ঘুষ নেওয়ার সময় আটক সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে মামলা, যেভাবে ফাঁদ পাতে দুদক
ঘুষের টাকা কমাতে রাজি হননি আসাদুল, বলা হয় এজাহারে।
ঢাকার লালবাগে জমির সীমানা নির্ধারণ ও নামজারি করে দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ নেওয়ার সময় দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদকের হাতের আটক সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
মো. আসাদুল ইসলাম নামের এ সার্ভেয়ারকে মঙ্গলবার ১ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার সময় আটক করা হয়। তার বিরুদ্ধে ৮০ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগও পাওয়া গেছে।
এদিন দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এ মামলাটি করেন সংস্থাটির সহকারী পরিচালক মো. মাহাবুব মোর্শেদ।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, বেলা ১১টার দিকে লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ে নিজের কক্ষে বসে এক লাখ টাকা ঘুষ নেন সার্ভেয়ার আসাদুল ইসলাম। এ সময় আগে থেকে অবস্থান নেওয়া দুদকের একটি দল তাকে গ্রেপ্তার করে।
৫১ বছর বয়সী আসাদুল ইসলামের বাড়ি কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলায়। তিনি ঢাকার লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয়ে সার্ভেয়ার হিসেবে কর্মরত।
তার বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১৬১ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলা হয়েছে। সরকারি কর্মচারী হিসেবে ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অসদাচরণের অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মামলার এজাহার ও আদালতে আসামিকে হাজতে রাখার আবেদনে ঘুষ দাবির ঘটনা, জমির সীমানা নির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতা এবং দুদকের ফাঁদ অভিযানের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
এজাহার অনুযায়ী, অভিযোগকারী অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য মো. মনিরুল ইসলাম বর্তমানে জমির ব্যবসা করেন। তিনি ঢাকার লালবাগ থানার চর-কামরাঙ্গী মৌজায় ২৮২ শতাংশ জমির মালিকদের কাছ থেকে ২০২১ সালে তিনটি নিবন্ধিত অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নেন। এর মাধ্যমে জমির মালিকদের পক্ষে কাজ করার আইনি ক্ষমতা পান তিনি।
জমির প্রকৃত অবস্থান নির্ধারণ, সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির সীমানা আলাদা করা এবং জমির নকশা তৈরির জন্য গত ২৭ এপ্রিল ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন মনিরুল।
ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১২ মে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রাজস্ব শাখা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) নির্দেশ দেয়।
কিন্তু জেলা প্রশাসকের নির্দেশনার পরও প্রায় ছয় মাস ধরে একাধিকবার যোগাযোগ করে জমির সীমানা নির্ধারণের কাজ শেষ করাতে পারেননি মনিরুল।
এর মধ্যে সীমানা নির্ধারণ ছাড়াই জমির নামজারির আবেদন করেন তিনি। তবে সীমানা নির্ধারণ না হওয়ার কারণ দেখিয়ে আবেদনটি নামঞ্জুর করে লালবাগ রাজস্ব সার্কেল। পরে গত ১২ অক্টোবর ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টরকে (আরডিসি) বিষয়টি জানান মনিরুল।
