এইচএসসির ফল:বিপর্যয় নাকি এটিই শিক্ষার প্রকৃত মান?
প্রতি ১০০ জনে ৪৮ জনই অনুত্তীর্ণ—এবারের এইচএসসির ফল কি কেবল একটি পরীক্ষা বিপর্যয়, নাকি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার অবক্ষয়ের প্রতিচ্ছবি?
এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সম্মিলিত পাসের হার ৫২.১২ শতাংশ। গত বছরের তুলনায় এই হার প্রায় ৫ শতাংশ কম। গত ২১ বছরের মধ্যে এটিই সর্বনিম্ন পাসের হার। এর আগে ২০০৪ সালে পাসের হার ছিল ৪৭.৭৪ শতাংশ। এ বছর জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার শিক্ষার্থী, যা গত বছরের তুলনায় অন্তত ২৯ হাজার কম। সোজা বাংলায় বললে, এ বছর প্রতি ১০০ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪৮ জনই পাস করতে পারেনি।
প্রাথমিকভাবে এই ফলাফলকে বড় ধরনের ‘বিপর্যয়’ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু এটি কি কেবল একটি পরীক্ষার ফল বিপর্যয়, নাকি এর মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র সামনে চলে এসেছে?
পাসের হার নিয়ে আমার অবশ্য কিছুটা দ্বিমত রয়েছে। আমার ব্যক্তিগত হিসাব অনুযায়ী, প্রকৃত পাসের হার আসলে ৩৩.২৮ শতাংশ। শিক্ষার মান নিয়ে আলোচনার আগে এই হিসাবের পেছনের কয়েকটি বিষয় বোঝা জরুরি।
এ বছর যারা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে, তারা এসএসসি পাস করেছে ২০২৪ সালে। সে বছর এসএসসি উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। কিন্তু তাদের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছে মাত্র সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় সাড়ে ৫ লাখ পরীক্ষাতেই অংশ নেয়নি, যা মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে, যারা পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, তাদের ৪৮ শতাংশই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
দুই বছরের ব্যবধানে এসএসসি উত্তীর্ণ একটি বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা এবং অংশগ্রহণকারীদের প্রায় অর্ধেকের অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে পাসের হার দাঁড়ায় প্রায় ৩৩ শতাংশ। এর সঙ্গে প্রথম দিন কেন্দ্রে অনুপস্থিত ২৪ হাজার শিক্ষার্থী যোগ করলে ফেলের হার আরও বাড়বে।
ফলাফলের এই বিপর্যয় কেন? এর কারণ আসলে বহুমুখী। কিন্তু এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, অভিভাবক কিংবা শিক্ষার্থী—যাকেই জিজ্ঞেস করা হোক না কেন, কেউই খুব একটা দায়িত্ব নিতে চাইবেন বলে মনে হয় না। প্রত্যেকেই দায় অন্যের কোর্টে ঠেলে দেবেন। অথচ শিক্ষার্থীদের এই ফলাফলের পেছনে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, শিক্ষা প্রশাসন এবং রাষ্ট্র—সবারই কমবেশি দায় রয়েছে।
ফেল করা ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ইংরেজি ও আইসিটি বিষয়ে ফেল করেছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন। এর মধ্যে ইংরেজিতে ফেল করেছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন এবং আইসিটিতে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। অর্থাৎ এ দুটি বিষয়ই শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ।
বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে যেটুকু বুঝলাম, কলেজগুলোতে আইসিটি শিক্ষকের তীব্র সংকট রয়েছে। যারা আইসিটি পড়ান, তাদের অনেকেরই পড়াশোনা এই বিষয়ে নয়। কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়ে তারা পাঠদান চালিয়ে যান। আর ইংরেজি তো আমাদের কাছে যুগের পর যুগ ধরে এক যমের নাম। বছরের পর বছর ধরে পড়েও শিক্ষার্থীরা ইংরেজিতে কথা বলতে পারছে না, এমনকি পরীক্ষায়ও পাস করতে পারছে না। অথচ এত বছরেও আমরা সমস্যার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করতে পারলাম না। কোথায় ঘাটতি, কেন শিক্ষার্থীরা এই বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না, তা খুঁজে বের করে কার্যকর কোনো উদ্যোগও নেওয়া হলো না।
