কর্মচারীকে ‘গুলি করে’ পুলিশকে মিথ্যা তথ্য, শ্রমিক লীগ নেতা বাচ্চু গ্রেপ্তার
পুলিশ বলছে, রোববার বিকালে গুলির ঘটনার পর বাচ্চু প্রথমে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন। একবার বলেছিলেন, দুই পক্ষের মারামারির সময় গুলিবিদ্ধ হন মানিক মিয়া নামের তার ওই কর্মচারী, পরে আবার বলেছিলেন, মানিক ছিনতাইকারীর গুলিতে আহত হয়েছেন।
রাজধানীর বেইলি রোডের বাসায় এক কর্মচারীকে গুলি করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন শ্রমিক লীগ নেতা ইসমাইল হোসেন বাচ্চু। এ ঘটনায় রুবেল নামে তার আরেক কর্মচারীকেও গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
পুলিশ বলছে, রোববার বিকালে গুলির ঘটনার পর বাচ্চু প্রথমে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন। একবার বলেছিলেন, দুই পক্ষের মারামারির সময় গুলিবিদ্ধ হন মানিক মিয়া নামের তার ওই কর্মচারী, পরে আবার বলেছিলেন, মানিক ছিনতাইকারীর গুলিতে আহত হয়েছেন।
তবে তদন্তে উঠে আসে, বাচ্চু নিজেই তার ফ্ল্যাটে মানিককে গুলি করেছেন। বাচ্চুর ফ্ল্যাট থেকে তার লাইসেন্স করা পিস্তল ও গুলি জব্দ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় আহত মানিকের স্ত্রী সাজেদা বেগম রমনা থানায় একটি মামলা করেছেন।
মামলায় তিনি অভিযোগ করেছেন, বাচ্চুর নওরতন কলোনির লেকভিউ অ্যাপার্টমেন্টের দোতলার ফ্ল্যাটে বেলা সাড়ে ৩টার দিকে এই গুলির ঘটনা ঘটেছে। বাচ্চু তার লাইসেন্স করা পিস্তল দিয়ে হত্যার উদ্দেশ্যে মানিককে গুলি করে আলামত নষ্ট করেছেন।
রোববার রাতেই বাচ্চু ও রুবেলকে গ্রেপ্তার করা হয় জানিয়ে ডিবির রমনা বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মিশু বিশ্বাস বলেন, “রোববার বেলা ৩টার দিকে রমনা এলাকায় মো. মানিক মিয়া ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে গুলিবিদ্ধ হন বলে বাচ্চু অভিযোগ করেন। পরে পুলিশ তদন্ত করে জানতে, পারে ঘটনাটি ঘটেছে বাচ্চুর ফ্ল্যাটেই।
“তখন বাচ্চু ঘটনার দায় তার কর্মচারী রুবেলের ওপর চাপানোর চেষ্টা করে পুলিশকে বলেন, রুবেল তার অস্ত্র পরিষ্কারের সময় গুলি বেরিয়ে এই ঘটনা ঘটে।”
বাচ্চুর ‘মিথ্যা তথ্য’
রমনা থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, “রোববার বেলা ৩টার দিকে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির সামনে মানিক গুলিবিদ্ধ হয়েছে বলে প্রথমে খবর আসে। কিন্তু পুলিশ সেখানে গিয়ে তেমন কোনো আলামত পায়নি। পরে জানা যায় ঘটনা অন্যরকম।”
ঘটনার বিষয়ে শ্রমিক লীগ নেতা বাচ্চু প্রথম বিভিন্নরকম তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন বলে জানান রমনা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবু আনসার।
তিনি বলেন, “মানিকের স্ত্রীর মামলায় ইসমাঈল হোসেন বাচ্চু ও রুবেলের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে, রোববার সকালে নিজের বাসা থেকে বাচ্চুর বাসায় যান মানিক। পরে মানিকের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর দেওয়া হয় তার স্ত্রীকে। পরে তিনি জানতে পারেন তার স্বামীকে বাচ্চুর বাসায় গুলি করা হয়েছে।
“কিন্তু বাচ্চু প্রথমে বলেছিলেন, দুই পক্ষের মারামারির মধ্যে মানিক গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। আবার একবার বলছেন, তার (মানিকের) কাছে টাকা ছিল, ছিনতাইকারীরা এসে গুলি করে টাকা নিয়ে গেছে। তখন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এমন কিছু না পাওয়ায় সন্দেহ হয়। পরে বাচ্চুর বাসার ভেতর থেকে পিস্তল, গুলির বাক্স উদ্ধার করা হয়। তার পিস্তলটি লাইসেন্স করা।”
পুলিশ কর্মকর্তা আবু আনসার বলেন, “গুলিবিদ্ধ মানিককে হাসপাতালেকে নিয়ে আসছে জিজ্ঞেস করা হলে জানানো হয়, একটা গাড়িতে করে তাকে হাসপাতালে এনে দেয় কেউ। বাচ্চুকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনিও ‘জানেন না’ বলে জানান। পরে জানা যায়, বাচ্চু, তার গাড়িচালক ও আর একটা মেয়ে তাকে হাসপাতালে এনেছেন।”
সোমবার এই মামলায় বাচ্চু ও রুবেলকে তিনদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিবির উপকমিশনার মো. হুমায়ুন কবীর।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “দুইজনকে তিনদিন করে রিমান্ডে নিয়েছি। জিজ্ঞাসাবাদে জানা যাবে আসল ঘটনাটা কী।”
কে এই বাচ্চু
ফুলবাড়িয়া বাস টার্মিনাল কেন্দ্রীক শ্রমিক ইউনিয়নের রাজনীতিতে যুক্ত বাচ্চু এখন শাহবাগ থানা শ্রমিক লীগের সহসভাপতি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ফুলবাড়িয়া বাসস্ট্যান্ড শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বাচ্চু। সেখান থেকে ২০১৭ সালে বিতাড়িত হলে ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক-শ্রমিক ঐক্যলীগ’ নামে একটি সংগঠন খুলে তার সদস্য সচিব হন তিনি। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল মেয়াদে তিনি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। এখানেই তার গ্রামের বাড়ি।
আলকরা ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান মাঈন উদ্দীন ভুঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০১৫ সালে বাচ্চুর বিরুদ্ধে তার নিজের বড় ভাইয়ের জামাতাকে হত্যার অভিযোগ ওঠে। নিহত জামালউদ্দীন ওরফে বাক্কা ছিলেন আলকরা ইউনিয়ন যুবলীগের তৎকালীন সভাপতি। তিনিও বাসের ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন।
“জামালউদ্দীন হত্যা মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়েছে, এখন রায়ের অপেক্ষা। এই মামলায় বাচ্চু অন্যতম অভিযুক্ত।”
এছাড়াও বাচ্চুর বিরুদ্ধে আরও হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আছে বজানিয়েছেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্যাহ।
“সে ফুলবাড়িয়া শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ছিল। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছিল। নিজেদের জামাতাকে হত্যাসহ অন্তত তিনটি হত্যামামলার আসামি বাচ্চু।”
পুলিশ জানিয়েছে, সন্তানদের নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন বাচ্চুর স্ত্রী। বেইলি রোড এলাকার ওই ফ্ল্যাটে বাচ্চু একাই থাকেন। তার ফ্ল্যাটে গুলিবিদ্ধ মানিকসহ অন্য কর্মচারীরা নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন।