এজাহারে বলা হয়, মনিরুলের অভিযোগ শুনে আরডিসি লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আমিনুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। তিনি দ্রুত জমির সীমানা নির্ধারণ ও নামজারির ব্যবস্থা নিতে বলেন। একই সঙ্গে মনিরুলকে পরদিন সহকারী কমিশনারের কার্যালয়ে যেতে পরামর্শ দেন।
সেই অনুযায়ী ১৩ অক্টোবর সহকারী কমিশনার আমিনুল ইসলামের কার্যালয়ে যান মনিরুল। তার সঙ্গে ছিলেন সহকর্মী আমান উল্লাহ আমান।
এ সময় সহকারী কমিশনার মনিরুলের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। একই কাজের জন্য বারবার আসার কারণও জানতে চান। পরে তিনি মনিরুলকে সার্ভেয়ার আসাদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
৮০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি, কমাতেও রাজি হননি
এজাহারে বলা হয়েছে, সহকারী কমিশনারের নির্দেশে ১৪ অক্টোবর সার্ভেয়ার আসাদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেন মনিরুল। এ সময় জমির সীমানা নির্ধারণ ও নামজারির কাজ করে দেওয়ার জন্য ৮০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন আসাদুল। তিনি বলেছেন, কাজটি এমনভাবে করা হবে, যাতে তাদের দুজন ছাড়া অন্য কেউ বিষয়টি জানতে না পারেন। ঘুষ দিতে রাজি না হয়ে সেদিন ফিরে যান মনিরুল। পরদিন ১৫ অক্টোবর আবার গেলে ঘুষ ছাড়া কাজ করবেন না বলে জানিয়ে দেন আসাদুল। তখন মনিরুল ঘুষের পরিমাণ কমানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু আসাদুল টাকা কমাতে রাজি হননি বলে এজাহারে বলা হয়েছে।
মামলা বলা হয়, মনিরুল টাকা জোগাড় করতে দুই মাস সময় চান। এ সময় আসাদুল তাকে ৩ নভেম্বর ঘুষের কিছু টাকা অগ্রিম দিতে বলেন। বাকি টাকা কাজ শেষ হওয়ার আগেই পরিশোধ করতে হবে বলেও জানিয়ে দেন। এরপর মনিরুল ঘুষ দাবির বিষয়টি লিখিতভাবে দুদককে অবহিত করেন। গত ২৮ অক্টোবর অভিযোগটি দুদকের ঢাকা-১ জেলা কার্যালয়ে নথিভুক্ত হয়।
তার এ অভিযোগের ভিত্তিতে দুদকের সহকারী পরিচালক সৌরভ দাশকে প্রধান করে একটি দল গঠন করা হয়, যারা ফাঁদ পেতে আসাদুলের দুর্নীতি শনাক্ত করবে।
রোববার অভিযানের অনুমতি চেয়ে কমিশনে আবেদন করা হয়। পরদিন সোমবার দুদকের প্রধান কার্যালয় সেই অভিযানের অনুমোদন দেয়।
সাইড টেবিলের দ্বিতীয় তাক থেকে টাকা উদ্ধার
এজাহারে বলা হয়েছে, অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে মনিরুল যে টাকা সার্ভেয়ারকে দেবেন সোমবার বেলা ২টায় সেই এক লাখ টাকার নোটের নম্বর সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তালিকাভুক্ত করা হয়। পরে টাকাগুলো তার জিম্মায় দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের সার্ভেয়ারের নির্ধারিত কক্ষে যান মনিরুল। সেখানে আসাদুলের দাবি অনুযায়ী তাকে এক লাখ টাকা দেন তিনি।
এজাহার অনুযায়ী, টাকা নেওয়ার পর আসাদুল তা নিজের ডান পাশের সাইড টেবিলের দ্বিতীয় তাকে রাখেন। এ সময় কার্যালয়ের আশপাশে অবস্থান নেওয়া দুদকের সদস্যরা কক্ষে গিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেন।
দুদকের কর্মকর্তারা ঘুষ নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আসাদুল এক লাখ টাকা গ্রহণের কথা স্বীকার করেন বলে এজাহারে বলা হয়েছে।
পরে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে আসাদুল তার সাইড টেবিলের দ্বিতীয় তাক থেকে খাকি রঙের একটি খামে রাখা টাকা বের করে দেন। ওই খামে ১০০ টাকা মূল্যমানের এক হাজারটি নোট ছিল। প্রতি বান্ডিলে ১০০টি করে মোট ১০ বান্ডিলে রাখা ছিল এক লাখ টাকা।
দুদক জানায়, উদ্ধার করা টাকার নোটের নম্বর আগের দিন তালিকাভুক্ত নোটের নম্বরের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
