের কয়েকঘণ্টা পরে উড়তে হয়েছে।
একের পর এক এসব ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে–এর পেছনে কি শুধুই যান্ত্রিক গোলযোগ? তাহলে কি উড়োজাহাজগুলোর রক্ষনাবেক্ষণে বিমানের সক্ষমতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে? নাকি এসব নাশকতা?
এমনকি বিমানের একজন মহাব্যবস্থাপকও বিষয়টিকে ‘অস্বাভাবিক’ বলেছেন। একের পর এক উড়োজাহাজ গোলযোগে পড়ায় সময়সূচি ঠিক রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বিমানকে।
মঙ্গলবার কুয়েত ও দুবাইয়ের ফ্লাইট বাতিল করে বুধবার যাত্রার সময় ঘোষণা করা হয়। বুধবার আরও অন্তত চারটি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে।
এর মধ্যে মদিনাগামী (বিজি-২৩৭) ফ্লাইটটির ঢাকা ছাড়ার নির্ধারিত সময় ছিল বিকেল ৪টায়। কিন্তু যাত্রীদের জানানো হয়, ফ্লাইট ছাড়তে অন্তত চার ঘণ্টা বিলম্ব হবে। একইভাবে ঢাকা থেকে দুবাইগামী ফ্লাইটও চার ঘণ্টা বিলম্বিত হয়।
এছাড়া বিমানের জেদ্দা ফ্লাইট আধঘণ্টা এবং কুয়েত ফ্লাইট দেড়ঘণ্টা বিলম্বে ছেড়ে যায়।
গোলযোগের দিনলিপি
দুই বছর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যখন বিমানের জন্য এয়ারবাস কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়, তখনই প্রশ্ন উঠেছিল সেই উড়োজাহাজগুলো কাজে লাগানোর সক্ষমতা রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইনটির আছে কি না।
এয়ারবাস কেনার আলাপ ঝুলে থাকার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের চাপ কমাতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিমানের জন্য ২৫টি বোয়িং কেনার ঘোষণা দিয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে যখন এ বিষয়ে ঘোষণা এল, বিমানের পক্ষ থেকে তখন বলা হয়েছিল, বোয়িং কেনার বিষয়টি তারা ‘জানেই না’। ঠিক একই সময়ে বিমানের বোয়িংগুলো একের পর এক যান্ত্রিক গোলযোগে পড়তে শুরু করল।
এটা কাকতালীয়, না অন্য কিছু, সেই প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও আলোচনা চলছে।
বিমানের বহরে থাকা ২১টি উড়োজাহাজের মধ্যে দুটো উড়োজাহাজ গত সোমবার যান্ত্রিক গোলযোগের শিকার হয়।
সেদিন দুপুরে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ওড়ার কিছুক্ষণ পরেই আবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ফিরে আসে বিমানের একেটি ড্যাশ ৮- ৪০০ সিরিজের টার্বোপ্রপেলার উড়োজাহাজ।
ওড়ার পর উড়োজাহাজটির ভেতরের তাপমাত্রা ‘অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায়’ পাইলট আবার ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। ২৮ দিনের মধ্যে এটি বিমানের উড়োজাহাজের নবম যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা।
একই দিনে (সোমবার) ফ্ল্যাপে সমস্যার কারণে ইতালির রোমের লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি বিমানবন্দরে গ্রাউন্ডেড হয়ে ছিল বিমানের একটি বোয়িং ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজ।
বিমান কর্মকর্তারা তখন জানান, লন্ডন থেকে যন্ত্রাংশ পাঠানোর পর উড়োজাহাজটি মেরামত করে ঢাকায় ফেরত আনা হবে।

নিয়ম অনুযায়ী উড়োজাহাজের ২৬২ যাত্রীকে হোটেলে পাঠায় এয়ারলাইন কর্তৃপক্ষ। মেরামত শেষে যাত্রীদের নিয়ে বুধবার ঢাকায় ফেরে উড়োজাহাজটি।
