৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

পাসের হার কমল ভিকারুননিসায়, ‘ঘাটতি পূরণের’ প্রতিশ্রুতি অধ্যক্ষের

এবারের এইচএসসিতে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পাসের হার ৯৪ দশমিক ১৫ শতাংশ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 31 Oct 2026, 02:20 PM

Updated : 31 Oct 2026, 02:19 PM

ডিজিটাল পদ্ধতিতে দ্রুত ফল জানার সুযোগ এবং বৃষ্টির কারণে এবার এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশের দিনে রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল অন্য যে কোনো বছরের চেয়ে কম।

বৃষ্টির কারণে বহিরাঙ্গনে নোটিশ বোর্ডে ফল টাঙানো সম্ভব হয়নি।

আবার বৃষ্টি মাথায় নিয়েও অনেকে ছুটে আসেন সহপাঠী ও শিক্ষকদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নিতে। কেউ কেউ আবার সার্ভারে ফল না পেয়ে কলেজে এসেছেন।

এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পাসের হার ৯৪ দশমিক ১৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে পাসের হার ছিল ৯৭.৫৬ শতাংশ।

এই প্রতিষ্ঠান থেকে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪১৬ জন শিক্ষার্থী।

প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার ২,৩৯৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ২,৩৭৭ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং পাস করেছেন ২,২৩৮ জন।

বিভাগভিত্তিক ফলাফলে বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৯৩.৮৮%, মানবিকে ৯৪.১৬% এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৯৫.৯৭%।

উত্তীর্ণ সব শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়ে ভিকারুননিসার অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম বলেন, “আমাদের শিক্ষার্থীদের এই ফলাফল তাদের জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলাফলের সার্বিক চিত্র দেখে আমার মন ভারাক্রান্ত হলেও নিয়ম অনুযায়ী তা প্রকাশ করছি।”

সার্বিক পরিবেশ ও ফলাফল নিয়ে অধ্যক্ষ মাজেদা আরও বলেন, “করোনাকালীন সময় থেকেই লক্ষ করা যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজবিমুখ হয়ে পড়েছে। নিয়মিত ক্লাস না করে বাসায় বসে নিজে নিজে পড়া কিংবা কোচিংমুখী হওয়ার প্রভাব ফলাফলেও পড়েছে।”

অধ্যক্ষ মাজেদা বেগমের কথায়, কলেজে প্রতিটি বিষয়ের জন্য একাধিক অভিজ্ঞ শিক্ষক ক্লাস নেন, তাই শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কলেজে এসে ক্লাস করেই পড়াশোনা করার কোনো বিকল্প তিনি দেখছেন না।

তিনি বলেন, “ফলাফলের ঘাটতি কাভারআপ করার মূল দায়িত্ব আমি আমার নিজের কাঁধেই নিচ্ছি। তাদের পুনরায় ক্লাসমুখী করতে এবং পড়ার আগ্রহ ফেরাতে ক্রীড়া ও সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে এবং এ চেষ্টা ভবিষ্যতেও থাকবে।”

শনিবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে ১টা পর্যন্ত সরেজমিনে কলেজটি ঘুরে দেখা গেছে, কারও চোখে আনন্দের অশ্রু; আবার প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন।

জিপিএ-৫ পেয়েছেন শিক্ষার্থী সোহা তাসনিম। মেয়েকে নিয়ে কলেজে এসে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তার মা তাহমিদা হাসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, ও অনেক পরিশ্রম করেছে। অন্য আর দশটা বাচ্চার মত মোবাইল গেমস বা ল্যাপটপে সময় না দিয়ে সব সময় পড়াশোনা নিয়েই থাকত। ওর এই কষ্টের কারণেই আজকে সাফল্য এসেছে।”

মেয়ের ভবিষ্যৎ ও প্রত্যাশার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “মেয়ের ইচ্ছে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া। আশা করি সে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাবে। তবে সফলতার পাশাপাশি সে যেন একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে, অভিভাবক হিসেবে এটাই আমার বড় চাওয়া।”

বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ফারিহা তাবাসসুম উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “সারারাত এক ফোঁটা ঘুমাইনি। ভয় ছিল রসায়ন নিয়ে। কিন্তু রেজাল্ট দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছি না, জিপিএ-৫ এসেছে!”

বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনিম আক্তার তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “ভোর থেকেই ধকধকানি বাড়ছিল। মোবাইলে এসএমএস আসতেই দেখি জিপিএ ৫ পেয়েছি। বৃষ্টি হচ্ছিল, তাও ঘরে একা আনন্দ করে পোষাচ্ছিল না। তাই বান্ধবীদের সঙ্গেদেখা করতে তড়িঘড়ি করে কলেজে চলে এলাম।”

তবে সবার মুখে হাসি ছিল না। বাবাকে নিয়ে কলেজে এসেছেন মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী হাবিবা আজহিন ইভা। প্রত্যাশিত ফল না পেয়ে বারবার চোখ মুছছিলেন তিনি।

ইভা বলেন, “যে ফল আশা করেছিলাম, তা না পাওয়ায় নিজের ওপরই খারাপ লাগছে। বাবা এবং পরিবারের যে প্রত্যাশা ছিল, হয়তো তা পূরণ করতে পারিনি। এটা আমারই ব্যর্থতা।

“আমার এই চলার পথে বাবা সবচেয়ে বেশি পাশে ছিলেন। সবসময় সঠিক পথে চলার পরামর্শ দিয়েছেন এবং সাপোর্ট করেছেন।”

ইভার বাবা ও শিক্ষক মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেন, “মেয়ের ফলে আমি অবশ্যই সন্তুষ্ট এবং আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। কিছুটা কষ্ট থাকলেও বলব, এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে ভুলগুলো শুধরে পরবর্তী লক্ষ্যের দিকে এগোতে হবে। ফল খারাপ বলে মন খারাপ করে বসে থাকলে চলবে না। আমি নিজে শিক্ষক, আমার পড়ানো শিক্ষার্থীরা আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু নিজের মেয়েকে প্রয়োজনীয় ইংরেজি ও আইসিটি টিউটর দিতে পারিনি আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে, এই ব্যর্থতা আমার নিজের।

“আবেগ থেকেই আমাদের চোখ অশ্রুসজল। তবে আমি ওকে বলেছি, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার চেয়েও একজন ভালো মানুষ হওয়াটা বেশি জরুরি; আমি সবসময় ওর পাশে আছি।”

আরেক শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান ঈশিতা জিপিএ-৫ প্রত্যাশা করলেও পেয়েছেন ৪.৭৫।

তিনি বলেন, “পরীক্ষা ভালো হয়েছিল, জিপিএ-৫ পাব বলেই আশা ছিল। ফলাফল দেখে কিছুটা খারাপ লাগছে, তবে আম্মা বলেছেন যা হয়েছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে।”

ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের বড় অংশের দৃষ্টি এখন উচ্চশিক্ষার ভর্তি যুদ্ধে। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল ও প্রকৌশল ভর্তি পরীক্ষার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন তারা।

বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী মেহরীন আনজুম বলেন, এইচএসসির ফল তো শেষ অধ্যায়, আসল যুদ্ধ এখন শুরু।

“আমার লক্ষ্য মেডিকেলে ভর্তি হওয়া, তাই আজ থেকেই পুরোদমে রিভিশন ও প্রস্তুতিতে মনোযোগ দেব।”