অচল সংসারে কিস্তির বোঝা, নাশকতার আগুনের ক্ষত সারছে না

“একদিকে ভাই অসুস্থ। তার সংসার, আমার সংসার… আমি আর চালাতে পারছি না। এর মধ্যে ঋণের কিস্তি দিতে বার বার চাপ দিচ্ছে। কী যে করি বুঝতে পারছি না।”

আমিনুল ইসলামঢাকা মেডিকেল প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 6 Dec 2023, 07:15 PM
Updated : 6 Dec 2023, 07:15 PM

ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এবার ভাঙা ঘরটি বদলে ফেলতে চেয়েছিলেন শাখাওয়াত, বাসের সুপারভাইজারের কাজ করে অচল সংসারে টানছিলেন কিস্তির বোঝা; কিন্তু দুঃসহ এক আগুনে দগ্ধ হওয়ার পর থেকে তার শরীর আর সংসারের যন্ত্রণা কোনোভাবেই কমছে না।

ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে পাঁচ সপ্তাহ ধরে চিকিৎসাধীন শাখাওয়াত। নিজের চিকিৎসার খরচ সামলাতেই হিমশিম খাচ্ছেন, তার ওপর ঋণের কিস্তির চাপে দিশেহারা তিনি।

হাসপাতালে ডাক্তার আর ওষুধপত্রের জন্য পয়সা খরচ না হলেও আসা-যাওয়া আর আনুষঙ্গিক ব্যয় মেটাতে ধারকর্য করতে হচ্ছে তার পরিবারকে।

২৮ বছর বয়সী শাখাওয়াত হোসেনের বাড়ি কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার কংঙ্গাইল গ্রামে। ২৮ অক্টোবর পুলিশের সঙ্গে বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষের দিন ঢাকার কাকরাইল মোড়ে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সামনে পুলিশের রিকুইজিশন করা এশিয়া পরিবহনের যে বাসে আগুন দেওয়া হয়েছিল, সেই বাসের সুপারভাইজার ছিলেন তিনি।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকায় ওই সংঘর্ষের পর থেকে অবরোধ-হরতালের মধ্যে যানবাহনে আগুন দেওয়া হচ্ছে নিয়মিত। এসব ঘটনায় দগ্ধ ১১জন এখন বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি আছেন।

শাখাওয়াতসহ মোট ১৩ জন রাজধানীর এ হাসপাতালে ভর্তি হলেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন একজন। আরেকজন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।

দগ্ধদের বেশিরভাগই খেটেখাওয়া মানুষ। গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরলেই তাদের সংসারের চাকা ঘোরে।

গত ২৮ অক্টোবরের পর থেকে সারাদেশে যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনায় শাখাওয়াত ছাড়াও শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে ভর্তি রয়েছেন- মো. রবিউল ইসলাম (২৫), মো. সবুজ (৩০), জব্বার (৪৫), বিপ্রজীত ভাওয়ালী (২০), মো. হাসান (২৪), মানিক দাস (৪৫), বেলাল হোসেন (৩৫), সাইমন (২৪), সাইফুল ইসলাম (৪৯), জনি (২৭), নাজিম উদ্দীন (২০) ও সিকদার মোহাম্মদ (৪০)।

ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক মো. তরিকুল ইসলাম জানান, খাগড়াছড়ি থেকে আসা ট্রাকের হেলপার বেলাল হোসেন চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার মারা যান। আর ফ্রেশ-মেঘনা গ্রুপের মেকানিক বিপ্রজীত চিকিৎসা শেষে গত সপ্তাহে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

দগ্ধ রোগীদের স্বজনেরা জানাচ্ছেন, সরকারিভাবে চিকিৎসা ও রোগীর খাবার দেওয়া হলেও অন্যান্য খরচ করতে হচ্ছে ধার করে। অন্যদিকে সংসারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি চিকিৎসাধীন থাকায় বন্ধ রয়েছে প্রতিদিনের উপার্জনটুকু।