তার আগে ৭ অগাস্ট রাতে বিমানের আবুধাবিগামী একটি বোয়িং ওড়ার এক ঘণ্টা পর আবার ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরে আসে।
উড়োজাহাজটির তিনটি টয়লেটের ফ্লাশ একযোগে কাজ না করায় ভেতরে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়, পরে পাইলট সেটিকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনেন।
তার একদিন আগে ৬ অগাস্ট ঢাকা থেকে ওড়ার একঘণ্টা পর মিয়ানমারের আকাশ থেকে ফিরে আসে বিমানের ব্যাংককগামী একটি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ। ওড়ার কিছুক্ষণ পর ইঞ্জিনে ‘অতিরিক্ত কম্পন’ হচ্ছে বুঝতে পেরে ঢাকায় ফিরে আসেন পাইলট।
এর আগে গত ৩০ জুলাই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দীর্ঘ সময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ বিমানবন্দরে আটকে ছিল বিমানের একটি বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ। নির্ধারিত সময়ের ৬ ঘণ্টা পরে বিমানটি ঢাকায় ফেরানো হয়।
তার দুদিন আগে ২৮ জুলাই ওড়ার পর ‘কেবিন প্রেশারে ত্রুটির সংকেত’ পেয়ে আবার ঢাকায় ফিরে আসে বিমানের দাম্মামগামী একটি বোয়িং ৭৭৭-ইআর উড়োজাহাজ। পরে যাত্রীদের অন্য উড়োজাহাজে দাম্মাম পাঠানো হয়।
তার চারদিন আগে গত ২৪ জুলাই দুবাই থেকে চট্টগ্রামে এসে যান্ত্রিক ত্রুটির মুখে পড়ে বিমানের আরেকটি বোয়িং ড্রিমলাইনার। উড্ডয়নের কিছু সময় পর পাইলট ‘ল্যান্ডিং গিয়ারের দরজা ঠিকভাবে বন্ধ না হওয়ার’ বিষয়টি শনাক্ত করলে সেটি আবার চট্টগ্রামে ফিরে যায়। ত্রুটি মেরামত শেষে দুই ঘণ্টা পর সেটি আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
তার আট দিন আগে গত ১৬ জুলাই রাতে ‘চাকায় ত্রুটি’ দেখা দেওয়ায় বিমানের দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকা রুটের একটি বোয়িং ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার উড়োজাহাজকে দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ‘গ্রাউন্ডেড’ করা হয়।
বিমানের আরেকটি ফ্লাইটে চাকা ও যন্ত্রাংশ পাঠানো পর উড়োজাহাজটি মেরামত করা হয়। ৩০ ঘণ্টা বিলম্বে দেশে ফেরে উড়োজাহাজটি।

‘দুঃখজনক এবং অস্বাভাবিক’
উপর্যুপরি এসব ঘটনায় বিমান কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে কিনা জানতে চাইলে এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ শাখার মহাব্যবস্থাপক এ বি এম রওশন কবীর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কেন এরকম ঘন-ঘন দুর্ঘটনা ঘটছে, সেটা নিয়ে প্রকৌশল বিভাগ তো নিজেদের মত করে তদন্ত করছেই। তবে প্রতিটি ত্রুটিই হচ্ছে ইউনিক, একটির সঙ্গে আরেকটির মিল নেই।
“এটা খুবই দুঃখজনক। ঘটনাগুলো খুব অল্পসময়ের মধ্যেই ঘটেছে এটা আশ্চর্যের বিষয়। একই সমস্যা কিন্তু বারবার হচ্ছে না। এটা সত্যিকার অর্থেই অস্বাভাবিক।”
তিনি বলেন, “অনেকগুলো ক্ষেত্রে হয়ত প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ থাকে না। যেসব ঘটনা দেশের বাইরে ঘটছে, তখন আবার এটা সারাতে সময় লাগছে। ত্রুটির কারণে যখনই যে ফ্লাইটে দেরি হচ্ছে, তখন শিডিউল ঠিক রাখার জন্য আবার অনেকগুলো এয়ারক্রাফটকে উপর্যুপরি ব্যবহার করা লাগছে। এরকম বিভিন্ন কারণে এসব ঘটনা ঘটছে।
“আমাদের প্রকৌশল বিভাগ সেগুলোর সমাধানও করছে, সুতরাং তাদের দক্ষতার অভাব আছে সেটাও বলা যাচ্ছে না।”
