১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

পেনশন পুনঃস্থাপন চেয়ে ফের গ্রামীণ ব্যাংকের সামনে অবসরে যাওয়া কর্মীরা

“আমরা কোনো চাঁদাবাজ না, সন্ত্রাসী না, ভিক্ষুক না…আমরা শুধু ন্যায্য পাওনার জন্য আসছি।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 11 Oct 2026, 03:44 PM

Updated : 11 Oct 2026, 03:44 PM

চিকিৎসা ভাতা, উৎসব ভাতা ও পুনঃপেনশন চেয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ফের অবস্থান নিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

রোববার সকাল ১০ টা থেকে ঢাকার মিরপুর-২ নম্বরে প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ‘গ্রামীণ ব্যাংক অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ পরিষদের’ ব্যানারে এ কর্মসূচি শুরু করেন সাবেক কর্মীরা।

বেলা আড়াইটার দিকেও তাদের কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছেন বলে জানিয়েছেন মিরপুর মডেল থানার ওসি হাফিজুর রহমান।

তিনি বলেন, “তারা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন, এছাড়া এখানে কোনো ঝামেলা নেই। দেখি তারা কতক্ষণ থাকে বা কী কর্মসূচি ঘোষণা করে। তারাও আছে, আমরাও আছি।”

অবস্থানকারীদের মধ্যে অনেকের অভিযোগ, চাকরির বয়স শেষ হওয়ার আগেই অনেককে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় গ্রামীণ ব্যাংক।

এমন অবস্থায় তারা মাসিক পেনশন চালুর পাশাপাশি চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা চান।

পেনশন পুনঃস্থাপন হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী অবসরে যাওয়ার ১৫ বছর পূর্তির পর পুনরায় মাসিক পেনশন পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।

কর্মীদের দাবি এবং মালিকপক্ষের ‘কর্ণপাত না করার’ অভিযোগের মধ্যে সবশেষ ২০২১ সালে ‘সংক্ষুব্ধ অবসরপ্রাপ্তদের পক্ষে’ হাই কোর্টে রিট আবেদন করা হয়। এর শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ হাই কোর্ট অবসরপ্রাপ্তদের অনুকূলে রায় দেয়, যেটির পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে চলতি বছরের ২২ জুন।

এমন অবস্থায় গেল কয়েক মাসে দফায় দফায় সংবাদ সম্মেলন-মানববন্ধন শেষে রোববার সকাল থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়েছেন কয়েকশ অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী।

তাদের মধ্যে এক নারী বলেন, “আমরা কোনো চাঁদাবাজ না, সন্ত্রাসী না, ভিক্ষুক না। কোনো বিশৃঙ্খলা আমাদের নেই। আমরা শুধু ন্যায্য পাওনার জন্য আসছি।”

গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইউনূসকে উদ্দেশ্য করে ওই নারী বলেন, “উনি তো নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন আমাদের কারণে। আমাদেরকে ভিক্ষুক বানিয়ে উনি প্রজ্ঞাপন জারি করে হাতের তালি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।”

আন্দোলনরতদের মধ্যে আরেকজন বলছেন, গ্রামীণ ব্যাংকে ‘ইউনূসের আমলাদের অত্যাচার-নির্যাতনে বাধ্য হয়ে’ তারা চাকরি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন।

“আমরা যারা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আছি, তাদের অবসরের ১৫ বছর হলে তাদেরকে পুনঃপেনশন দেওয়ার কথা। আমাদেরকে দুই ঈদে দুইটা বোনাস এবং বৈশাখী ভাতা এগুলা দেওয়ার কথা। চিকিৎসা ভাতা প্রচলিত আইন অনুযায়ী আমাদেরকে দেওয়ার কথা। হাই কোর্টে রিট অনুযায়ী এই রায় দিছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে দিতেছে না।”

আরেকজন বলেন, তিনি ১৯৮৪ সালে গ্রামীণ ব্যাংকে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু ২০০০ সালে ‘অল্প কিছু টাকা দিয়ে’ তাকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছিল।

“ওইটুকুতে আমার সংসারে কিছু হয়নি। এখন আমার বয়স হয়ে গেছে ৬৭ বছর। বয়সের তুলনায় আমার শরীরে নানান অসুখ ধরে গেছে, আমার সংসারেরও খুব অভাব। আমি পেনশনের টাকা চাই, আমাদের এই ন্যায্য পাওনা থেকে তারা আমাদেরকে বঞ্চিত করছে।”

ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ করে দারিদ্র বিমোচনের চেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৬ সালে গ্রামীণ ব্যাংক ও মুহাম্মদ ইউনূসকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।

১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দীর্ঘ ২৮ বছর গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ছিলেন।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অধ্যাপক ইউনূসকে অবসরের বয়স পেরিয়ে যাওয়ার কারণ দেখিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরে আদালতে গিয়েও তিনি আর সেই পদে ফিরতে পারেননি।

আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মসূচি এবং ইউনূসকে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেনতখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে তিনি দেশত্যাগ করলে সেই ইউনূসের নেতৃত্বেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।

গ্রামীণ ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মীরা বলছেন, ২০০৪ ও ২০১৬ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঘোষিত অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জারি করা প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়ন করছে না প্রতিষ্ঠানটি।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া একাধিক সাবেক কর্মী বলেছেন, তারা দীর্ঘদিন ধরেই গ্রামীণ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছেন।

এমতাবস্থায় দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন আন্দোলনকারীদের কেউ কেউ।