৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩

‘পিছিয়ে থাকা’ ৩ পার্বত্য জেলা আর লম্বা পরীক্ষায় ফল খারাপ চট্টগ্রামে!

“জিপিএ ৫ কেন অনেক কমল, এটা গবেষণার বিষয়,” বলেন বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন

মিঠুন চৌধুরী মিঠুন চৌধুরী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 31 Oct 2026, 09:57 PM

Updated : 31 Oct 2026, 09:57 PM

চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় তুলনামূলক খারাপ ফল করেছে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড, যার কারণ হিসেবে দক্ষতা অর্জনে ঘাটতি, তিন মাস ধরে পরীক্ষা চলা এবং তিন পার্বত্য জেলার ‘পিছিয়ে থাকার’ মতো কারণ সামনে আনছেন সংশ্লিষ্টরা।

এবার চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পাসের হার কমেছে এবং জিপিএ ৫ এসেছে আগের বছরের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

এবার পাসের হার ৫২ দশমিক ০৭ শতাংশ; জিপিএ ৫ পেয়েছে ২ হাজার ৯২৯ জন।

২০২৫ সালে এই বোর্ডে পাসের হার ছিল ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ; আর জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৬ হাজার ৯৭ জন।

তার আগের বছর ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭০ দশমিক ৩২ শতাংশ। জিপিএ ৫ পেয়েছিল ১০ হাজার ২৬৯ জন। সেই হিসাবে, তিন বছর ধরেই পাসের হার আর জিপিএ ৫ এর সংখ্যা কমছে।

পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস, অভিন্ন প্রশ্ন, মূল্যায়নে ভিন্নতা

শনিবার ফল ঘোষণার পর চট্টগ্রাম বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন, “২০২০ সালে নতুন সিলেবাস ঘোষণার পর এবার প্রথম শিক্ষার্থীরা পূর্ণ সিলেবাস পড়ে পরীক্ষা দিয়েছে।

“কোভিডসহ নানা কারণে নতুন কারিকুলাম পাঠদান সম্পন্ন করল। এই পরীক্ষার্থীরা বিশাল চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছে।”

বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, “এবার অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা হয়েছে। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে রুবিক্স পদ্ধতি ফলো করতে বলেছি। রুবিক্স হচ্ছে একটা প্রি-ডিটারমাইন্ড মার্কিং স্কিম।

“কোন প্রশ্নে কতটুকু লিখলে কত মার্ক পাবে, আগে আমরা ঠিক করে দিয়েছি। এই রুবিক্স অনুসরণ করে উত্তরপত্র মূল্যায়ন করতে আমরা বলেছি।”

তিনি বলেন, “এটা করাতে আমাদের বিশ্বাস, উত্তরপত্র মূল্যায়ন যথার্থ হয়েছে। পাসের হার যেটাই হোক, ফলাফলের প্রকৃত চিত্র আমরা পেয়েছি।”

এবার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ পাওয়া শিক্ষার্থী মো. জাহিদুল কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “জিপিএ ৫ কমে যাওয়ার নেপথ্যে মূল বিষয় আমার মনে হয়, অনেক বছর পর এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা হয়েছে। এটার জন্য হয়তো অনেকে প্রস্তুত ছিল না। এর প্রভাব সামগ্রিক ফলে পড়েছে।”

জিপিএ ৫ কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে বোর্ডের সচিব অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল হক স্বপন বলেন, “জিপিএ-৫ কেন অনেক কমল, এটা গবেষণার বিষয়। বোর্ড থেকে প্রকৃত কারণ দ্রুত বের করব। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক পরীক্ষা পরে নিতে হয়েছে। কী ঘটেছে, সেটা গবেষণার দাবি রাখে।”

দক্ষতা অর্জনে ঘাটতি

উত্তর লিখতে গিয়ে শিক্ষার্থীকে জ্ঞান, অনুধাবন, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা- এই চারটি ধারাবাহিকভাবে লিখতে হয়।

বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, “কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, পার্বত্য তিন জেলায়, আমরা গতবছরও দেখেছি মূল্যায়নের পর যাচাই-বাছাই করে। ওদের ভেতর ধারাবাহিকতা থাকে না।

“অনেক শিক্ষার্থী জ্ঞান ও অনুধাবন ঠিকভাবে লিখতে পারেন। কিন্তু প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতায় যেভাবে যুক্তি দিয়ে উপস্থাপন করার কথা, ওইভাবে তারা উপস্থাপন করতে পারে না।”

এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “পার্বত্য জেলাগুলোতে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী গাইডেড আইডিয়ায় বিশ্বাসী। কিন্তু চট্টগ্রাম শহর বা ভালো ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কিছু শিক্ষার্থী ক্রিয়েটিভ রাইটিং এর মাধ্যমে উত্তর লিখে থাকে। পরীক্ষকরা ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ের উপর বেশি গুরুত্ব দেন।”

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাহেরুল ইসলাম চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের কলেজের ফল তুলনামূলক অনেক ভালো। এখানে মেধাবী শিক্ষার্থীরা চান্স পায়। তদুপরি আমাদের শিক্ষকরা নিবেদিত। লেখাপড়ার পরিবেশসহ সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম কলেজে এটার প্রভাব পড়েনি।

“কিন্তু যেখানে অবকাঠামো সুযোগ সুবিধা নেই, যেখানে শিক্ষকদের ঘাটতি আছে এবং শিক্ষার্থীরা ক্লাসমুখী নয়, সেখানে হয়তো বিরূপ প্রভাব পড়েছে।”

অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ রসায়ন সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. ইদ্রিস আলী বলেন, “মাত্র তিন হাজারের মতো জিপিএ ৫, এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কোথাও ঘাটতি আছে, যে কারণে আমরা লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারছি না।

“সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হয়েছে অনেক বছর। অভিন্ন প্রশ্ন, মূল্যায়ন পদ্ধতি বা দক্ষতা অর্জনে ঘাটতি যাই বলেন, সংকট কোথায়, তা চিহ্নিত করে কাজ শুরু না করলে ভবিষ্যতে ফল আরও খারাপের দিকে যেতে পারে।”

এত বছর পরও কেন শিক্ষার্থীদের দক্ষতার ঘাটতি মেটানো যাচ্ছে না, সেই প্রশ্নে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বলেন, “শিক্ষকরা যোগ্য, আমাদের শিক্ষার্থীরাও যোগ্য। কিন্তু একটা ট্রেন্ড চলে আসছে ক্লাসরুমে উপস্থিতির হার অনেক কম। উপস্থিতি বাড়লে শিক্ষক যেটা পড়াবেন, শিক্ষার্থীরা সেটা বুঝতে পারবেন।”

দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা

চলতি বছরের ২ জুলাই থেকে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়। বৈরী আবহাওয়া ও বন্যার কারণে ৮ জুলাই থেকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত হয়ে যায়।

গত ২৭ জুলাই থেকে নিয়মিত রুটিনে পুনরায় পরীক্ষা শুরু হয়। আর স্থগিত হওয়া উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হয় ২০ অগাস্ট, যা চলে ৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।

এবার মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ পাওয়া ছাত্রী শাফকাতুন তাবাসসুম তুষি বলেন, “দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা হলে ফোকাস রাখা যায় না। প্রায় তিন মাস ধরে এবারের পরীক্ষা হয়েছে।

“যখন শিডিউল অনুযায়ী পরীক্ষা হয় তখন ধারাবাহিকতা থাকে। এটা নষ্ট হলে প্রস্তুতিতে প্রভাব পড়ে। আবার অন্য বোর্ডে দুই পরীক্ষার মাঝে যতটা বন্ধ পেয়েছে, ততটা আমরা পাইনি।”

আগামী বছরগুলোতে বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করা উচিত বলে মনে করেন এই শিক্ষার্থী।

তিন পার্বত্য জেলায় সংকট

পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০-৩০ মাইল দূর থেকেও শিক্ষার্থীরা কলেজে আসেন জানিয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরী বলেন, “তারা প্রতিদিন তারা ক্লাসে আসতে পারেন না। আর সেখানে শিক্ষক স্বল্পতাটা দীর্ঘদিনের একটা সমস্যা। সরকার চেষ্টা করছে যতটুকু সম্ভব শিক্ষক স্বল্পতা দূর করার জন্য।

“এছাড়া সমস্যা সমাধান, সৃজনশীল চিন্তা, বিশ্লেষণ, যোগাযোগ সক্ষমতা ও নেতৃত্বের মত সফট স্কিল বোঝানোর মত যোগ্য শিক্ষকেরও অভাব আছে।”

আইসিটি শিক্ষকের ঘাটতি পূরণে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “যে পরিমাণ শিক্ষক দরকার, সে পরিমাণ যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষক আইসিটিতে পাওয়া যাচ্ছে না।

“আর ইংরেজি ১২ বছর পড়াশোনা করার পরও আমরা এখনো অনেক দুর্বল।”