বিমানের প্রধান প্রকৌশলী এ আর এম কায়সার জামান দুই মাস ধরে রয়েছেন হাঙ্গেরিতে। এ বিষয়ে তার কাছে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিমানের মুখপাত্র এ বি এম রওশন কবীর।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য কায়সার জামানকে ফোন করা হলে সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তবে সেই নম্বরে হোয়াটসঅ্যাপ চালু রয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে কল করা হলে তিনি ধরেননি।
মার্কিন কোম্পানি বোয়িং থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার যে প্রক্রিয়া চলছে, সেই বহর সামলানোর সক্ষমতা বিমানের আছে কিনা–এই প্রশ্নের জবাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি রওশন কবীর।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানের একজন কর্মকর্তা বলেন, কোনো রুটে নতুন উড়োজাহাজের প্রয়োজন হলে এয়ারলাইনের তরফ থেকে তা কর্তৃপক্ষকে জানানোর কথা। কিন্তু এখানে ‘নজীরবিহীনভাবে’ বিমানকে পাশ কাটিয়ে সরকারের তরফ থেকে ২৫টি বোয়িং এর অর্ডার দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
“সে কারণে ২৫টি উড়োজাহাজ কী প্রক্রিয়ায় কাজে লাগানো হবে, কীভাবে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ হবে এসব বিষয়ে বিমান এখনো চূড়ান্ত কোনো পরিকল্পনা করে উঠতে পারেনি।”
বিমানের আরেক কর্মকর্তা জানান, বারবার গোলযোগে যে জটিলতা তৈরি হয়েছে, তা সামাল দিতে দুটো উড়োজাহাজ ভাড়া (লিজ) নেওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে বিমান।
কী ঘটে থাকতে পারে?
এর আগে ২০১৪ সালে ইজিপ্ট এয়ার থেকে দুটো বোয়িং লিজে এনে বিমান সরকারের ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা গচ্চা দিয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। দুর্নীতি দমন কমিশন বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে। বিমানের কর্মকর্তারা পরে বলেছিলেন, ওই ১১০০ কোটি টাকা গচ্চা গেলেও তারা শিক্ষা নিয়েছেন।
দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত প্রধান প্রকৌশলী কায়সার জামান ইজিপ্ট এয়ার দুর্নীতি মামলার প্রধান আসামি। এছাড়া তার বিরুদ্ধে বিমানের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগও রয়েছে।
এসব প্রসঙ্গ টেনে সোশাল মিডিয়ায় নানা যুক্তি দেখিয়ে বিমানের উড়োজাহাজগুলোর একের পর এক জটিলতায় পড়ার বিষয়টিকে ‘ষড়যন্ত্র’ হিসেবে দেখাতে চাইছেন কেউ কেউ।
ফেইসবুকে শেয়ার করা বিমানের সংবাদগুলোর নিচে মন্তব্য করে কেউ আবার ‘সক্ষমতার অভাবের’ কথা বলেছেন।
এসব বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহেদুল আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "পরিকল্পনা করে তো মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার কোনো সুযোগ নেই। এবং কেউ সেটা করবেও না মনে হয়। এগুলো কোইনসিডেন্স।
“যখন বোয়িং কেনার কথাবার্তা চলছে তখন এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটছে। এসব নিয়ে মানুষের মনের প্রশ্ন দেখা দিতেই পারে। তবে আমি এরকম কিছু মনে করি না।”