শাখাওয়াতের ভাই লেপ-তোশকের দোকানের কর্মী আলকাছ মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা খুবই গরিব, বাড়িতে ছোট একটা ঘর আছে। বৃষ্টিতে ঘরের সব জায়গা দিয়ে পানি পড়ে। সেজন্য ভাই ব্যাংক থেকে কিস্তি তুলে পাকা ঘর করার কাজে হাত দিয়েছিল।

“গাড়িতে ডিউটি করে কিস্তি দিত। সে কারণে সংসার চালাতে এমনিতেই কষ্ট হচ্ছিল। এর মধ্যে ভাই আগুনে পুড়ে হাসপাতালে ভর্তি, এখন সব বন্ধ আছে।”

শাখাওয়াতের মত ঋণগ্রস্ত আলকাছ মিয়াও। কিন্তু ভাইয়ের দেখাশোনার জন্য কাজ ফেলে তাকে থাকতে হচ্ছে হাসপাতালে।

আলকাছ বলেন, “হাসপাতাল থেকে ওষুধ পত্র যা লাগছে, তা তারা দিচ্ছে, রোগীর খাবারও দিচ্ছে। এরপরও আমাদের এখানে আসা-যাওয়া, থাকা-খাওয়াসহ অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। সেটাই জোগাড় করতে পারছি না।”

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর পক্ষ থেকে ১০ হাজার টাকা সহযোগিতা পেয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেগুলোও শেষ বলে জানান আলকাছ।

তিনি বলেন, শাখাওয়াতের স্ত্রী তামান্না তাদের ১৪ মাসের বাচ্চা নিয়ে হাসপাতালে থাকেন।, আর তামান্না বাসায় গেলে তিনি থাকেন।

“এভাবেই এখন চলছে। একদিকে ভাই অসুস্থ। তার সংসার, আমার সংসার… আমি আর চালাতে পারছি না। এর মধ্যে ঋণের কিস্তি দিতে বার বার চাপ দিচ্ছে। কী যে করি বুঝতে পারছি না।”

২৮ অক্টোবর সংঘর্ষের মধ্যে এক পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর থেকে দফায় দফায় চলছে হরতাল আর অবরোধ। সেদিন থেকে ৩০ নভেম্বর সকাল পর্যন্ত ২৩৬টি অগ্নিসংযোগের খবর পেয়েছে ফায়ার সার্ভিস। একটি ঘটনায় ঢাকার ডেমরায় বাসের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা হেলপারের মৃত্যু হয়েছে দগ্ধ হয়ে।

অবরোধের মধ্যে গত সোমবার চট্টগ্রামে রিল্যাক্স পরিবহন নামের একটি বাসে ছোড়া পেট্রোল বোমায় দগ্ধ হয়ে বার্ন ইনস্টিটিউটে আসেন চালক সিকদার মোহাম্মদ (৪০) ও হেলপার নাজিম উদ্দীন (২০)।

নাজিমউদ্দীন জানান, চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইনসের সামনে যাত্রী ওঠানোর জন্য বাস দাঁড় করানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই দুর্বৃত্তরা চালকের আসনের জানালা দিয়ে পেট্রোল বোমা ছুঁড়ে মারে।

বার্ন ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক তরিকুল ইসলাম বলেন, “দগ্ধ দুজনের মধ্যে সিকদার মোহাম্মদের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার শরীরের ২৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। অন্য জনের শরীরের ২ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।”

‘এইভাবে চলতে থাকলে কিস্তি তুলতে হইব’

গত ৮ নভেম্বর ভোরে গাজীপুরের কালীগঞ্জে একটি কভার্ড ভ্যানে আগুন দিলে দগ্ধ হন বিপ্রজীত ভাওয়ালী ও আনোয়ার। তাদের প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আনোয়ার বাসায় চলে যান। বিপ্রজীতকে পরে শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়।