আরেকটি সমস্যা হলো, দক্ষ শিক্ষকের ঘাটতি এবং প্রচলিত শিখনপদ্ধতির সমস্যা। এর সঙ্গে রয়েছে শিক্ষকদের প্রাইভেট বাণিজ্যের প্রতি ঝোঁক। শ্রেণিকক্ষে যেভাবে পড়ানো হয়, তার সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপদ্ধতির অসামঞ্জস্যও অনুত্তীর্ণের হার বাড়ানোর অন্যতম কারণ। কর্মরত শিক্ষকদের প্রায় ৪০ শতাংশের কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ নেই। একজন শিক্ষক যত মেধাবীই হন না কেন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া কার্যকর ও মানসম্মত পাঠদান সম্ভব নয়।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, দেশের ২ হাজার ৬২৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক নেই। বর্তমানে ইংরেজি বিষয়ে পাঠদান করছেন ৬৪ হাজার ২৫৩ জন শিক্ষক। তাদের মধ্যে ৫১ হাজার ৩৬০ জনের ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক, স্নাতকোত্তর বা উচ্চতর কোনো ডিগ্রি নেই। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনা করে নামমাত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে আইসিটি পড়ানোটা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তামাশা ছাড়া আর কী?
এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে। একজন শিক্ষার্থী যদি কলেজে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের কাছ থেকে যথাযথ পাঠই না পায়, তাহলে তার কাছে ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করার যৌক্তিকতা কতটুকু? শিক্ষার্থীর ব্যর্থতার দায় তার নিজের, কিন্তু তাকে শেখানোর দায়িত্ব যাদের, তাদের দায় কি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে?
এবার সোয়া ৯ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে মাত্র ১৩৯টি প্রতিষ্ঠানে। অন্যদিকে নটর ডেম কলেজ, ঢাকা কলেজ কিংবা রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকই তাদের ভালো ফলাফলের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছে। এখন কেউ কেউ বলবেন, এসব প্রতিষ্ঠানে ভালো শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় বলেই তারা ভালো ফলাফল করে। কিন্তু এই যুক্তি পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয়। অন্যান্য কলেজ, বিশেষ করে নামকরা বেসরকারি কলেজগুলোতেও প্রচুর মেধাবী শিক্ষার্থী ভর্তি হয়। তাদের ফলাফল কেন বিপর্যস্ত হচ্ছে?
এর পেছনে শিক্ষকদের পাঠদানের ধরন, শ্রেণিকক্ষে নিবিড় তদারকি, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেওয়ার মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ একজন শিক্ষার্থীর ভালো ফলাফলের পেছনে শুধু তার ব্যক্তিগত মেধা নয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ ও পাঠদানের মানও গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হলো মুখস্থনির্ভরতা। মুখস্থবিদ্যা থেকে সরে আসার জন্য যে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল, সেটি অনেক ক্ষেত্রেই মুখস্থবিদ্যাকে নিরুৎসাহিত করার পরিবর্তে বরং একে নতুনভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করেছে। প্রশ্নের ধরন বদলেছে, কিন্তু শেখার ধরন বদলায়নি। শিক্ষার্থীরা সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তরও মুখস্থ করে পরীক্ষার খাতায় লিখতে শিখেছে। যা-ই লিখুক, নম্বর দেওয়ার যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তাতে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাইয়ের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। একটু কান পাতলেই অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার নির্দেশনা নিয়ে নানা গল্প শোনা যায়।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় শেখার চেয়ে পরীক্ষায় পাস করাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একজন শিক্ষার্থী কতটা জানে, কতটা বুঝতে পারে কিংবা বাস্তব জীবনে সেই জ্ঞান কতটা কাজে লাগাতে পারে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পরীক্ষার ফলাফল। অথচ শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য শুধু সনদ অর্জন নয়; একজন মানুষকে চিন্তা করতে শেখানো, যুক্তি দিয়ে বিচার করতে শেখানো এবং বাস্তব জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার উপযোগী করে গড়ে তোলা।