কেন এরকম হতে পারে তার ব্যাখ্যা দিয়ে বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাবেক এই সদস্য বলেন, “প্রথমত বিমানের এয়ারক্রাফ্টগুলো পুরনো হয়ে গেছে। উড়োজাহাজগুলোর বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এগুলোর যে ইঞ্জিন আছে, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, হাইড্রোলিক কম্পোনেন্টগুলো আছে সেগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হতে থাকে।
“এগুলোর ওয়ারেন্টিও ততদিনের শেষ হয়ে যায়। যেমন বোয়িং ৭৭৭ একটা আছে যেটা ২০১১ সালে আনা হয়েছিল। ওর বয়স ১৪ বছর হয়ে গেছে। এরকম ১২ বছর, ১০ বছর, ৮ বছর বয়স হয়েছে এয়ারক্রাফ্টগুলোর।”

ওয়াহেদুল আলম বলছেন, উড়োজাহাজগুলো নির্মাণের সময় কোনো ত্রুটি থাকলে কখনো কখনো অনেকদিন ব্যবহারের পর তা ধরা পড়ে।
"একটা সার্টেইন টাইম যাওয়ার পর, ৫-১০ বা ১৫ বছর হতে পারে... এরকম সময় পর হয়ত সেগুলো প্রকাশ পায়। কাজেই এই উড়োজাহাজগুলো অনেক দিন ব্যবহারের পর সেরকম কিছু কিছু সমস্যা এখন বেশি দেখা দিচ্ছে।"
এর সঙ্গে উড়োজাহাজগুলো রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রেও বিমানের দক্ষতার ঘাটতি আছে বলে মনে করছেন ওয়াহেদুল আলম।
তিনি বলেন, "আমাদের এখানে মেনটেইনেন্সে দক্ষতার ঘাটতি তো আছেই। কারণ আমাদের বিমানের যে নিয়োগ প্রক্রিয়া, সেখানে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির অনেক অভিযোগ আমরা অতীতে শুনেছি। যোগ্যতর লোক যোগ্য জায়গায় স্থান পায়নি। সে কারণে মেনটেইনেন্সের ক্ষেত্রেও কিছুটা ভুল ভ্রান্তি হয়ে থাকতে পারে।
“এখন আমাদের মেনটেইনেন্সের ইঞ্জিনিয়ারিং টিম আরো দক্ষতাসম্পন্ন হওয়া উচিত। এর জন্য এই সমস্ত জায়গার নিয়োগ প্রক্রিয়াগুলো স্বচ্ছ হওয়া উচিত, যাতে দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি এড়িয়ে যোগ্যতার লোকগুলোকে নিয়োগ দেওয়া যায়।"
ওয়াহেদুল আলম বলছেন, এয়ারক্রাফট পুরনো হবেই। সেগুলো ‘মেনটেইন’ করেই সারা পৃথিবীর এয়ারলাইন্সগুলো ব্যবসা করছে।
“মোদ্দা কথা হল রক্ষণাবেক্ষণ মানসম্পন্ন হতে হবে। মেনটেইনেন্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে যোগ্য ও দক্ষ লোক থাকতে হবে। এখন ছোটখাটো যে ঘটনাগুলো ঘটছে, এর চেয়ে বড় কিছু যেন না ঘটে, সে বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে এখনই।"
সক্ষমতার পাটিগণিত
বিমান বহরের এখন ২১টি এয়ারক্রাফটের মধ্যে ১৬টি বোয়িং। এর মধ্যে ছয়টি বোয়িং ৭৮৭ ড্রিমলাইনার, চারটি বোয়িং ৭৭৭-৩০০ ইআর আর ছয়টি ন্যারোবডির বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ রয়েছে।
এর বাইরে বিমানের বহরে স্বল্পদূরত্বে রুটে চলাচল উপযোগী পাঁচটি ড্যাশ- ৮০০ উড়োজাহাজ রয়েছে।
এই উড়োজাহাজগুলো বিমান পুরোমাত্রায় ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে কি না– তা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে।
কিনতে গেলে বিমানের টিকিট পাওয়া যায় না, অথচ যাত্রার সময় দেখা যায় আসন খালি–যাত্রীদের এরকম অভিযোগ অনেক পুরনো।
বিমান অবশ্য বলেছে, এখন একসঙ্গে অনেকগুলো টিকিট ‘ব্লক করে রাখার’ কোনো সুযোগ নেই। টিকিট বিক্রি না হলে সেটি সিস্টেমে ফাঁকা দেখাবে।
বিমানের নিজেদের করা একটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অবশ্য যাত্রীদের ওই অভিযোগকে সমর্থন করে।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিমানের এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (এওসি) রিনিউয়ালের অংশ হিসেবে যে অডিট হয়েছিল, তাতে এ সংস্থার সক্ষমতার বা অক্ষমতার একটি চিত্র পাওয়া যায়।