ফ্রেশ কোম্পানির মেকানিক বিপ্রজীত বলেন, বগুড়ায় তার কোম্পানির গাড়িতে সমস্যা হওয়ায় সেখানে গিয়েছিলেন। কাজ শেষে কোম্পানির একটি কভার্ড ভ্যানে করে ফিরছিলেন। কালীগঞ্জ এলাকায় রাস্তায় ৯-১০ জন গাড়ি থামিয়ে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়। গাড়ি থেকে নামতে নামতেই তার শরীরে আগুন ধরে যায়।

বিপ্রজীতের মা কল্পনা রানী ভাওয়ালী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সপ্তাহখানেক আগে ছেলেকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেয়। তাকে বাসায় নিয়ে এসেছি। সে এখন বাসায় থাকে। তার পোড়া ক্ষত এখনও শুকায়নি। মলম লাগাতে হয়, মুখে খাওয়ার ওষুধও আছে। আর কোনো সমস্যা হলে আবার হাসপাতালে যাইতে বলছে ডাক্তাররা।”

সংসারের টানাপড়েনের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমরা খাইটা খাই। দুই পোলাই খাইটাখুইটা সংসারডা চালায়। একজন পুইড়া যাওনের পর আত্মীয়-স্বজন সহযোগিতা করছে। হাসপাতালে থাকার সময় সব ওষুধ তারাই দিছে। এখন আবার ওষুধপথ্য কিনতে আত্মীয়-স্বজনের সাহায্য নিতে হচ্ছে।

“যে কোম্পানিতে কাজ করত, তারা প্রথম দিকে কিছু সহযোগিতা করেছিল। তা দিয়া খরচ মিটাইতে কষ্ট হইত। কারণ আমরা যারা রোগীর সাথে ছিলাম, আমাদের সব কিছুই বাহির থেকে কিনে খাইতে হইত। কোম্পানি যা দিত তাতে চলত না। বাড়িত থাইক্যা পোলার জন্য এখন যে খরচ হইতেছে, এইভাবে চলতে থাকলে সামনে কিস্তি তুলতে হইব।”

সরকারি কোনো সাহায্য পাননি? এমন প্রশ্নে কল্পনা ভাওয়ালী বলেন, “হাসপাতাল ছাড়ার সময় আমাগো ভোটার কার্ডের (এনআইডি) নম্বর রাখছে, তয় কিছু কয়নি।”

বন্ধুকে মনে পড়ে

সারা দিন বাস নিয়ে ছোটাছুটির পর ক্লান্ত শরীরে রাতে বাসেই ঘুমিয়ে পড়তেন রবিউল ইসলাম ও নাঈম। প্রতিদিনের মত ২৮ অক্টোবর ডেমরার দেইল্লা বাস স্টেশনে রাস্তার পাশে দাঁড় করে রাখা অছিম পরিবহনের বাসে ঘুমিয়েছিলেন তারা। কিন্তু রাতের আঁধার কেটে সেদিন তাদের ভোর হয় ভয়ঙ্কর এক রূপ নিয়ে।

২৮ অক্টোবর কাকরাইল ও পল্টন এলাকায় সংঘর্ষে বিএনপির সমাবেশ পণ্ড হয়। পরদিন হরতাল ডেকেছিল দলটি। হরতালের ভোরেই অছিম পরিবহনের বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

আগুনের মধ্যে রবি কোনোমতে বাস থেকে বের হতে পারলেও পুড়ে মারা যান নাঈম। চোখের সামনে বন্ধুকে হারানোর সেই মুহূর্ত এখনও ভুলতে পারেন না রবি। শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে যন্ত্রণায় দিন কাটছে তার।

আরও পড়ুন

Also Read: হরতালের ভোরে বাসে আগুন, ঘুমন্ত হেলপারের মৃত্যু

Also Read: ২৮ অক্টোবর থেকে ২৩৬ অগ্নিসংযোগ: ফায়ার সার্ভিস

Also Read: কাকরাইলে সংঘর্ষ, বিএনপির সমাবেশ পণ্ড