একটা কথা পরিষ্কারভাবে বলা যায়, শিক্ষার্থীরা পড়েনি, তাই পাস করেনি। কিন্তু তারা কেন পড়েনি, কেন শিখতে পারেনি এবং তাদের শেখানোর দায়িত্ব যাদের ছিল, তারা কতটা দায়িত্ব পালন করেছেন? শ্রেণিকক্ষে যদি নিয়মিত পাঠদান হতো, শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হতো এবং দুর্বলতা চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতো, তাহলে হয়তো সবাই জিপিএ-৫ পেত না, কিন্তু এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ফেল করত না।
শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার বাইরে অন্য কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগী হতে দেখা গেছে। বিশেষ করে গত দুই বছরে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের সংঘবদ্ধ হয়ে মব সৃষ্টি, শিক্ষকদের ওপর হামলা এবং তাদের অসম্মানিত করার যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো ছিল উদ্বেগজনক। এসব ঘটনা শিক্ষাঙ্গনে শৃঙ্খলা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং শিক্ষার পরিবেশের অবনতির চিত্র সামনে এনেছে।
এর সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিপুল প্রভাব এবং অভিভাবকদের উদাসীনতাও যুক্ত হয়েছে। শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীরা এখন আর তাদের কথা শুনতে চায় না। বেশি চাপ প্রয়োগ করলে মবের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অন্যদিকে অভিভাবকরাও ছেলেমেয়েদের ওপর ক্রমশ নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন।
এখন সরকার জানিয়েছে, এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে অনুত্তীর্ণ পরীক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। আপাতত এটিকে ইতিবাচক উদ্যোগ বলেই মনে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর বেঁচে যাবে। একই সঙ্গে শিক্ষাজীবন থেকে স্থায়ীভাবে ঝরে পড়ার ঝুঁকিও কিছুটা কমবে। তবে এটা যেন মনে রাখা হয় যে, পরীক্ষার সুযোগ দিয়ে পাস করানো আর শিক্ষার্থীদের প্রকৃত শিক্ষাগত ঘাটতি পূরণ করা এক বিষয় নয়।
শুধু আরেকবার পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যেসব বিষয়ে শিক্ষার্থীরা দুর্বল, সেগুলো চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় পাঠদান ও সহায়তার ব্যবস্থা করা জরুরি।
এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও কার্যকর কৌশল প্রণয়ন দরকার। জীবনের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষায় এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ফেল করছে, কোন বিষয়ে তাদের দুর্বলতা বেশি, কেন তারা পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না এবং এর পেছনের কারণগুলো কী—তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফল হচ্ছে, সেগুলোর পাঠদানের মান, শিক্ষকসংকট, ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহি খতিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজন হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর পাঠদান পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা থেকে শিক্ষণীয় বিষয়গুলো অন্য প্রতিষ্ঠানেও কাজে লাগানো যেতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বের করে আনা দরকার।
একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা এক দিনে ধ্বংস হয় না। ধীরে ধীরে শিক্ষকের মান কমে, পাঠদানের পরিবেশ নষ্ট হয়, মূল্যায়নব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়, শিক্ষার্থীরা শেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। একসময় পরীক্ষার ফলাফল সেই দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনারই প্রতিচ্ছবি হয়ে সামনে আসে। এবারের এইচএসসি ফলাফলকে সেই সতর্কবার্তা হিসেবেই দেখা উচিত।
রাজু নূরুল: উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশে পরিচালিত প্রকল্পে ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত। ই-মেইল: raju_norul@yahoo.com