সেখানে বলা হয়, ২০২২ সালে আন্তর্জাতিক রুটে বিমানের ২৭ লাখ ১১ হাজার ৩৬৭টি আসনের মধ্যে বিক্রি হয়েছিল ২০ লাখ ৫৮ হাজার ৫৭১টি আসন। ৬ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৬টি সিট খালি ছিল, যা মোট আসনের ২৪ শতাংশের মত।
আর অভ্যন্তরীণ রুটে ১১ লাখ ৪১ হাজার আসনের মধ্যে বিক্রি হয়েছে ৮ লাখ ৬৫ হাজার আসন। খালি ছিল ২ লাখ ৭৫ হাজার আসন, যা মোট আসনের ২৪ দশমিক ১৪ শতাংশ।
সবচেয়ে বেশি খালি গেছে বিমানের কার্গোস্পেস। আন্তর্জাতিক রুটে বিমান যতোগুলো ফ্লাইট চালিয়েছে তাতে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ৪৩৫ টন কার্গো বহনের সক্ষমতা ছিল, কিন্তু বিমান মোটে ২৮ হাজার ৮৭ টন কার্গো বহন করেছে। অর্থাৎ বিমানের কার্গো সক্ষমতার মোট ৯৪ দশমিক ৩৬ শতাংশ খালিই ছিল।
অভ্যন্তরীণ রুটের কার্গো সক্ষমতারও বিপুল অপচয় হয়েছে। বিমান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রীদের ব্যাগেজ ছাড়া তেমন কার্গো থাকে না। অথচ আন্তর্জাতিক রুটে কার্গো বহনের বড় সুযোগ ছিল।
২১টি উড়োজাহাজের বহরই বিমান রক্ষণাবেক্ষণ করে রাখতে পারছে না, সবগুলো উড়োজাহাজের বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারছে, সেখানে আরো ২৫টি উড়োজাহাজ সামলে রাখার সক্ষমতা বিমানের আছে কি না, সেই প্রশ্ন করছেন অনেকে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে কাজী ওয়াহেদুল আলম বলেন, "সত্যি কথা হচ্ছে বিমানের সেই সক্ষমতা নেই। কারণ এখন বিমানের যে কাঠামো এবং যে নেতৃত্বের (হায়ারার্কি) জায়গাটি রয়েছে, সেটি সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আমলাতন্ত্র দিয়ে তো একটা এয়ারলাইন চলতে পারে না।”
তিনি বলেন, “প্রফেশনালদের দিয়েই একটি এয়ারলাইন চালাতে হবে। আমরা আশা করেছিলাম এই ইন্টেরিম সরকারের সময় বিমানের নিয়োগ পদ্ধতি পরিবর্তন হবে এবং এর পরিচালনা পদ্ধতিরও কিছু পরিবর্তন আমরা দেখতে পাব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা সেরকম কিছু দেখতে পাইনি। বিমান আগে যেভাবে চলেছে, এখনো সেই গতানুগতিক পথেই আছে।"
ওয়াহেদুল আলম বলছেন, টিকে থাকতে হলে বিমানকে নতুন এয়ারক্রাফট আনতেই হবে। রুট বাড়াতে হবে, মার্কেট শেয়ার বাড়াতে হবে।
“একটা প্রতিষ্ঠানতো এক জায়গায় বছরের পর বছর আটকে থাকতে পারে না। গত ১৫-২০ বছর ধরেই বিমানের কোনো অগ্রগতি নেই। নতুন রুট ওপেন করে আবার বন্ধ করে দিতে হয়েছে–এমন ঘটনা কম নয়।"

তার মধ্যেও বাংলাদেশের এভিয়েশনের বাজার যে প্রতিবছর দ্রুত গতিতে বাড়ছে, সে কথা তুলে ধরে বিমান পরিচালনা পর্ষদের এই সাবেক সদস্য বলেন, “অথচ বিমান বহু বছর ধরেই এক জায়গায় আটকে আছে। এই মার্কেটে বিমানকে নিজের শেয়ার বাড়াতেই হবে। এর জন্য রুট বাড়াতে হবে, ফ্রিকোয়েন্সি (ট্রিপ) বাড়াতে হবে।
“আর এসবের জন্য নতুন এয়ারক্রাফট লাগবেই। আরও দক্ষতা সম্পন্ন লোকজনও লাগবে। বিমানকে একটা কমার্শিয়াল এয়ারলাইন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ দিতে হবে। বিমানে এখনো এত সরকারি আমলাতন্ত্রের জটিলতা রয়ে গেছে, এগুলো সরাতে না পারলে এ ধরনের ত্রুটিগুলো থাকবেই।"
পুরনো খবর-
উড়োজাহাজ লিজ: লোকসান থেকে 'শিক্ষা নিয়েছে' বিমান
ফ্ল্যাপের ত্রুটিতে রোমে আটকা বিমানের বোয়িং, ২৮ দিনে অষ্টম জটিলতা